ইকবাল ফেরদৌস:
১ জুলাই ২০২৬, ২:৩৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

স্বপ্নের পথে বাধা: মিশিগানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

একটি স্যুটকেস, কয়েকটি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আর বুকভরা স্বপ্ন। মিশিগানে আসা অধিকাংশ বাংলাদেশি অভিবাসীর যাত্রা শুরু হয় এভাবেই। কেউ স্বামী বা স্ত্রীর আবেদনে, কেউ বাবা-মায়ের স্পন্সরশিপে, কেউ ভাই-বোনের মাধ্যমে, কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য, আবার কেউ দক্ষ কর্মী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তাদের সবার লক্ষ্য এক – একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

 

 

গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির দৃশ্যমান বিকাশ ঘটেছে। ডেট্রয়েট, ওয়ারেন, হ্যামট্রামিক, স্টার্লিং হাইটস, ট্রয়, ক্যান্টন কিংবা গ্র্যান্ড র‌্যাপিডসের মতো শহরে বাংলাদেশিদের বসতি ও ব্যবসা ক্রমেই বেড়েছে। রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, ট্রাকিং, গ্যাস স্টেশন, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কর-পরামর্শ, নির্মাণশিল্প এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় বাংলাদেশিরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।

 

 

বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সফল অভিবাসনের গল্প। কিন্তু এই দৃশ্যমান সাফল্যের আড়ালে রয়েছে আরেকটি বাস্তবতা – যা প্রতিদিন নীরবে মোকাবিলা করেন হাজারো বাংলাদেশি অভিবাসী। নতুন সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, তথ্যের অভাব, পেশাগত স্বীকৃতির জটিলতা, সরকারি সেবা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ – এসবই তাদের জীবনের অংশ।

 

 

একটি স্যুটকেস আর অজানা ভবিষ্যৎ

যখন ৩২ বছর বয়সী রাশেদ আহমেদ প্রথম মিশিগানে আসেন, তখন তার সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি স্যুটকেস। বাংলাদেশে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। যুক্তরাষ্ট্রে এসে তিনি বুঝতে পারেন, আগের অভিজ্ঞতা থাকলেও এখানকার চাকরির বাজার সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনলাইনে চাকরির আবেদন, জীবনবৃত্তান্তের ধরন, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি – সবই ছিল নতুন। সংসারের খরচ চালাতে তিনি প্রথমে একটি গ্যাস স্টেশনে কাজ নেন। পরে কমিউনিটি কলেজে একটি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ধীরে ধীরে নিজের পেশার কাছাকাছি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পান। রাশেদের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। নতুন আসা অসংখ্য বাংলাদেশি অভিবাসীর প্রথম চাকরি তাদের স্বপ্নের চাকরি হয় না। কিন্তু সেই চাকরিই অনেকের জন্য নতুন জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

 

 

নতুন দেশ, নতুন নিয়ম

মিশিগানে পা রাখার পর একজন নতুন অভিবাসীর সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামো। সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর সংগ্রহ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্বাস্থ্যবীমা নির্বাচন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ক্রেডিট হিস্ট্রি তৈরি, শিশুদের স্কুলে ভর্তি, বাসা ভাড়া নেওয়া, কর ব্যবস্থা বোঝা – সবকিছুই নতুন। বাংলাদেশে পরিচিত মানুষজনের সহযোগিতায় অনেক কাজ সহজে সম্পন্ন হলেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় প্রতিটি কাজ নির্দিষ্ট নিয়ম, সময়সীমা এবং কাগজপত্রের ওপর নির্ভরশীল। প্রথম দিকে অনেকেই আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতজনের পরামর্শের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু সব তথ্য যে সঠিক হয়, এমন নয়। কখনো ভুল পরামর্শের কারণে তারা প্রয়োজনীয় সরকারি সুবিধা, কর-সুবিধা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।

 

 

