শৈশবে ভাইবোনদের জন্য রান্না, যৌবনে একের পর এক পেশা, মধ্যবয়সে পথের ধারে খাবারের দোকান। তারপর ষাট পেরিয়ে নিজের রেস্তোরাঁ হারানো। হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্সের জীবনের সবচেয়ে পরিচিত অধ্যায়টি শুরু হয়েছিল এই বিপর্যয়ের পরেই।
কেএফসির লোগোতে তাঁর মুখটি এতবার দেখা হয়েছে যে মানুষটিকে যেন বহুদিনের চেনা মনে হয়। সাদা স্যুট, কালো টাই, চশমা আর হাসি- এমন একজন বৃদ্ধ, যাঁর নাম শুনলেই মনে পড়ে ফ্রায়েড চিকেনের কথা। অথচ ছবিটির আড়ালে থাকা হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্সের জীবন ছিল অনিশ্চয়তা, পরিশ্রম এবং বারবার পথ বদলানোর ইতিহাস। তাঁর গল্পে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টি হয়তো ব্যবসায়িক সাফল্যও নয়। যে বয়সে অনেকেই কাজ গুটিয়ে নেন, সেই বয়সে তিনি নিজের পরিচিত রেস্তোরাঁটি হারিয়ে নতুন ব্যবসার উপায় খুঁজেছিলেন। নিজের রান্না করা চিকেন নিয়ে অন্য রেস্তোরাঁর দরজায় দরজায় গিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগই একদিন কেন্টাকির পথের ধারের খাবারকে পৌঁছে দেয় বিশ্বের নানা প্রান্তে।
১৮৯০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানায় জন্ম স্যান্ডার্সের। অল্প বয়সে তাঁর বাবা মারা গেলে সংসার চালাতে মাকে বাড়ির বাইরে কাজ করতে হয়। ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার পাশাপাশি খাবার তৈরির দায়িত্বও এসে পড়ে হারল্যান্ডের ওপর। তখন রান্না তাঁর কাছে শখের চেয়ে বেশি ছিল পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন। কিন্তু সেই রান্নাঘরেই তিনি এমন একটি দক্ষতা অর্জন করেন, যা বহু বছর পর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
কৈশোরে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর বাড়ি ছেড়ে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন স্যান্ডার্স। এরপর তাঁর জীবনে এসেছে বিচিত্র সব পেশা। খামারে কাজ করেছেন, ট্রাম ও রেলপথে চাকরি করেছেন, সেনাবাহিনীতেও কিছুদিন ছিলেন। চিঠিপত্রের মাধ্যমে আইন পড়ে ওকালতি শুরু করেছিলেন, কিন্তু আদালতে এক মক্কেলের সঙ্গে বিবাদের পর সেই পেশায় তাঁর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়। ফেরি ব্যবসা, বিমা ও টায়ার বিক্রির কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। কোনো কাজেই দীর্ঘদিন স্থির হতে পারেননি, তবে জীবিকা খোঁজার চেষ্টা থামাননি।
এই সময়ে জোসেফিনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে ছিল। ছেলেকে তরুণ বয়সে হারান স্যান্ডার্স। তাঁর কর্মজীবনের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও আসে টানাপোড়েন। পরে জোসেফিনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় এবং ক্লদিয়া তাঁর জীবনসঙ্গী হন।
এই ক্লদিয়াই স্যান্ডার্সের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন। কেএফসির শুরুর দিকের ব্যবসায় ক্লদিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি গুলোয় পাঠানোর জন্য মসলা মেশানো, প্যাকেট করা ও সরবরাহের দায়িত্ব সামলাতেন। রেসিপিটি গোপন রেখে একই স্বাদের খাবার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ কাজের গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট।

স্যান্ডার্সের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে কেন্টাকির করবিনে। ১৯৩০ সালের দিকে সেখানে একটি সার্ভিস স্টেশন পরিচালনার সময় তিনি যাত্রীদের খাবার দিতে শুরু করেন। প্রথম দিকে তাঁর খাবারের পরিচয় শুধু ফ্রায়েড চিকেন ছিল না, বরং পথের মানুষের জন্য তৈরি সাধারণ খাবারই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করত। চাহিদা বাড়লে তিনি রেস্তোরাঁর পরিসর বাড়ান। ধীরে ধীরে তাঁর ক্যাফে হয়ে ওঠে দূরপথের যাত্রীদের পরিচিত বিরতিস্থল।
