আবুল কাসেম
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ৬:০২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে

যুক্তরাজ্যে থাকাকালে টেলিভিশন উপস্থাপনায় যখন বেশ ব্যস্ত সময় কাটছিলো ঐ সময়ে এনটিভির নিয়মিত অনুষ্ঠান বসন্ত বাতাসে উপস্থাপনার দায়িত্ব এসে পড়লো আমার উপর। আমি খুব আনন্দচিত্তে দায়িত্বটা গ্রহণ করি এবং খুব প্রাণবন্ত সময় পার করছিলাম অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। কোন কাজ করলে সেটা জেনেবুঝে করার চেষ্টা করি, তাই বাউল শিল্পীদের সান্নিধ্য পাওয়ায় তাঁদের জীবনযাপন নিয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হয়।

এই আগ্রহ আমাকে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে। শৈশব হতেই এই নামটির সঙ্গে পরিচিত কিন্তু কখনও দেখা হয়নি কিংবা দেখার আগ্রহ কাজ করেনি কিন্তু যুক্তরাজ্যজুড়ে সিলেটি লোকজনের নিকট জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই খ্যাতনামা বাউল আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন ‘বসন্ত বাতাসে’ অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে। এই অনুষ্ঠানের নামকরণ বাউলের একটি গান থেকে নেওয়া।

‘বাউল’ বললেই আমাদের চিন্তা-চেতনায় দৃশ্যমান হয় সংসার ত্যাগী একতারা দোতারা হাতে গেরুয়া পোশাক পরা লোকজনের চিত্র। শাহ আবদুল করিমকে জানতে কিংবা বুঝতে গিয়ে দেখি এ এক ভিন্ন জগত। সংসার ত্যাগ নয় বরং সংসারে মজে থেকে নিজেকে গানের মধ্যে সঁপে দেওয়া অনবদ্য এক জীবন। করিম নিজেই গানে গানে বলেছেন- গান গাই আমার মনরে বুঝাই / মন থাকে পাগলপারা / আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া, গান ছাড়া।

কালনী তীরের কাদা মাখা রাখাল বালকটি একদা নিজ গুণে হয়ে উঠেন বাউল সম্রাট। দারিদ্র আর ধর্মীয় গোড়ামির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়তে হয়েছে তাঁকে। ভাটির দেশে গান মিশে আছে মানুষের রক্তের সাথে সুতরাং গানে মজতে খুব কিছুর প্রয়োজন হয়নি বাউল করিমের। ‘ভাবিয়া দেখ মনে/ মাটির সারিন্দারে বাজায় কোন জনে।’ এ গানটি তাঁকে খুব অনুপ্রাণিত করেছে গানের পথে পা বাড়াতে।

মাটির সারিন্দারে কে বাজায় সেটা ভাবতে ভাবতেই হয়ে উঠেন বাউল। সংগীতকেই করেন আদর্শের পাঠশালা। সেই পাঠশালায় জীবনভর শিক্ষকতা করেন বাউল করিম। সুরের মায়াজালে আবদ্ধ করেন আপামর মানুষকে। তাঁর শিষ্য, ভক্ত নেহাত কম নয়। গাঁয়ের মানুষের পাশাপাশি শহরের উঁচু শ্রেণির লোকজনদেরও তিনি তাঁর কথায়-সুরে মাতোয়ারা করেন। গানে গানে বন্ধুরে দেখতে গিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত নতুন করে দেখা দেন ভক্তের অন্তরে।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে স্বশরীরে দিরাই থেকে সুদূর লন্ডন নিয়ে যায়। সংগীতে কোনো সীমানা নেই তাই সীমানাহীন সংগীত ভুবনে রাজত্ব করেন বহুকাল। খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন একেবারেই সাদামাটা। চলার পথে লড়াইয়ে সবসময় পাশে পেয়েছিলেন স্ত্রী সরলাকে। বাউল করিমের জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল প্রিয়তমা স্ত্রী সরলার পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া। বিনিময়ে তাঁর ভক্তকূল পেয়েছে বহু বিরহী গান।

বাউল করিম মনেপ্রাণে চাইতেন তাঁর গানের কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ুক মানুষের অন্তরে, জীবন কর্মে। একটি আদর্শ ছড়িয়ে জিতে তিনি প্রচারক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ভারতীয় শিল্পী কালিকাপ্রসাদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিষয়ে আলোকপাত করেন। শিল্পী কালিকাপ্রসাদ বাউল শাহ আবদুল করিমকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “মানুষ আপনার গান বিকৃত সুরে গায়। আপনার সুর ছাড়া অন্য সুরে গায়। অনেকে আপনার নামটা পর্যন্ত বলে না। এসব দেখতে আপনার খারাপ লাগে না?”
শাহ আবদুল করিম বললেন, “কথা বোঝা গেলেই হইল। আমার আর কিচ্ছু দরকার নাই।” কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য আশ্চর্য হয়ে বললেন, “আপনার সৃষ্টি, আপনার গান। মানুষ আপনার সামনে বিকৃত করে গাইবে। আপনি কিছুই মনে করবেন না। এটা কোনো কথা, এটার কোনো অর্থ আছে!”
জবাবে বাউল করিম বললেন, “তুমি তো গান গাও, আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। ধরো, তোমাকে একটা অনুষ্ঠানে ডাকা হলো। হাজার হাজার চেয়ার রাখা আছে, কিন্তু গান শুনতে মানুষ আসেনি। শুধু সামনের সারিতে একটা মানুষ বসে আছে। গাইতে পারবে?” কালিকাপ্রসাদ কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলেন, “না, পারব না।”

