বাংলা সংবাদ ডেস্ক
৭ জানুয়ারী ২০২৫, ৫:০৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কেন পদত্যাগে বাধ্য হলেন জাস্টিন ট্রুডো

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর পদত্যাগের ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এক দশক আগে তরুণ, উদ্যমী ও প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতীক হিসেবে ক্ষমতায় আসা ট্রুডো আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। তার দল লিবারেল পার্টি এবং দেশের জনসাধারণের মধ্যে বেড়ে চলা হতাশা, বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে।

 

ট্রুডোর পদত্যাগ কানাডার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি টানল। এখন প্রশ্ন উঠছে, কানাডার রাজনীতি কোন পথে এগোবে। লিবারেল পার্টি নতুন নেতা নির্বাচন করবে এবং সেই নেতা দেশের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। এ ছাড়া বিরোধী দলগুলোও তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে, যা আগামী নির্বাচনে প্রতিফলিত হতে পারে। কিন্তু কেন এত দ্রুত একটি রাজনৈতিক গৌরবময় শাসন শেষ হয়ে গেল-সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য ট্রুডোর শাসনামলের বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

 

বিবিসি বলছে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, লিবারেল পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ২৪ মার্চ পর্যন্ত কানাডার পার্লামেন্টের সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এই সময়ের মধ্যে নতুন নেতা বেছে নেবে লিবারেল পার্টি। ট্রুডো তার পদত্যাগের পেছনে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ট্রুডো তার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় কিছু আক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনি প্রক্রিয়ার সংস্কার সম্পন্ন করতে না পারা তার একমাত্র আক্ষেপ।

 

২০১৫ সালে জাস্টিন ট্রুডো কানাডার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সে সময় তিনি ছিলেন একজন তরুণ নেতা, যার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দেশকে পরিবর্তন করা। তার রাজনৈতিক বার্তা ছিল অত্যন্ত উদার, প্রগতিশীল এবং আশা জাগানিয়া। তার শাসনামলে কানাডার রাজনীতিতে তৃতীয় স্থানে থাকা লিবারেল পার্টি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করে, যা কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা ছিল। ট্রুডোর নেতৃত্বে কানাডা বিশ্ব মঞ্চে এক নতুন পরিচিতি অর্জন করে এবং দেশটির রাজনীতিতে একটি তরুণ, শক্তিশালী এবং উদারপন্থি মুখ হিসেবে পরিচিতি পায়।

 

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ট্রুডো। যেমন-কানাডার আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে জনসাধারণের জন্য ব্যাপক সহায়তা প্রদান। তার নেতৃত্বে শিশুকালীন সুবিধা ভাতা চালু করা হয়, যা দারিদ্র্য কমাতে সহায়ক হয়। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করেন, যা কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ ছাড়া তিনি কোভিড মহামারি সামলাতে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 

তবে রাজনৈতিকভাবে সফল হওয়ার পরও তার শাসনামলে চ্যালেঞ্জ কিন্তু ছিলই। সেসব চ্যালেঞ্জের মুখে বিগত কয়েক বছরে ট্রুডো সরকারের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর জন্য কিছু নৈতিক কেলেঙ্কারি এবং বিতর্ক দায়ী। এসএনসি-লাভালিন দুর্নীতির তদন্ত, বাহামায় বিলাসবহুল ভ্রমণের অভিযোগ এবং ২০২০ সালে সরকারি কর্মসূচির জন্য নিজের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি দাতব্য সংস্থাকে নির্বাচিত করা-এসব ঘটনাই ট্রুডো সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে। এসব কেলেঙ্কারি জনমত ও দলের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, যা তাকে ক্রমশ জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

 

