বাংলা সংবাদ ডেস্ক
২ অক্টোবর ২০২৪, ১০:৪৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ডলারের বাড়তি দামে খেলাপি হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

ডলার সংকট তীব্র হচ্ছে প্রতিদিন। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪ শতাংশের ওপর চলে গেছে আরও আগে। এর মধ্যে ডলারের দর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সুদ ব্যয়ের সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। চাপ সামলাতে সময়মতো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না তারা। এতে নতুন করে খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির কারণে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারসংকট এখন ব্যবসায়ীদের বড় সমস্যা। সংকটের কারণে এলসি খোলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাড়তি দামে এলসি খুলতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক ব্যবসার ওপর। ফলে ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে অনেকে খেলাপি হয়ে পড়ছেন। এই অচলাবস্থা রোধে ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

জানা গেছে, দেশের বড়, মাঝারি কিংবা ছোট সব খাতের ব্যবসায়ীদেরই বাড়তি সুদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বাড়ছে ব্যাংক খাতে। বাড়তি সুদের চাপে অনেক ভালো গ্রাহকও ঋণের কিস্তি ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছেন না। সুদহার বৃদ্ধির চাপ ব্যবসায়ীদের নতুন সংকটে ফেলেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের বিল দ্বিগুণ হয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ অবস্থায় ঋণের সুদহার দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বহু গুণ বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে পণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। কয়েক মাস আগে ঋণের সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি একই দিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণে ‘ক্রলিং পেগ’ নীতি চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে এক দিনের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে মার্কিন ডলারের মধ্যবর্তী দর নির্ধারণ করা হয় ১১৭ টাকা। যদিও ওই দিনের শুরুতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার সর্বোচ্চ ১১০ টাকা নির্ধারিত ছিল। সে হিসাবে এক দিনেই আনুষ্ঠানিকভাবে ডলারের দাম ৭ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ডলারের ঘোষিত দর আমলে নিয়ে গত দুই বছরের ব্যবধানে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে আনুষ্ঠানিক খাতেই প্রতি ডলার এখন ১২১ থেকে ১২২ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। টাকার এ রেকর্ড অবমূল্যায়নের প্রভাবে আমদানিনির্ভর প্রতিটি পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যবসার ব্যয়। সম্প্রতি ডলারের উৎস হিসেবে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বিভিন্ন কারণে কমেছে রপ্তানির পরিমাণ। এতে দেশে মূলত ডলারের ঘাটতি বেড়েছে। অনেক ছোট কোম্পানি যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেছেন তারাও এখন ঠিকভাবে কিস্তি দিতে পারছেন না। এসব প্রতিষ্ঠান গত এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক বছরে শুধু দুর্দশাগ্রস্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। এর বড় কারণ ডলারের দর বৃদ্ধির চাপে ব্যবসায়ীরা সময় মতো কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন।

 

ব্যবসায়ীরা জানান, ডলারসংকটে তারা চাহিদা অনুযায়ী আমদানির এলসিও খুলতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের আমদানি কমার হার ছিল ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি কমার হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতি মাসে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি হতো, বর্তমানে আমদানি হচ্ছে তার অর্ধেক। চাহিদা অনুযায়ী মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি করতে না পারায় দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ বসে থাকছে। একাধিক ব্যবসায়ী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত দরে এলসি খুলতে চায় না। তারা কাগজপত্রে দর যা দেখায় বাস্তবে তার চেয়ে বেশি দিতে হয়। ১১০ টাকার নির্ধারিত দর থাকার সময় কোনো ব্যাংক এই দরে এলসি খুলতে রাজি হয়নি। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকে অতিরিক্ত টাকা দিলেই কেবল এলসি খুলতে রাজি হয়। খোলা বাজার থেকে ডলার কিনে দিতে হয়। তারা জানান, ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়া, সুদহার বৃদ্ধি, ডলারসংকট ও ডলারের বিনিময় হার নিয়ে নৈরাজ্য, প্রত্যাশিত মাত্রায় ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারা, গ্যাসসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বিক্রি কমে যাওয়াসহ বহুমুখী সংকটে বেসরকারি খাত এখন বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যবসায়ীরা গণহারে ঋণখেলাপি হয়ে যাবেন। তাতে দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত আরও বেশি নড়বড়ে হয়ে উঠবে। সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ডলারের বিনিময় হার বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতেও দেশের ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত দর হিসেবে প্রতি ডলার ১১৭ টাকা পর্যন্ত। যদিও ঘোষিত দরে দেশের কোনো ব্যাংকেই ডলার মিলছে না। আমদানিকারকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো ডলারপ্রতি ১২৪-১২৫ টাকাও আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে হিসাবে এ সময়ে ডলারের বিনিময় হার বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। বিনিময় হার নিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দেশের ব্যবসায়ীদের ক্ষতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডলারের সংকট আছে। ব্যবসায়দের যেহেতু অতিরিক্ত দরে ডলার কিনতে হচ্ছে, এলসি পরিশোধে বাড়তি দর দিতে হচ্ছে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত ব্যবসায়ীদের ভর্তুকি দেওয়া। তাদের কিছুটা ছাড় দেওয়া উচিত।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এফবিআইয়ের ডেপুটি পরিচালকের বিদায়

১

ট্যাক্স রিফান্ড ও বকেয়া জানতে নতুন অ্যাপ চালু করল আইআরএস

২

ভিসা জালিয়াতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পোর্টাল চালু

৩

ডেট্রয়েটে আবিয়ার দ্বিবার্ষিক সম্মেলন, সম্মাননা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে সমাপ্তি

৪

সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান ওয়ার্ল্ড নিউজ ডে’র আয়োজকদের

৫

ডিয়ারবর্নে শিশু যৌন নিপীড়নমূলক উপাদান সংক্রান্ত মামলায় ১৯ বছর বয়সী যুবক গ্রেপ্তার

৬

শিশুদের টিকটক ব্যবহারে কড়াকড়ি, যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতাশিশুদের

৭

ট্রাম্প ভোট গণনার সময় নির্বাচনের ফল পাল্টানোর চেষ্টা করতে পারেন

৮

শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে হ্যামট্রাম্যাক থেকে নতুন ফ্রি বাস সেবা

৯

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নতুন ভিসা বিধিনিষেধ

১০

মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘বেস্ট অব দ্য ওয়েস্ট ইয়ুথ লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন তাহমিদ চৌধুরী

১১

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বারহাম সালিহ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

১২

সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে

১৩

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসী তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে

১৪

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

১৫

মেডিকেইডের ওষুধের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের

১৬

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মী ভিসায় ১ লাখ ডলারের ফি আরও এক বছর

১৭

তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাড়ল সুদের হার

১৮

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রিনকার্ডে নতুন পাবলিক চার্জ নিয়ম

১৯

গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসায় লাগাম, মার্কিন নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানটি

২০