রান্নার স্বাদ নিয়ে স্যান্ডার্সের আগ্রহ ছিল, কিন্তু রেস্তোরাঁ চালাতে গিয়ে তিনি আরেকটি সমস্যা বুঝতে পারেন সেটা হচ্ছে সময়। প্রচলিত পদ্ধতিতে ভালোভাবে মুরগি ভাজতে অনেকক্ষণ লাগত। পথের যাত্রীদের সেই অপেক্ষা করানো কঠিন। আবার আগে থেকে বেশি পরিমাণ রান্না করেও সব সময় বিক্রি নিশ্চিত করা যেত না। তাই দ্রুত রান্না ও স্বাদ- দুই চাহিদা একসঙ্গে মেটানোর উপায় নিয়ে তিনি পরীক্ষা চালাতে থাকেন।
১৯৩৯ সালের দিকে চাপের মধ্যে মুরগি ভাজার পদ্ধতি তাঁর রান্নায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। একই সময়ে ১১ ধরনের ভেষজ ও মসলার মিশ্রণও তাঁর চিকেনের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। স্বাদ এবং তুলনামূলক দ্রুত পরিবেশনের এই সমন্বয়ই পরবর্তী ব্যবসার ভিত্তি তৈরি করেছিল।
তত দিনে তিনি ‘কর্নেল স্যান্ডার্স’ নামেও পরিচিত। ১৯৩৫ সালে কেন্টাকির গভর্নর তাঁকে সম্মানসূচক ‘কর্নেল’ উপাধি দেন। এটি সেনাবাহিনীর পদ ছিল না। পরে সাদা স্যুট, কালো টাই এবং চিবুকের দাড়ি স্বতন্ত্র সাজের সঙ্গে উপাধিটি এমনভাবে মিশে যায় যে হারল্যান্ড স্যান্ডার্সের চেয়ে ‘কর্নেল স্যান্ডার্স’ নামটিই বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। স্যান্ডার্সের ব্যবসার পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয় তাঁর চিকেন করবিনের বাইরে পৌঁছানোর মাধ্যমে। ১৯৫২ সালে উটাহর সল্টলেক সিটির কাছে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী পিট হারম্যান তাঁর রান্নার পদ্ধতিতে চিকেন বিক্রি শুরু করেন। এটিই কেএফসির প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে পরিচিত। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়, নিজের রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার পরে নয়, তার আগেই স্যান্ডার্স তাঁর খাবার অন্য রেস্তোরাঁয় বিক্রির পথ খুঁজে পেয়েছিলেন।
কিন্তু করবিনে তাঁর নিজের ব্যবসা তখন সংকটের দিকে এগোচ্ছিল। সড়কপথ বদলে যাওয়ায় ক্যাফের পাশ দিয়ে আগের মতো যাত্রী চলাচল করত না। যাত্রী কমা মানে ক্রেতা কমা। বহু বছরের শ্রমে গড়ে তোলা রেস্তোরাঁটি শেষ পর্যন্ত আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ১৯৫৬ সালে লোকসানে সেটি বিক্রি করতে হয়। যে ব্যবসা তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল, প্রায় ৬৬ বছর বয়সে সেটিই হাতছাড়া হলো। এই সময়ের বিবরণে স্যান্ডার্সের ১০৫ ডলারের সোশ্যাল সিকিউরিটি চেকের কথা প্রায়ই আসে। সেটি ছিল তাঁর মাসিক চেক, ‘তাঁর হাতে সব মিলিয়ে মাত্র ১০৫ ডলার ছিল’- এমন তথ্য নিশ্চিত নয়। গল্পটি বোঝার জন্য সংখ্যাটির চেয়েও বড় সত্য হলো, তিনি তখন আগের মতো রেস্তোরাঁ চালিয়ে যেতে পারছিলেন না। অথচ অন্য কোথাও তাঁর রান্নার পদ্ধতিতে চিকেন বিক্রি হচ্ছে- এই অভিজ্ঞতা তাঁর সামনে নতুন সম্ভাবনা খুলে দিয়েছিল।
রেস্তোরাঁ বিক্রির পর স্যান্ডার্স গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় যেতেন। মালিকদের সামনে চিকেন রান্না করে দেখাতেন, তাঁদের কর্মী ও ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইতেন। পছন্দ হলে প্রস্তাব দিতেন- তাঁর পদ্ধতি ব্যবহার করে চিকেন বিক্রি করা হবে, আর বিনিময়ে তিনি পাবেন বিক্রির ওপর সামান্য রয়্যালটি।
আজকের চোখে এটি একটি পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল। স্যান্ডার্সের জন্য তখন প্রতিটি নতুন রেস্তোরাঁকে রাজি করানো ছিল ব্যক্তিগত পরিশ্রমের কাজ। দীর্ঘ পথ গাড়ি চালাতে হতো, থাকার খরচ বাঁচাতে কখনো গাড়িতেই রাত কাটাতে হতো। সবাই যে তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করতেন, তা-ও নয়। তবু তিনি কাজটি চালিয়ে গেছেন। এর ফল দেখা যেতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৬০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০০টি আউটলেটে তাঁর পদ্ধতিতে চিকেন বিক্রি হচ্ছিল। ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা মিলিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজির সংখ্যা ৬০০ ছাড়ায়। করবিনে একটি ক্যাফে চালানোর অভিজ্ঞতা তখন বড় পরিসরের ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে।