যোগ্যতা আছে, সুযোগ নেই

মিশিগানে আসা বাংলাদেশি অভিবাসীরা একই ধরনের নন। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, কারিগর, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্বল্পশিক্ষিত শ্রমজীবী মানুষও। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এসে প্রায় সবাইকেই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। বিদেশি ডিগ্রির স্বীকৃতি, পেশাগত লাইসেন্স, স্থানীয় অভিজ্ঞতা এবং ইংরেজিতে পেশাগত যোগাযোগের দক্ষতা – এসব কারণে অনেক দক্ষ মানুষ দীর্ঘ সময় নিজেদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পান না। বাংলাদেশে প্রকৌশলী ছিলেন, এখানে এসে ফ্যাক্টরিতে কাজ করছেন। চিকিৎসক ছিলেন, এখন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করছেন। শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু নতুন করে পড়াশোনা না করলে স্কুলে চাকরির সুযোগ নেই। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং একটি নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

 

 

স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার, শুরুটা হয়েছিল ফ্যাক্টরি থেকে

বাংলাদেশে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে মাহবুব রহমান উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ডিগ্রি যথেষ্ট নয়। স্থানীয় অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ এবং কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষার সময় তিনি একটি ফ্যাক্টরিতে রাতের শিফটে কাজ করেন। পরে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে নিজের পেশায় ফিরে আসেন। তার অভিজ্ঞতা দেখায়, অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী শুরুতে যে কাজই করুন না কেন, তাদের লক্ষ্য থাকে নিজেদের দক্ষতার জায়গায় ফিরে যাওয়া।

 

 

ছোট ব্যবসা, বড় অবদান

মিশিগানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সবচেয়ে বড় শক্তির একটি হলো তাদের উদ্যোক্তা মানসিকতা। রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি স্টোর, ট্রাকিং কোম্পানি, গ্যাস স্টেশন, ট্যাক্স সেবা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আইটি কোম্পানি, কনভিনিয়েন্স স্টোর – নানা ধরনের ব্যবসা স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। এসব ব্যবসা শুধু মালিকদের জীবন বদলায়নি; স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং রাজ্যের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। তবে এখানেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা জানেন না কোথা থেকে ব্যবসার জন্য স্বল্প সুদের ঋণ পাওয়া যায়, কীভাবে সরকারি অনুদানের জন্য আবেদন করতে হয়, কীভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, কিংবা কোন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তাদের জন্য রয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসা সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ছোট পরিসরেই আটকে থাকে।

 

 

ব্যবসা শুধু নিজের জন্য নয়

হ্যামট্রামিকের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন প্রায় এক দশক আগে একটি ছোট গ্রোসারি স্টোর দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। শুরুতে পরিবারই দোকান চালাত। এখন সেখানে কয়েকজন কর্মচারী কাজ করেন।

তার মতে, ব্যবসা শুরু করার চেয়ে বড় সমস্যা ছিল সঠিক তথ্য পাওয়া। যদি শুরুতেই ব্যবসা পরিচালনা, কর ব্যবস্থা, ঋণ সুবিধা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পেতেন, তাহলে আরও দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতো।

 

 

তথ্যের অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা

নতুন অভিবাসীদের সঙ্গে কথা বললে একটি বিষয় বারবার উঠে আসে – “তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে?” ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন অভিবাসীদের জন্য রয়েছে ভাষা শিক্ষা, কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, ছোট ব্যবসা সহায়তা, আইনি পরামর্শ, শিক্ষা অনুদান, নারীদের কর্মসংস্থান, প্রবীণদের সেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি। কিন্তু এসব তথ্য অনেক সময় ইংরেজিভাষী ওয়েবসাইট, জটিল সরকারি নথি কিংবা বিচ্ছিন্ন তথ্যসূত্রে সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলা ভাষায় সহজ তথ্যের অভাব নতুন অভিবাসীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।

 

 