বাউল করিম হেসে বললেন, “আমি পারব। কারণ আমার গানটার ভেতর দিয়ে আমি একটা আদর্শকে প্রচার করতে চাই, সেটা একজন মানুষের কাছে হলেও। সুর না থাকুক, নাম না থাকুক, সেই আদর্শটা থাকলেই হলো। আর কিছু দরকার নাই? সেজন্যই বললাম শুধু গানের কথা বোঝা গেলেই আমি খুশি।”

কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য জানতে চাইলেন, “সেই আদর্শটা কী?” বাউল করিম বললেন, “একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে।”
ভাটি অঞ্চলের সুখ-দুঃখ গানে তুলে এনেছেন বাউল করিম। প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর গান অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলেছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীর লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন তবুও কখনও নিজের আদর্শ হতে বিচ্ছুত হননি। তাঁর গান ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, কাগমারী সম্মেলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে মানুষকে প্রেরণা দিয়েছে।

গান গেয়েই মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক গুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছেন। প্রায় দেড় হাজারের মতো গান রচনা করেছেন বাউল করিম। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ৭টি। স্বরচিত গ্রন্থগুলো হলো: আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে ও শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে তাঁর ১০টি গান ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।

বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে অনেকেই গ্রন্থ লিখেছেন। জীবনী নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র, প্রামাণ্য চিত্র। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবন, সংগীত ও দর্শন নিয়ে তৈরি হয়েছে মঞ্চনাটক।

শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কালনী নদীর হাওয়া মেখে কাটানো জীবনে সময়ের পথ পরিক্রমায় তিনি হয়ে উঠেন বাউল গানের জীবন্ত কিংবদন্তী। বেঁচে থাকা সময়ে বিজ্ঞজনেরা তাঁকে ‘বাউল সম্রাট’ হিসেবে অভিহিত করতেন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে সিলেটের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন ভাটির এই গুণী মানুষ।

বাউল শাহ আবদুল করিমের স্বপ্ন ছিল একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে থেকেও তাঁর জীবদ্দশায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শাহ আবদুল করিম সংগীতালয়। এখানে ভক্ত-শিষ্যরা বাউলগানের সুর ও বাণী ঠিক রেখে গান চর্চা করবেন, তরুণরা লোকসংগীত চর্চা করবেন এই ছিল প্রত্যাশা।

সমগ্র জীবনজুড়ে করিম মুর্শিদ চেনার কাজটি করে গেছেন। মুর্শিদ ধনকে চিনতে তিনি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখ পাড়ি জমান ওপারে।
‘মায়া জালে বন্দি হয়ে আর কত কাল থাকিব / মনে লয় সব ছাড়িয়া তোমারে খুঁজে নিব’ হ্যাঁ, খুঁজে তিনি নিয়েছেন জীবদ্দশায়। ওপারেও নিশ্চয়ই খুঁজে নিবেন! স্বশরীরে উজানধলে তিনি না থাকলেও দীপ্যমান হয়ে রয়েছেন ভক্তের অন্তরে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

লেখক ইশতিয়াক রুপু’র স্মৃতিচারনমূলক গদ্যের বই ‘জলজোছনার জীবনপত্র’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে ফ্যাশন ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে পণ্য তৈরিতে জোর হুয়াওয়ের

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আসন্ন সিরিজের জন্য অনুশীলন শুরু করেছে বাংলাদেশ দল

প্রবাসে দলাদলি, মারামারি, রক্তারক্তি আর কত? এতে বাঙালি কমিউনিটির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের (এমডি) অ্যানা বেজার্ড এর

বিপিএল এর কিছু প্লেয়ার এর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন কোচ হাথুরু

বসে বসে কাজ, ডেকে আনে সর্বনাশ

বড়লেখায় ভাষা শহীদদের প্রতি নিসচা’র শ্রদ্ধা নিবেদন: নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ

প্রতিদিন শ্যাম্পু করা ও হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার কি চুলের ক্ষতি করে?

রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণ কী?

১০

যেসকল দেশের নাগরিকরা ভিসা ছাড়া উমরাহ পালন করতে পারবেন

১১

বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলো আর্জেন্টিনা

১২

হার্ট সতেজ রাখতে প্রয়োজন খাদ্যভ্যাসে ৫টি পরিবর্তন

১৩

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর উপায়

১৪

টং টং: বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিশু

১৫

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: ২ বাংলাদেশি যুবক নিহত

১৬

রাশিয়ায় কারাবন্দী বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির মৃত্যু

১৭

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড: নতুন চুক্তিতে সাকিব-শান্তদের বেতন

১৮

পাকিস্তানের নির্বাচনে যেভাবে ভূমিকা বদল হল ইমরান খান ও নওয়াজ শরিফের

১৯

মিয়ানমার সংকট: চীন-ভারতের স্বার্থ আর বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

২০