আবুল কাসেম
১ জুলাই ২০২৬, ১২:০৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের কূটনীতিতে নয়া বার্তা শুরুতেই মালয়েশিয়া ও চীন

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কৌশলগত বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিনের প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির বাইরে গিয়ে প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরের গন্তব্য হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়া ও চীনকে। ২১ থেকে ২৬ জুনের এই সফর অর্থনৈতিক কূটনীতি, বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

 

ছয় দিনের সফরে মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও কৌশলগত সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সক্রিয় সহযোগিতার আশ্বাসও মিলেছে।

 

 

স্বাধীনতার পর নতুন সরকারের প্রধানদের প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে কূটনৈতিক ধারা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার তা অনুসরণ করেননি। পরিবর্তে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, তাঁর সরকারের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে- যেখানে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বহুমাত্রিক বৈশ্বিক অংশীদারিত্বই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

 

 

সফরের প্রথম পর্বে ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশ বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়ে একমত হয়।

 

 

এরপর চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে এই অংশগ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

 

বেইজিংয়ে সফরকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রিমিয়ার লি ছিয়াং এবং জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকগুলোতে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে ১৩টি এমওইউ সই হয়। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে একটি পৃথক সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

 

 

রোহিঙ্গা সংকটও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। প্রধানমন্ত্রী চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে সংকটের দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই সমাধানের ওপর জোর দেন। এ বিষয়ে চীন ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছে।

 

 

দেশে ফিরে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। তিনি বলেন, এই সফরে কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না; দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করাই ছিল মূল লক্ষ্য।

 

 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর কেবল কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে অর্থনৈতিক কূটনীতি, বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বাস্তববাদী অবস্থানের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশেষ করে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি নতুন বার্তা দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মিশিগানে আইনি সহায়তায় আস্থার প্রতীক ‘মুমেন বারলাস্কার ল ফার্ম’

মিশিগানে আধুনিক দন্তচিকিৎসায় আলো ছড়াচ্ছে ‘হ্যাপি স্মাইল ফ্যামিলি ডেন্টাল’ ও ‘টিউলিপস ফ্যামিলি ডেন্টাল’

হালাল হোম ফাইন্যান্সিংয়ে মিশিগানের জনপ্রিয় নাম ‘বেস্ট রেট ’

মিশিগানে আধুনিক রিয়েল এস্টেট সেবায় সুনাম কুড়াচ্ছে ‘মাইলিভিং বাই আমেরিকান রিয়েলটরস’

মিশিগানে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার প্রতীক ‘এ টু জেড ফার্মেসি’

স্বপ্নের পথে বাধা: মিশিগানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের শেষ কোথায়?

২৫০ বছরের আমেরিকা: গৌরবের সঙ্গে আত্মবিশ্লেষণও

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি: যুদ্ধ, প্রেম ও জীবনের কথক: নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

কর ও ব্যয়ের চাপে আবাসন খাত, অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষ

১০

বাংলাদেশের কূটনীতিতে নয়া বার্তা শুরুতেই মালয়েশিয়া ও চীন

১১

জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিতে এমসি কলেজে জুলোজি ক্লাবের কুইজ

১২

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায়, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট

১৩

মিশিগানে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শামসুজ্জামান সংবর্ধিত

১৪

মিশিগানে দুর্গা টেম্পল ডেট্রয়েটের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য কমিউনিটি বনভোজন অনুষ্ঠিত

১৫

৮ আগস্ট  ‘’বাংলাদেশ ল’য়ার্স এসোসিয়েশন অফ মিশিগান, ইউএসএ এর ফ্যামিলি ডিনার- ২০২৬‘’ অনুষ্ঠিত হবে

১৬

মিশিগানে বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি ইনক’র উদ্যোগে শিক্ষাণুরাগী শামসুজ্জামান শাহজাহানকে সংবর্ধনা

১৭

মিশিগানে সিলেট সদর দক্ষিণ সুরমা অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগান’এর অভিষেক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

১৮

‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচিতে দক্ষিণভাগ এনসিএম উচ্চ বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ ও বর্ণাঢ্য র‍্যালি

১৯

রাস্তার সৈনিক নয়, সীমান্তে গিয়ে জিয়ার সৈনিক প্রমাণ করুন- বড়লেখায় নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী

২০