রোসা ব্রুকস
১ জুলাই ২০২৬, ৫:০৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

৯/১১ পরবর্তী ‘ওয়ার অন টেরর’র ধাক্কা আমেরিকা এখন টের পাচ্ছে কি

৪০ বছরের বেশি বয়সী অন্য সব মার্কিন নাগরিকের মতো আমারও মনে আছে, যখন ৯/১১ হামলার খবর পাই, তখন আমি কোথায় ছিলাম। আমি গাড়ি চালিয়ে অফিসে যাচ্ছিলাম, রেডিওতে ‘ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও’ শুনছিলাম।

 

 

অফিসে পৌঁছানোর পর দেখলাম লোকজন স্তব্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ কাঁদছিল। অন্যরা কম্পিউটার মনিটরের চারপাশে জড়ো হয়েছিল। প্রতিটি স্ক্রিনে বারবার একই দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল—টাওয়ার দুটিতে বিমান আছড়ে পড়ছে, কিছু মানুষ শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, টাওয়ারগুলো ধসে পড়ছে, ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপের মেঘ উড়ছে।

 

 

তখনো কেউ খুব বেশি কিছু জানত না। আল-কায়েদা তখন পর্যন্ত তেমন পরিচিত ছিল না। ওসামা বিন লাদেনের দলই যে এই হামলা চালিয়েছে, তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের কয়েক দিন সময় লেগেছিল। কিন্তু সেই প্রথম স্তব্ধ মুহূর্তগুলোতেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল—এ ঘটনা আমাদের পৃথিবীকে বদলে দেবে, আর তা মোটেও ভালোর জন্য নয়।

 

 

প্রায় ২৫ বছর পর সেই ক্ষতির পরিমাপ করা এখন সহজ। এ হামলা মার্কিন বৈশ্বিক নেতৃত্বের পতনের সূচনা করেছিল। এটি আমাদের স্থায়ী ভয় ও জরুরি অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। এটিই পরবর্তী সময়ে আমাদের গণতন্ত্রের দ্রুত পতনকে ত্বরান্বিত করে।

 

৯/১১-এর ঘটনা বা সামগ্রিকভাবে আল-কায়েদা, যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য কোনো হুমকি ছিল না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এর অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারত এবং কাটিয়ে উঠেছিলও। একটি বিশাল দেশের বাস্তব পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলে যে দেশে প্রতিবছর সাধারণত ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, সেখানে ৯/১১-এ ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও তা দেশকে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো ছিল না। আমাদের অনুমেয় অতি প্রতিক্রিয়াই আসলে আমাদের ধ্বংস ডেকে এনেছে।

 

৯/১১-এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে আক্রমণ করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় ২০ বছর দীর্ঘ এক যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে ৬ হাজারের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্যের প্রাণ কেড়ে নেয়। হামলার ছয় সপ্তাহ পর কংগ্রেস ‘ইউএসএ পেট্রিয়ট অ্যাক্ট’ পাস করে। এর মাধ্যমে সরকারি নজরদারি ও আটকের ক্ষমতা এমনভাবে বাড়ানো হয়, যা আগে ভাবাও যেত না।

 

হামলার ছয় মাসের মধ্যে বুশ একটি নির্দেশিকায় সই করেন, যেখানে বলা হয়, আল-কায়েদার সঙ্গে সংঘাতে ‘জেনেভা কনভেনশন’ প্রযোজ্য হবে না। এর এক বছর পর আমরা ইরাকেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। সে সময় সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এবং তিনি আল-কায়েদাকে সাহায্য করছেন বলে মিথ্যা দাবি করা হয়েছিল। সেই যুদ্ধেও ৮ হাজারের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হন।

 

২০০৪ সালের শেষের দিকে, ৯/১১-এর পর আমেরিকার প্রতি বিশ্বজুড়ে যে সহানুভূতির জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তা উবে যায়। এর অন্যতম কারণ ছিল লাশের পাহাড়। ইরাক, আফগানিস্তান এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের অন্যান্য দূরবর্তী ঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর সেনা নিহতের পাশাপাশি লাখ লাখ আফগান ও ইরাকি নাগরিক মারা যান। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা এবং নির্যাতনের অনুমোদন দিয়ে বুশ প্রশাসন নৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানও হারিয়েছিল। মার্কিন সেনাদের হাতে ইরাকি বন্দীদের নগ্ন করে মানুষের পিরামিড বানানোর ছবি যাঁরা একবার দেখেছেন, তাঁরা তা সহজে ভুলতে পারেননি।

 

তবে বুশ ক্ষমতা ছাড়ার পরও এই আত্মঘাতী ক্ষতি থামেনি। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বুশ প্রশাসনের অনেক চরম নীতি, যেমন নির্যাতন বন্ধ করেছিলেন, কিন্তু এই ‘অনন্ত যুদ্ধ’ শেষ করা কঠিন ছিল। ওবামা স্বীকার করেছিলেন যে শুধু একের পর এক সন্ত্রাসী মেরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, কিন্তু তা–ও তিনি থামতে পারেননি।

 

 