ভাষা শুধু যোগাযোগের নয়, সুযোগেরও প্রশ্ন

ইংরেজি ভাষায় সীমিত দক্ষতা কেবল কথোপকথনের সমস্যা নয়; এটি সুযোগের প্রশ্নও। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা, সন্তানের শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা, আদালতের নথি বোঝা, কর সংক্রান্ত বিষয়, চাকরির আবেদন, ব্যবসার লাইসেন্স কিংবা সরকারি আবেদন – সব ক্ষেত্রেই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

নাসরিন আক্তার

পরিবার নিয়ে মিশিগানে আসেন স্বামীর স্পন্সরশিপে। বাংলাদেশে তিনি শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু এখানে এসে তিনি বুঝতে পারেন, ভাষা জানা আর ভাষায় আত্মবিশ্বাসী হওয়া এক বিষয় নয়।

ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা, সন্তানের স্কুলে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলা কিংবা ব্যাংকের কাগজপত্র বোঝার মতো সাধারণ কাজেও শুরুতে অন্যের সহায়তা নিতে হতো। পরে ইংরেজি শেখার একটি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান এবং কর্মজীবনেও যুক্ত হন।

 

 

বাসস্থান ক্রেডিট হিস্ট্রির অদৃশ্য বাধা

অনেক নতুন অভিবাসী প্রথমে বুঝতেই পারেন না যে যুক্তরাষ্ট্রে শুধু আয় থাকলেই সব কাজ হয় না। বাসা ভাড়া নেওয়া, গাড়ি কেনা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে চাকরির জন্যও প্রয়োজন হয় ভালো ক্রেডিট হিস্ট্রি।

নতুন অভিবাসীদের সেই ইতিহাস থাকে না। ফলে অনেককে বেশি নিরাপত্তা জামানত দিতে হয়, উচ্চ সুদে গাড়ির ঋণ নিতে হয় কিংবা ভালো বাসা ভাড়া পেতে সমস্যায় পড়তে হয়।

এই বিষয়টি বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে খুব কম আলোচিত হলেও বাস্তবে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক বাধা।

 

 

ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো

আজকের অধিকাংশ সরকারি সেবা অনলাইনে। স্বাস্থ্যবীমা, চাকরির আবেদন, সামাজিক সেবা, কর, নাগরিকত্বের আবেদন – সবকিছুই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে এসেছে।

কিন্তু প্রথম প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশি অভিবাসীর কাছে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা অপরিচিত। অনেকে ই-মেইল ব্যবহারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অনলাইন ফরম পূরণ, নথি আপলোড বা সরকারি পোর্টাল ব্যবহার তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা অনেক সময় প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণে পিছিয়ে পড়েন।

 

 

নতুন প্রজন্মের ভিন্ন বাস্তবতা

বাংলাদেশি অভিবাসীদের সন্তানরা দুই সংস্কৃতির মধ্যে বড় হচ্ছে। একদিকে পরিবারের ভাষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ, অন্যদিকে আমেরিকান শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশ।

অনেক অভিভাবক মার্কিন শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো, কলেজে ভর্তি, স্কলারশিপ, আর্থিক সহায়তা বা ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় সন্তানদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দিতে হিমশিম খান।

 

 

নারীদের সামনে আলাদা বাস্তবতা

বাংলাদেশি নারীদের একটি অংশ উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও কর্মজীবনে যুক্ত হতে পারেন না। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব, স্থানীয় কর্মসংস্থানের তথ্যের অভাব এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট অনেক সময় তাদের পিছিয়ে রাখে। নারীদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা সহায়তা কর্মসূচি বাড়ানো গেলে এই চিত্র বদলাতে পারে।

 

 

