যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মিশিগানের ডিয়ারবর্নে গত ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে মার্কিন সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাঈদের সঙ্গে বিশেষ গোলটেবিল সাক্ষাৎকার। নিউ মিশিগান মিডিয়ার (New Michigan Media) উদ্যোগে স্থানীয় দ্য আরব আমেরিকান নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জাতিগত ও ভাষাভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন নিউ মিশিগান মিডিয়ার পরিচালক ড. হায়গ ওশাগান, দ্য আরব আমেরিকান নিউজের প্রকাশক ওসামা সিবলানি, লাতিনো প্রেসের প্রকাশক ইলিয়াস গুতিয়েরেজ, কোরিয়ান উইকলির প্রকাশক ট্যাক ইয়াং কিম এবং যমুনা টেলিভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও বাংলা সংবাদ পত্রিকার প্রকাশক ইকবাল ফেরদৌস ।
তাঁরা নিজ নিজ কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশা তুলে ধরেন। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মিশিগানের অর্থনীতি, ছোট ব্যবসা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেইডের নতুন কাজের শর্ত, বৈধ অভিবাসনের দীর্ঘসূত্রতা, অভিবাসন আইন প্রয়োগ, ধর্মীয় বৈষম্য, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং নির্বাচিত হলে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়গুলো উঠে আসে। যমুনা টেলিভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও বাংলা সংবাদ পত্রিকার প্রকাশক ইকবাল ফেরদৌস বিশেষভাবে মেডিকেইড সুবিধাভোগীদের উদ্বেগ এবং ফ্যামিলি ও লিগ্যাল ইমিগ্রেশনে ১৫ থেকে ২০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেন। জবাবে আবদুল এল-সাঈদ স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতে জাতিগত গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে এল-সাঈদ বলেন, অভিবাসী কমিউনিটিগুলোকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত রাখতে এসব সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর মতে, ধর্ম, বর্ণ কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষের আমেরিকান পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া উচিত নয়। বরং সব কমিউনিটিকে সঙ্গে নিয়ে বৈষম্যহীন আমেরিকা গড়ে তুলতে হবে।
প্রশ্ন: মিশিগানে ছোট ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে আপনার পরিকল্পনা কী?
আবদুল এল–সাঈদ: আমি ছোট ব্যবসার শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমাদের অর্থনীতিতে বড় করপোরেশনগুলো অনেক বেশি সুবিধা পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে তাদের করছাড় ও ভর্তুকি দেওয়া হয়, অথচ স্থানীয় ছোট ব্যবসাগুলোর বিকাশে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমি এমন অর্থনীতি চাই, যেখানে একজন বিলিয়নিয়ারের সম্পদ আরও বাড়ানোর পরিবর্তে হাজারো মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সফল হওয়ার সুযোগ পাবেন। এ জন্য রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমাতে হবে, বড় প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া বাজারক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ছোট ব্যবসার জন্য সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রশ্ন: সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
আবদুল এল–সাঈদ: যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অনেক মানুষের স্বাস্থ্যবিমা থাকার পরও চিকিৎসার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার খরচ নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়। আমি ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ সমর্থন করি। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। কো-পে, ডিডাক্টিবল কিংবা প্রিমিয়ামের বাধা থাকবে না। মানুষ নিজের পছন্দের চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবেন। এটি ছোট ব্যবসার জন্যও সহায়ক হবে। কারণ কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় নিয়ে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ কমবে এবং তাঁরা ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
প্রশ্ন — ইকবাল ফেরদৌস, প্রকাশক, বাংলা সংবাদ এবং সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, যমুনা টেলিভিশন: ২০২৭ সাল থেকে মেডিকেইডের নতুন কাজের শর্ত নিয়ে আমাদের কমিউনিটিতে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক সুবিধাভোগী বয়স্ক, অসুস্থ কিংবা কাজ করতে অক্ষম। তাঁদের মেডিকেইড সুরক্ষায় আপনি কী করবেন?
আবদুল এল–সাঈদ: এই আইন অনেক মানুষের জীবনে ভূমিকম্পের মতো প্রভাব ফেলতে পারে। বিলিয়নিয়ারদের করছাড় দেওয়ার জন্য যে আইন পাস করা হয়েছে, তার মূল্য সাধারণ মানুষকে মেডিকেইডের মাধ্যমে দিতে হচ্ছে। শুধু মানুষ মেডিকেইড হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন তা নয়, অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়তে পারে। আমাদের সম্ভাব্য সব পথ খতিয়ে দেখতে হবে। শেষ পর্যন্ত আইনটি বাতিল করা প্রয়োজন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় সেটি কঠিন হবে। এমনকি সিনেট বা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও কাজটি সহজ নয়। তারপরও রাজ্য সরকার, ফেডারেল সরকার এবং বিদ্যমান বিধিবিধানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানোর প্রতিটি সম্ভাবনা খুঁজে দেখতে চাই। কারণ এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
প্রশ্ন — ইকবাল ফেরদৌস, প্রকাশক, বাংলা সংবাদ এবং সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, যমুনা টেলিভিশন: ফ্যামিলি ও লিগ্যাল ইমিগ্রেশনে অনেক মানুষ ১৫, ১৬, এমনকি ২০ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। এই দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আপনি কী ধরনের নীতি সমর্থন করবেন?