১৯৬৪ সালে স্যান্ডার্স প্রায় ২০ লাখ ডলারে কেএফসি কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করেন। তখন তাঁর বয়স ৭৩ বছর। ব্যবসার মালিকানা ছেড়ে দিলেও প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি কাজ চালিয়ে যান। তাঁর চেহারা ও পোশাকও কেএফসির প্রচারের কেন্দ্রে থাকে। সাদা স্যুট পরা মানুষটিকে দেখে ক্রেতারা কেএফসিকে চিনতে শিখেছিলেন।
তবে এই সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন আউটলেটে খাবারের মান নিয়ে স্যান্ডার্স উদ্বিগ্ন থাকতেন। বিশেষ করে গ্রেভির স্বাদ সম্পর্কে তাঁর অসন্তোষ ছিল প্রকাশ্য। প্রতিষ্ঠান যত বড় হয়েছে, প্রতিটি রেস্তোরাঁয় তাঁর নিজের রান্নাঘরের মান বজায় রাখা তত কঠিন হয়েছে- এটি তিনি মেনে নিতে পারতেন না। ক্লদিয়ার সঙ্গে অন্য একটি রেস্তোরাঁর উদ্যোগেও পরে তিনি যুক্ত হন। কেএফসির প্রতীক হয়ে থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি পরিচালনার সিদ্ধান্ত আর তাঁর একার হাতে ছিল না।
কেএফসির ১১ মসলার রেসিপি নিয়ে কৌতূহল স্যান্ডার্সের মৃত্যুর পরও কমেনি। ২০১৬ সালে তাঁর পরিবারের একটি পুরোনো অ্যালবামে পাওয়া হাতে লেখা মসলার তালিকাকে অনেকে আসল রেসিপি বলে দাবি করেন। আলোচনায় বিশেষভাবে আসে সাদা মরিচের নাম। কিন্তু তালিকাটি যিনি সামনে এনেছিলেন, তিনি পরে নিজের বক্তব্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন, কেএফসিও সেটিকে আসল রেসিপি বলে স্বীকার করেনি। ফলে প্রচারিত তালিকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রান্না করা সম্ভব হলেও সেটিকে নিশ্চিত ‘আসল কেএফসি রেসিপি’ বলা যায় না।
স্যান্ডার্সকে ঘিরে আরও কিছু কাহিনি প্রচলিত। বলা হয়, প্রথম সম্মতি পাওয়ার আগে তাঁকে ঠিক ১,০০৯ বার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। কিন্তু এই নির্দিষ্ট সংখ্যার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। আবার ‘মিস চাইল্ড্রেস’ নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর কাছ থেকে রেসিপি চুরির অভিযোগও অনলাইনে ছড়িয়েছে। অভিযোগটি প্রমাণ করার মতো প্রতিষ্ঠিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর জীবন নিয়ে লিখতে গেলে প্রচলিত এসব গল্পের উল্লেখ করা যায়, তবে সেগুলোকে যাচাই করা ঘটনার সমান মর্যাদা দেওয়া যায় না।
১৯৮০ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ৯০ বছর বয়সে হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্সের মৃত্যু হয়। তত দিনে তাঁর তৈরি খাবার ও তাঁর মুখ দুটোই কেন্টাকির সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে পৌঁছে গেছে। স্যান্ডার্সের জীবনকে শুধু ‘কখনো হাল ছেড়ো না’ ধরনের একটি বাক্যে শেষ করা সহজ। কিন্তু তাতে তাঁর কাজের আসল দিকটি আড়াল হয়ে যায়। তিনি শৈশবে রান্না শিখেছিলেন প্রয়োজনে, করবিনে সেই দক্ষতাকে রেস্তোরাঁর ব্যবসায় কাজে লাগিয়েছিলেন, আর রেস্তোরাঁ হারানোর পর একই দক্ষতাকে ফ্র্যাঞ্চাইজির ভিত্তি বানিয়েছিলেন। জীবনের প্রতিটি মোড়ে তিনি একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেননি বরং আগে শেখা কাজটিকে নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করেছেন।
কেএফসির লোগোতে আজও যে বৃদ্ধ হাসছেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য হয়তো সেটি নয়। বরং দৃশ্যটি এমন- করবিনের রেস্তোরাঁ আর নেই, সামনে অনিশ্চিত পথ, তবু নিজের রান্নার পদ্ধতি নিয়ে তিনি আবার গাড়িতে উঠছেন।
মন্তব্য করুন