আবুল কাসেম
২৭ জানুয়ারী ২০২৪, ৪:৫০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সৃষ্টিশীল কর্মে, নিসর্গের মায়ায় মজে আছেন সুচিশিল্পী ও উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশের একেবারে প্রান্তিক চাষি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছয় ভাই এক বোন নিয়ে পরিবার। ভাই বোনদের সবার মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ। শৈশবে মায়ের কাঁথা সেলাই দেখে তার মনে শিল্পের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। স্কুলে যাতায়াত শেষে কলেজের গন্ডি পার হয়েছেন, মনে তার সব সময় শিল্প আর সুন্দরের জন্য কিছু করার আকুতি! কিন্তু ঝিনাইদহের এক অজ পাড়াগাঁয়ের বাসিন্দা হয়ে সে সুযোগ কোথায়! মেয়েদের সাজ-গোঁজ দেখেও আমিনুল ইসলাম অন্য মানুষের চেয়ে বেশি কিছু আবিষ্কার করতেন। তাঁর স্বভাবের মধ্যেই ছিল স্বকীয় বৈশিষ্ট। বিশেষ করে হিন্দু পরিবারের আচার অনুষ্ঠানে যেসব আয়োজন, তিনি সেখান থেকে তার ভালোলাগার উপাদান খুঁজে নিতেন। কোন পত্রিকা পেলে সেখানে সুন্দর ছবি বা ডিজাইন দেখলে তা মনের আয়নায় গেঁথে নিতেন। গ্রামে বিয়ের সময় কনে সাজানোর জন্যও তার সুনাম ছিল। আলপনা আঁকতেন। মায়ের কাঁথা সেলাই দেখে দেখে তিনিও হয়ে উঠেছিলেন একজন সহজাত সূচি শিল্পী। গ্রামের মেয়েদের সাদামাটা সব নকশি কাঁথার ডিজাইনকে তিনি তার হাতের ছোঁয়া আর শিল্পী মন দিয়ে অন্য মাত্রা দিতে লাগলেন। যদিও বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে একজন পুরুষ মানুষের এসব কাজে আগ্রহকে তাচ্ছিল্যের চোখেই দেখা হয়। কিন্তু শিল্পের প্রতি অদম্য ক্ষুধা তাঁকে দিয়ে এসবই করিয়ে নেয়।

এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালে তিনি আরও লাখো হতভাগ্য মানুষের মত ভাগ্যান্বেষণে ‘রাজধানীর বুকে’ আসেন। শহরের কঠিন জীবন সংগ্রাম। একদিন আড়ং এর শো রুম দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। যদি ওই শোরুমের ডলের পরনে তার ডিজাইন করা একটি পোশাক তিনি পরিয়ে দিতে পারতেন! তিনি জীবনকে সার্থক বলে মনে করতেন! সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকক্ষণ তিনি যেন স্বপ্নের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। একদিন সে সুযোগও এসে যায়। আসলে মনে স্বপ্ন থাকলে, আর সে স্বপ্নের পেছনে সঠিক পথে পরিশ্রম করে গেলে সাফল্য একদিন ধরা দেয়। ক্রমে তিনি আড়ং এর অন্যতম খ্যাতিমান ও নির্ভরযোগ্য প্রডিউসার (সাপ্লায়ার) হয়ে ওঠেন। তার দক্ষতা, পরিশ্রম, সততা আর অধ্যবসায় তাকে এই জায়গায় নিয়ে আসে। আড়ং এর

সাথে কাজ করে তিনি তার শিল্পকে যোগ্য মর্যাদায় নিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে বলাই বাহুল্য যে তার এই পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। তবে শিল্প আর উন্নত রুচির প্রতি তার যে ভালোবাসা আর আস্থা সেটা তাঁকে সব সময় ভেতর থেকে উৎসাহ জুগিয়ে গেছে।

ঝিনাইদহের, শৈলকুপা থানার লক্ষণদিয়ায় তাঁর গ্রামের বাড়ির সূচি শিল্পী ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে সূচী শিল্পীদের নিয়ে সংগঠিত করে নিজে প্রশিক্ষণ দেন। এভাবে তিলে তিলে কাজ করে এক দক্ষ কর্মী বাহিনী তিনি তৈরি করেন। পৈতৃক সূত্রে বাড়িতে তিনি ১০ কাঠা জমি পেয়েছিলেন। আশেপাশে আরও কিছু জমি তিনি কিনে সেখানে একটি সুন্দর বাড়ি তৈরি করেন ২০১৪ সালে, উদ্দেশ্য ছিল এখানে গ্রামের মহিলারা এসে সেলাইয়ের কাজ গুলো করবেন। তবে বাস্তবে দেখা গেল, গ্রামের মহিলারা বাড়িতে বসেই কাজ করতে আগ্রহী। তারা নিজ বাড়িতে বসে ঘরের কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে নকশি কাঁথায় নকশা তুলতে স্বচ্ছন্দ।

