যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মিশিগানের ডিয়ারবর্নে নিউ মিশিগান মিডিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ প্রার্থী গোলটেবিল সাক্ষাৎকার। স্থানীয় দ্য আরব আমেরিকান নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন মিশিগানের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ও সেক্রেটারি অব স্টেট পদপ্রার্থী গারলিন গিলক্রিস্ট। সাক্ষাৎকারে উপস্থিত ছিলেন নিউ মিশিগান মিডিয়ার পরিচালক ড. হায়গ ওশাগান, দ্য আরব আমেরিকান নিউজের প্রকাশক ওসামা সিবলানি, লাতিনো প্রেসের প্রকাশক ইলিয়াস গুতিয়েরেজ, কোরিয়ান উইকলির প্রকাশক ট্যাক ইয়াং কিম এবং যমুনা টেলিভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও বাংলা সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ইকবাল ফেরদৌস।
আলোচনায় উঠে আসে রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব, ভোটাধিকার, অভিবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, সরকারি সেবায় ভাষাগত সুবিধা, গাড়ির বিমার উচ্চ খরচ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে বাংলা ও আরবিসহ বিভিন্ন ভাষায় ব্যালটের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অভিবাসী কমিউনিটির ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন গিলক্রিস্ট। নির্বাচিত হলে সংখ্যালঘু গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
প্রশ্ন: রাজনীতিতে বড় করপোরেশন ও অর্থশালী ব্যক্তিদের প্রভাব কমাতে আপনার পরিকল্পনা কী?
গারলিন গিলক্রিস্ট: করপোরেট অর্থ ও গোপন অনুদান রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর। অনেক মানুষ মনে করেন, তাঁদের ভোটের গুরুত্ব নেই এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা শুধু ধনী ব্যক্তিদের স্বার্থে পরিচালিত হয়। আমি ‘স্ট্যান্ড টল অ্যাজেন্ডা’ নামে একটি পরিকল্পনা নিয়েছি। এর মূল লক্ষ্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, রাজনৈতিক অনুদানের সীমা কার্যকর করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। সেক্রেটারি অব স্টেট নির্বাচিত হলে রাজনৈতিক অনুদানের উৎস প্রকাশ এবং নির্বাচনের আগেই সেই তথ্য জনগণের সামনে আনার ব্যবস্থা করতে চাই। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
প্রশ্ন: ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
গারলিন গিলক্রিস্ট: যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দেওয়ার অধিকার শুধু নাগরিকদের। অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া বেআইনি। তবে অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া নিয়ে বড় ধরনের সমস্যার যে দাবি করা হচ্ছে, সেটিকে প্রকৃত সমস্যা থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা বলে মনে করি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রত্যেক যোগ্য নাগরিক যেন ভয়ভীতি, হয়রানি কিংবা বৈষম্য ছাড়াই ভোট দিতে পারেন। ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করতে হবে।
প্রশ্ন: অনিবন্ধিত অভিবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ‘ড্রাইভ সেফ’ আইন সমর্থন করেন কি?
গারলিন গিলক্রিস্ট: হ্যাঁ, আমি আগেও এই উদ্যোগ সমর্থন করেছি এবং এখনো করি। এটি জননিরাপত্তার বিষয়। মানুষকে কাজ করতে, চিকিৎসকের কাছে যেতে এবং সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিতে গাড়ি চালাতে হয়। তাই নিরাপদে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে সেক্রেটারি অব স্টেট হিসেবে এককভাবে এই আইন কার্যকর করতে পারব না। আইনসভায় প্রস্তাবটি এলে এর পক্ষে কাজ করব।
প্রশ্ন: অভিবাসীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকাশ করা নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
গারলিন গিলক্রিস্ট: মিশিগানের মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আমার অন্যতম অগ্রাধিকার। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফেডারেল সরকার কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে চাই না। আমি একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার। প্রযুক্তি ও তথ্য সুরক্ষার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারি সংস্থা এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অননুমোদিত তথ্য ব্যবহার প্রতিরোধ করতে চাই।
প্রশ্ন: গাড়ির নম্বরপ্লেট ও ট্যাব দুই বছরের জন্য নবায়নের সুযোগ দেওয়া সম্ভব কি?
গারলিন গিলক্রিস্ট: এটি বিবেচনা করার মতো প্রস্তাব। দুই বছরের জন্য ট্যাব নবায়নের সুযোগ পর্যালোচনা করা যেতে পারে। মানুষের সময়ের মূল্য রয়েছে। সরকারি সেবা সহজ ও দ্রুত করতে চাই। মিশিগানের ১৩১টি সেক্রেটারি অব স্টেট কার্যালয়ে সেবার মান আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: ইংরেজিতে দক্ষ নন এমন অভিবাসীদের জন্য সেক্রেটারি অব স্টেট কার্যালয়ে কী ব্যবস্থা নেবেন?