আবদুল এল–সাঈদ: আমাদের একটি পরিষ্কার, স্বচ্ছ এবং দক্ষ অভিবাসনব্যবস্থা প্রয়োজন। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা নেই। একবার একটি নীতি নেওয়া হচ্ছে, পরে তা পরিবর্তন করা হচ্ছে। এভাবে মানুষকে অনিশ্চয়তায় রাখা যায় না।আমাদের নিরাপদ সীমান্ত প্রয়োজন। কে দেশে প্রবেশ করছেন এবং কে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তা জানতে হবে। তবে যাঁরা বৈধভাবে এখানে আছেন, তাঁদের জন্যও একটি সুস্পষ্ট আইনি পথ থাকতে হবে। অভিবাসন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত আদালত ও বিচারিক অবকাঠামো প্রয়োজন। কাউকে প্রথমে সুরক্ষিত মর্যাদা দিয়ে পরে তা কেড়ে নেওয়া কিংবা বৈধভাবে কাজের অনুমতি দিয়ে পরে বাতিল করা গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের অভিবাসনব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নেই। ফলে মানুষ বছরের পর বছর আইনি অনিশ্চয়তায় আটকে থাকছেন। ব্যাপক অভিবাসন সংস্কার প্রয়োজন। এমন একটি সংস্কার প্রস্তাব সামনে এসেছিল, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটি পাস হওয়ার পথে বাধা দিয়েছেন।
প্রশ্ন: বৈধ বিদেশি কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযান নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
আবদুল এল–সাঈদ: অভিবাসন আইন অবশ্যই প্রয়োগ করতে হবে, তবে সংবিধান লঙ্ঘন করে নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোরিয়ান কিংবা লাতিনো—যে দেশের কর্মীই হোন না কেন, কেউ বৈধ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে এলে তাঁর সেই বৈধ অবস্থানকে সম্মান জানাতে হবে। সরকার নীতি পরিবর্তন করলেই মানুষের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা উচিত নয়।
প্রশ্ন: আপনার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক আক্রমণ হচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আবদুল এল–সাঈদ: এসব আক্রমণ অত্যন্ত কষ্টদায়ক। নিজের পরিচয়ের কারণে কাউকে বলা হলে যে তিনি এখানে থাকার যোগ্য নন, সেটি কেমন লাগে, আমি জানি। তবে মিশিগানের অধিকাংশ মানুষ উদার ও সহানুভূতিশীল। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আমার নাম বা ধর্মের কারণে মানুষের নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি কিংবা চিকিৎসার খরচ বেড়ে যায়নি। প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতেই পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রশ্ন: নির্বাচিত হলে বিভিন্ন কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে বজায় রাখবেন?
আবদুল এল–সাঈদ: আমি আমার পরিবারকে ওয়াশিংটন ডিসিতে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করছি না। সপ্তাহান্তে মিশিগানে থাকার ইচ্ছা রয়েছে, যাতে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পারি। শুধু একটি কমিউনিটির সমস্যা শুনলেই হবে না। বিভিন্ন কমিউনিটির অভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের অনেক সমস্যাই একই।
প্রশ্ন: তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আবদুল এল–সাঈদ: বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষাঋণ, আবাসন ব্যয় এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে বড় হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে। আমাদের এমন সমাজ গড়তে হবে, যেখানে তরুণেরা ভালো চাকরি, সাশ্রয়ী আবাসন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। একটি ভালো চাকরি করেই যেন মানুষ পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারেন।
প্রশ্ন: নির্বাচনে ফেডারেল সরকারের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে আপনি কি উদ্বিগ্ন?
আবদুল এল–সাঈদ: হ্যাঁ, আমি উদ্বিগ্ন। এ জন্য এমন বড় ব্যবধানে জয়ী হতে হবে, যাতে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকে। ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে ভোট দিতে আসতে হবে। সাক্ষাৎকারজুড়ে আবদুল এল-সাঈদ অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ, অভিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও আইনগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
মন্তব্য করুন