নকশি কাঁথা বাংলাদেশের নিজস্ব এক গৌরবময় ঐতিহ্য। যন্ত্রের প্রভাব, মানুষের জটিল হয়ে ওঠা জীবন, অস্থিরতা এ সবের প্রভাবে নকশি কাঁথা প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছে। গ্রামীণ নারীরা এখন আর ঘরে ঘরে সুঁই সুতা নিয়ে এ ধরণের শিল্পের চর্চা করেন না। আবার পরিবর্তন বা আধুনিকতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই শিল্পকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়ার তেমন কোন সু-সংগঠিত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ চোখে পড়েনা।

আমিনুল ইসলামের মত কিছু মানুষ কেবল শিল্পের টানেই এরকম নানা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমিনুল ইসলামের ডিজাইন করা নকশি কাঁথার সৌন্দর্য আর মান এক কথায় তুলনা বিহীন। তাই তাঁর বানানো নকশি কাঁথা সামগ্রীর দামও বেশি। সুঁই সুতায় তোলা নানা সুক্ষ্ম কাজের এসব সামগ্রীতে জড়িয়ে থাকে একজন বা একাধিক গ্রামীণ কারু শিল্পীর অনেকদিনের সযত্ন পরিশ্রম আর ভালোবাসা!

গ্রামের একদল কারুশিল্পীকে (তারা প্রধানত নারী) প্রশিক্ষণ দিয়ে, শিখিয়ে পড়িয়ে তাঁদের কাছ থেকে বিশ্ব মানের শিল্প তৈরি করিয়ে আনা এক কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজটিই আমিনুল ইসলামের ভালোবাসার কাজ। এ কাজে তাঁর কোন ক্লান্তি নেই, কোন অবহেলা নেই।

শিল্পী মাত্রই সম্ভবত প্রেমিক! এই প্রেম নানা প্রকারের হতে পারে। আমিনুল ইসলাম একজন প্রকৃতি-প্রেমী। অর্থাৎ গাছ, পাখি সহ প্রকৃতির অন্যান্য বিষয়কে তিনি ভালোবাসেন। সেসবের সংরক্ষণে চেষ্টা করেন। তাঁর গ্রামের বাড়িতে তৈরি করা দ্বিতল বাড়িটিকে তিনি এক গাছের সংগ্রহশালা করে তোলার উদ্যোগ নেন।

ইতিমধ্যে তার এই বাড়ির মোট জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ বিঘা। তার এই বাড়িতে এখন ১০ হাজারের বেশি গাছ আছে। দেশ বিদেশের ৫০০’র বেশি প্রজাতির গাছ তার বাড়িকে এক সবুজের স্বর্গে পরিণত করেছে।
গাছে গাছে পাখির বাসা। মানুষের মুখে মুখেই এই বাড়ির নাম গাছবাড়ি। নানা জায়গা থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা এই বাড়ি দেখতে আসেন। আমিনুল গাছের ভাষা বুঝতে পারেন। তাঁকে পেলে গাছেরাও হেসে ওঠে, তিনি বৃক্ষের সেই হাসি দেখতে প্রতি মাসেই অন্তত একবার ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন। গাছের যত্ন নিয়ে, নিজের জন্য প্রাণ শক্তি আহরণ করে ২/৩ দিন পরে ঢাকায় ফেরেন। তার ঢাকার বাড়িটিতেও গাছেদের রাজত্ব। ছাদে, বারান্দায়, জানালায় সর্বত্র গাছ আর গাছ!
সূচিশিল্পী আমিনুল আর বৃক্ষপ্রেমী আমিনুল একে অন্যের পরিপূরক। কারণ তিনি নানা প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ থেকে তাঁর শিল্পকর্মের জন্য ডিজাইন খুঁজে বের করেন।