তিনি বিশ্বজুড়ে ড্রোন হামলা এবং সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের টার্গেট করে হত্যার পরিধি বাড়ান। বুশ প্রশাসনের নির্যাতনের মতোই, এই টার্গেট কিলিং কর্মসূচিতে কোনো আইনি প্রক্রিয়ার বালাই ছিল না, যা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের আমলেও চলেছে। নির্বাহী বিভাগ দাবি করেছিল যে গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে তারা যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে, যেকোনো মানুষকে হত্যা করার অধিকার রাখে এবং সেই প্রমাণ তারা প্রকাশও করবে না। অর্থাৎ সরকার নিজেই বিচারক, জুরি ও জল্লাদ সেজে বসেছিল।

 

 

৯/১১-এর ধাক্কা দেশের ভেতরেও লেগেছিল। ২০০১ সালের পেট্রিয়ট অ্যাক্ট ছিল কেবল শুরু। নজরদারি ও আটকের ক্ষমতা বাড়তেই থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে তৈরি হওয়া নজরদারি প্রযুক্তি পরবর্তী সময়ে ফেডারেল, রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের পুলিশ ব্যবহার করা শুরু করে। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া আইনি নীতিগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় প্রয়োগ হতে থাকে। একটি নিষ্ক্রিয় কংগ্রেস নির্বাহী বিভাগের কাছে ক্রমাগত ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ায়, ৯/১১-এর পর দেওয়া ‘জরুরি’ ক্ষমতাগুলো স্থায়ী রূপ নেয়।

 

 

এর চেয়েও ক্ষতিকর বিষয় হলো, আমেরিকা ভয় ও পারস্পরিক সন্দেহের এক জাতিতে পরিণত হয়। ৯/১১-এর আগে মার্কিন নাগরিকদের মনে যে অভেদ্যতার অনুভূতি ছিল, তা ভেঙে যাওয়ার পর তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। ইসলামবিদ্বেষ ও বিদেশিবিদ্বেষ বেড়ে যায়।

 

 

নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে—যেমন, এই হামলা ছিল ভেতরেরই কোনো কাজ কিংবা ইসরায়েলের চক্রান্ত, অথবা ওয়াল স্ট্রিটের এলিটদের পরিকল্পনা, যারা এর মাধ্যমে মুনাফা লুটেছে। রাজনৈতিক মেরুকরণও বাড়ে। ২০১৪ সালের মধ্যে এক-চতুর্থাংশের বেশি ডেমোক্র্যাট এবং এক-তৃতীয়াংশ রিপাবলিকান অন্য রাজনৈতিক দলকে ‘দেশের মঙ্গলের জন্য হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। চরমপন্থী ও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো শক্তি সঞ্চয় করে।

 

 

অবশ্য আমেরিকার গণতন্ত্রের পতনের একমাত্র কারণ ৯/১১ ছিল না। তবে এটি এমন আইনি, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা পতনকে ত্বরান্বিত করে। ২০১৫ সালের মধ্যে নিউইয়র্কের এক রিয়েলিটি শো তারকা যখন ক্ষমতায় আসতে শুরু করেন, তখন আমাদের দেশ ভেতর থেকেই একজন স্বৈরাচারী শাসকের কবজায় যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। অভ্যন্তরীণ বিভাজনে দুর্বল এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনি নিয়ম লঙ্ঘনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া একটি দেশের গণতন্ত্র হোয়াইট হাউসের একজন স্বৈরাচারীর সামনে কীভাবেই-বা টিকে থাকবে?

 

 

  • রোসা ব্রুকস জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক। ইকোনমিস্ট থেকে অনূদিত।

 

 

 

 

 

 

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মুসলিম যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরে অজুর সুবিধা চালু যুক্তরাষ্ট্রে

বিদেশি অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাইবার হামলার ক্ষমতা পেল মার্কিন কোম্পানি

ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড বাণিজ্য, নিউইয়র্কে ফেডারেল অভিযানে ১১ গ্রেপ্তার

তথ্য বিক্রিকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন আইনি লড়াই

হোয়াইট হাউসে বড় রদবদল, প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ছেন লেভিট

নিউইয়র্কে ২০২৭ থেকে মেডিকেইডে নতুন শর্ত, ঝুঁকিতে যেসব সুবিধাভোগী

মিনেসোটার পঞ্চম আসনে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বড় জয় ইলহান ওমরের

সব বিষয়ে এ+; রোদেলার চোখে এখন সাদা অ্যাপ্রনের স্বপ্ন

মিশিগানে বাংলা সংবাদ কার্যালয়ে সৈয়দ উতবার সৌজন্য সাক্ষাৎ

আবদুল এল-সায়েদ নির্বাচিত হলে নাতনিদের স্কুলে বোরকা পরে যেতে হবে: ন্যান্সি মেস

১০

নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের নেতৃত্বে প্রথম সাউথ এশিয়ান ইউনিটি প্যারেড

১১

অবশেষে বিয়ে করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

১২

২৩৮ মিলিয়ন ডলার লোকসান গুনল ট্রাম্পের মিডিয়া কোম্পানি

১৩

শিশুদের টিকা নীতিতে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ

১৪

যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন

১৫

মিশিগানে বাংলা প্রেস ক্লাবের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও ফ্যামিলি ডে উদযাপন

১৬

ইরানের হামলার আশঙ্কায় খাবারের কার্টে করে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প

১৭

মিশিগানে ১৫ আগস্ট শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ফুলমুন ইসলামিক কালচারাল ফেস্টিভ্যাল

১৮

মিশিগানে আম-কাঁঠালি উৎসবে বাঙালির মিলনমেলা

১৯

মিশিগানে মুনার দাওয়াহ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত অংশ নেন হাজারো মানুষ

২০