গারলিন গিলক্রিস্ট: আমি ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকসেস টাস্কফোর্স’ নতুনভাবে কার্যকর করতে চাই। শুধু অফিসে সরাসরি সেবা নয়, ওয়েবসাইট, কিয়স্ক, ডিজিটাল সেবা এবং ভোটদানের ক্ষেত্রেও ভাষাগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ডিয়ারবর্ন ও হ্যামট্রামিকের মতো এলাকায় বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের প্রয়োজন আলাদা। স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে আলোচনা করে সেবা দিতে হবে। বহুভাষিক কর্মীদের উপযুক্ত বেতন দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: হ্যামট্রামিকের বাইরে বাংলাভাষী এবং ডিয়ারবর্নের বাইরে আরবিভাষী ভোটারদের জন্য নিজ ভাষায় ব্যালটের ব্যবস্থা থাকা উচিত কি?
গারলিন গিলক্রিস্ট: হ্যাঁ, অবশ্যই। কেউ নিজের বোঝার ভাষায় ব্যালট পড়তে না পারলে সেটি তাঁর নাগরিক অধিকারের বিষয়। হ্যামট্রামিকের বাইরেও বাংলাভাষী মানুষ আছেন। একইভাবে ডিয়ারবর্নের বাইরেও আরবিভাষী ভোটার রয়েছেন। বাংলা, আরবি, আমহারিকসহ বিভিন্ন ভাষার চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে রাজ্যজুড়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই।
প্রশ্ন: মিশিগানে গাড়ির বিমার খরচ কমাতে আপনার পরিকল্পনা কী?
গারলিন গিলক্রিস্ট: মিশিগানে গাড়ির বিমার খরচ অত্যন্ত বেশি। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে মিশিগানে ফেরার পর আমার নিজের বিমার খরচও কয়েক গুণ বেড়েছিল। অন্য রাজ্যের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়ী অটো ইনস্যুরেন্স বিকল্প চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি। বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। লক্ষ্য হলো কম খরচে বিমার সুযোগ তৈরি করা।
প্রশ্ন: পুরোনো ট্রাফিক অপরাধের কারণে চালকেরা দীর্ঘদিন সমস্যায় পড়েন। এ বিষয়ে কী করবেন?
গারলিন গিলক্রিস্ট: একটি ভুলের জন্য কাউকে সারা জীবন শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। ড্রাইভিং রেকর্ড ও পয়েন্টের নিয়ম ন্যায্য কি না, তা পর্যালোচনা প্রয়োজন। লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে বিচারব্যবস্থা সংস্কারে কাজ করেছি। জরিমানা পরিশোধে অক্ষমতার কারণে লাইসেন্স হারানো চার লাখের বেশি মানুষের লাইসেন্স পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ক্লিন স্লেট’ কর্মসূচির মাধ্যমেও বহু মানুষের পুরোনো অপরাধের রেকর্ড মুছে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা মোকাবিলায় কী করবেন?
গারলিন গিলক্রিস্ট: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আনছে। বিশেষ করে অভিবাসী কমিউনিটির অনেক মানুষ উদ্বিগ্ন। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তা, যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। ‘গোয়িং প্রো’সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে প্রস্তুত করতে হবে। যদিও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ সরাসরি সেক্রেটারি অব স্টেটের দায়িত্ব নয়, এসব উদ্যোগ সমর্থন করব।
প্রশ্ন: নির্বাচনী প্রচারে মুসলিম প্রার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আক্রমণ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
গারলিন গিলক্রিস্ট: এটি দুঃখজনক ও বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো ধর্মীয় পরীক্ষা থাকার কথা নয়। ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কারও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সমাজ আরও শক্তিশালী হয়।
প্রশ্ন: আফ্রিকান–আমেরিকান ও আরব–আমেরিকান কমিউনিটির মধ্যে বিভেদ নিয়ে আপনার মত কী?
গারলিন গিলক্রিস্ট: আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মতবিরোধ থাকলেও সমাধান পারস্পরিক আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সম্ভব। আবদুল এল-সাঈদের সঙ্গে ২০১৫ সাল থেকে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব রয়েছে। পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ভিত্তিতে বিভিন্ন কমিউনিটির সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
প্রশ্ন: নির্বাচিত হলে সংখ্যালঘু গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন কি?
গারলিন গিলক্রিস্ট: অবশ্যই। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব শুধু নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যাওয়া নয়। নির্বাচিত হওয়ার পরও তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জবাবদিহি করা জরুরি। মিশিগানের ৮৩টি কাউন্টির প্রতিটিতে তিনবারের বেশি সফর করেছি। নির্বাচিত হলে নিউ মিশিগান মিডিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখব।
প্রশ্ন: সেক্রেটারি অব স্টেট নির্বাচিত হলে আপনার প্রধান অগ্রাধিকার কী হবে?
গারলিন গিলক্রিস্ট: ভোটাধিকার রক্ষা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা হবে আমার প্রধান অগ্রাধিকার। লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে বিচারব্যবস্থা সংস্কার, ইন্টারনেট সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমানোর উদ্যোগে কাজ করেছি। সেক্রেটারি অব স্টেট কার্যালয়ে মানুষ যেন সম্মান পান, দ্রুত সেবা পান এবং ভাষাগত চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা পান, সেটি নিশ্চিত করতে চাই। সাক্ষাৎকারজুড়ে গারলিন গিলক্রিস্ট নির্বাচনী স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার, অভিবাসীদের তথ্য সুরক্ষা এবং সরকারি সেবায় ভাষাগত সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি গাড়ির বিমার খরচ কমানো, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের মানিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
মন্তব্য করুন