নতুন করে আরও একাধিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ট্রুডোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। ২০১৯ সালে লিবারেল পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। ২০২১ সালের আগাম নির্বাচনেও দলের ভাগ্য বদলায়নি। এসবের জেরে নিজ দলেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন ট্রুডো। দলের মধ্যে অস্থিরতা, বিশেষত দলের উচ্চ পর্যায়ের সদস্যদের পদত্যাগ, তার শাসনের প্রতি বিরোধিতা আরও তীব্র করে তোলে। তার নিজ দলের কিছু নেতা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন যে, তারা ট্রুডোর নেতৃত্বে আর বিশ্বাসী নন। এ ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, কানাডার অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোও ট্রুডো সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে। এর ফলে দেশটির জনগণ তার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলতে থাকে এবং বিভিন্ন জরিপে লিবারেল পার্টির সমর্থন কমে যায়।

 

শেষ পর্যন্ত গত সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ট্রুডো পরিষ্কার করেন যে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও জনগণের ক্ষোভের মুখোমুখি হয়ে আর আগের মতো প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করতে পারবেন না। তিনি বলেন, আমার কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে আমাকে যদি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, তবে আমি ওই নির্বাচনে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী হতে পারব না। তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তে দেশটি নতুন নেতা খুঁজতে চলেছে এবং দলের মধ্যে নেতৃত্বের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে লিবারেল পার্টি নতুন নেতা বেছে নেওয়ার পরেও তাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকবে। বিশেষ করে কানাডার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে অর্থনীতি, অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো দলের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া পিয়েরে পোইলিয়েভের নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভরা যেভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, তা লিবারেলদের জন্য বড় একটি উদ্বেগের বিষয়।

 

জাস্টিন ট্রুডো কানাডার রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ, যিনি প্রাথমিকভাবে দেশের প্রগতিশীল পরিবর্তনের জন্য একটি প্রতীক ছিলেন। কিন্তু একাধিক রাজনৈতিক ভুল, নৈতিক কেলেঙ্কারি এবং জনগণের অসন্তোষের ফলে তার নেতৃত্বের অবসান ঘটে। এখন লিবারেল পার্টি একটি নতুন পথ অনুসরণ করতে যাচ্ছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

সূত্রঃ বিবিসি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জলবায়ু দুর্যোগে শিক্ষার সংকট, ক্ষতিগ্রস্ত ১ কোটি ২৭ লাখ শিশু

মার্কিন ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সুমাইয়া সমাজী

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেতে বাড়ছে ফি, আবেদনকারীদের গুনতে হবে অতিরিক্ত অর্থ

মিশিগানে ষ্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রার্থী মাহবুব খানের সাথে কমিউনিটির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

সিলেট সদর দক্ষিণ সুরমা অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগানের অভিষেক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ২৮ জুন

দুই দিনের সরকারি সফরে মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

৫ কোটি ২ লাখ অভিবাসী নিয়ে নতুন চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যায়

ট্রাম্পের ব্যবহারের জন্য নতুন বিলাসবহুল এয়ার ফোর্স ওয়ান

বিদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ জোরদার

গৃহস্থ ও প্রবীণদের আর্থিক স্বস্তিতে নিউইয়র্কের ২ বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ

১০

এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে ৪১ শতাংশ

১১

২৫০ বছর টিকবে কি যুক্তরাষ্ট্র? প্রশ্ন তুলেছেন ৩৮% মার্কিনি

১২

মিশিগানে সাবেক এমপি ফরিদ চৌধুরী সরণে দোয়া মাহফিল সম্পন্ন

১৩

ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে ফাঁদ প্রতারকের টোপে পড়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন তরুণ-তরুণীরা

১৪

প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন তৈরি করল এআই, রোগ প্রতিরোধে নতুন আশা

১৫

চার্জে দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ?

১৬

আদালতের সিদ্ধান্তের পর কেনেডি সেন্টার থেকে বাদ ট্রাম্পের নাম

১৭

মিশিগানে ষ্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রার্থী সীমা আহমেদ’র সংবাদ সম্মেলন

১৮

সোশ্যাল সিকিউরিটি সংকটে নিউইয়র্কে বাড়ছে অবসরপ্রাপ্তদের উদ্বেগ

১৯

পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ, মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়লেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ

২০