হয়তো সে কারণেই তাঁর কাজগুলো এতো মনোগ্রাহী!
আমিনুল স্বপ্ন দেখতেন তাঁর গ্রামকে তিনি এক ফুলের গ্রাম বানাবেন। সে উদ্দেশ্যে রাস্তার ধারে, স্কুল কলেজের চারিপাশে কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, কেশিয়া, অশোক গাছের সারি লাগিয়েছিলেন। তবে সাধারণ মানুষ এসবের গুরুত্ব না বুঝলে যা হবার তাই হয়েছে। বেশির ভাগ গাছই মরে গেছে, মানুষ ইচ্ছে করে অনেক গাছ নষ্ট করেছে। মানুষের এসব ক্ষুদ্রতায় তিনি মনে কষ্ট পেলেও তা নিজের মধ্যেই রাখেন।
এক পুত্র এক কন্যার জনক আমিনুল ইসলাম সংগীত অন্তপ্রাণ একজন কারু শিল্পী। তাই সংগীত শিল্পীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা অকৃত্রিম। তিনি রাঁধেন অসাধারণ। তাঁর ঘর গোছানোর কাজটিও অতি উচ্চমার্গীয় পর্যায়ের।
একজন জন্ম-শিল্পী আমিনুল ইসলাম। মায়ের হাতে সুঁই সুতার কাজ দেখে শৈশবে শিল্পের প্রতি আকর্ষণ। সেই আকর্ষণই তাঁকে পরিণত করেছে আজকের সুচি শিল্পী ও উদ্যোক্তা আমিনুল ইসলামে। বাংলা সেলাই নামে তাঁর নিজস্ব এক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

আড়ং এ নিয়মিত হাতের কাজের (হ্যান্ড এম্ব্রয়ডারী) সামগ্রী সরবরাহ করছেন।
আমন্ত্রিত হয়ে ইউরোপ, জাপান, কোরিয়া সহ নানা দেশে তিনি গিয়েছেন তাঁর এই কাজ নিয়ে।
তাঁর নকশি কাঁথা হাতের কাজ ফ্যাশন দুনিয়ার রাজধানী প্যারিসের ফ্যাশন শোতেও তার চমক দেখিয়ে এসেছে। সব জায়গাতেই প্রশংসিত হয়েছেন, পেয়েছেন সম্মান।
দেশের মধ্যেও নানা সংগঠন তাঁকে সম্মাননা দিয়ে সম্মান জানিয়েছে। এর মধ্যে আছে- সোনারং তরুছায়া সম্মাননা ২০১৮, শেরে বাংলা গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড ২০২১, আড়ং এর ৪০ বছর উপলক্ষ্যে সেরা মান পুরষ্কার, ক্যানভাস অব বাংলাদেশ কর্তৃক এস এম সুলতান সম্মাননা ২০১৭, মাদার তেরেসা শাইনিং পারসোনালিটি গোল্ড অ্যাওয়ার্ড ২০১৭।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

লেখক ইশতিয়াক রুপু’র স্মৃতিচারনমূলক গদ্যের বই ‘জলজোছনার জীবনপত্র’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে ফ্যাশন ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে পণ্য তৈরিতে জোর হুয়াওয়ের

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আসন্ন সিরিজের জন্য অনুশীলন শুরু করেছে বাংলাদেশ দল

প্রবাসে দলাদলি, মারামারি, রক্তারক্তি আর কত? এতে বাঙালি কমিউনিটির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের (এমডি) অ্যানা বেজার্ড এর

বিপিএল এর কিছু প্লেয়ার এর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন কোচ হাথুরু

বসে বসে কাজ, ডেকে আনে সর্বনাশ

বড়লেখায় ভাষা শহীদদের প্রতি নিসচা’র শ্রদ্ধা নিবেদন: নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ

প্রতিদিন শ্যাম্পু করা ও হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার কি চুলের ক্ষতি করে?

রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণ কী?

১০

যেসকল দেশের নাগরিকরা ভিসা ছাড়া উমরাহ পালন করতে পারবেন

১১

বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলো আর্জেন্টিনা

১২

হার্ট সতেজ রাখতে প্রয়োজন খাদ্যভ্যাসে ৫টি পরিবর্তন

১৩

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর উপায়

১৪

টং টং: বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিশু

১৫

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: ২ বাংলাদেশি যুবক নিহত

১৬

রাশিয়ায় কারাবন্দী বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির মৃত্যু

১৭

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড: নতুন চুক্তিতে সাকিব-শান্তদের বেতন

১৮

পাকিস্তানের নির্বাচনে যেভাবে ভূমিকা বদল হল ইমরান খান ও নওয়াজ শরিফের

১৯

মিয়ানমার সংকট: চীন-ভারতের স্বার্থ আর বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

২০