প্রবীণ অভিবাসীদের নীরব একাকীত্ব

সব অভিবাসীর গল্প চাকরি বা ব্যবসার নয়। ৬৮ বছর বয়সী আয়েশা বেগম ছেলের পরিবারের সঙ্গে থাকতে বাংলাদেশ থেকে মিশিগানে এসেছেন। পরিবারের সবাই সকালে কাজে বা স্কুলে চলে গেলে দিনের দীর্ঘ সময় তিনি একাই থাকেন। গাড়ি চালাতে পারেন না। ইংরেজি জানেন না। আশপাশের মানুষের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগও নেই। অনেক প্রবীণ বাংলাদেশি অভিবাসীর জীবন এমনই। নিরাপদ পরিবেশে থাকলেও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্ব তাদের জীবনের বড় বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

 

 

মানসিক স্বাস্থ্যের নীরব সংকট

অভিবাসনের গল্পে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি খুব কমই আলোচিত হয়। নতুন দেশে একাকীত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। কিন্তু বাংলাদেশি সমাজে এখনও এই বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব কম। ফলে অনেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে দ্বিধা করেন।

 

 

কমিউনিটির শক্তি

সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারস্পরিক সহযোগিতা। মসজিদ, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন অভিবাসীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হয়। কেউ চাকরির তথ্য দেন, কেউ বাসা খুঁজে দেন, কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝতে সাহায্য করেন। এই অনানুষ্ঠানিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পাশাপাশি আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও প্রয়োজন।

 

 

সামনে এগোনোর পথ

বাংলাদেশি অভিবাসীদের অনেক সমস্যার সমাধান খুব ব্যয়বহুল নয়। বাংলা ভাষায় তথ্যভিত্তিক গাইড, নতুন অভিবাসীদের জন্য ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম, চাকরির প্রস্তুতি কর্মশালা, পেশাগত লাইসেন্সিং সহায়তা, ছোট ব্যবসা পরামর্শক সেবা, নারী ও প্রবীণদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি, আর্থিক সচেতনতা, ক্রেডিট হিস্ট্রি গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ এবং সরকারি সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত কমিউনিটি সংযোগ – এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে হাজারো মানুষের পথচলা অনেক সহজ হতে পারে। বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে আলোচনা হলে প্রায়ই তাদের প্রয়োজন বা সমস্যার কথা উঠে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা শুধু সহায়তা গ্রহণকারী নন; তারা অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার। তারা নতুন ব্যবসা গড়ে তুলছেন, কর দিচ্ছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং মিশিগানের বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করছেন।

 

 

মিশিগানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের গল্প তাই শুধু সংগ্রামের নয়, আবার শুধু সফলতারও নয়। এটি প্রতিদিন নতুন করে শুরু করার গল্প। নতুন ভাষা শেখার, নতুন নিয়ম বোঝার, সন্তানদের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার এবং একই সঙ্গে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখার গল্প। তাদের এই যাত্রাকে আরও সহজ করতে হলে প্রয়োজন তথ্যের সহজপ্রাপ্যতা, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং অভিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ। কারণ একজন অভিবাসীর সফলতা শুধু একটি পরিবারের অর্জন নয়; এটি পুরো দক্ষিণ-পূর্ব মিশিগানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে সমৃদ্ধ করে।

 

 

 

Point of Entry: Stories from the Immigrant Experience

This series is a collaboration with Issue Media Group. Support for this series is provided by the Community Foundation for Southeast Michigan.

সম্পাদকের নোট: এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যক্তির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতাগুলো মিশিগানে বসবাসরত একাধিক বাংলাদেশি অভিবাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিউইয়র্কে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর অ্যাসোসিয়েশনের অভিষেক ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত

নিউজার্সির প্রাইমারি নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুব্রত ও লাকীর জয়

মিশিগানে আইনি সহায়তায় আস্থার প্রতীক ‘মুমেন বারলাস্কার ল ফার্ম’

মিশিগানে আধুনিক দন্তচিকিৎসায় আলো ছড়াচ্ছে ‘হ্যাপি স্মাইল ফ্যামিলি ডেন্টাল’ ও ‘টিউলিপস ফ্যামিলি ডেন্টাল’

হালাল হোম ফাইন্যান্সিংয়ে মিশিগানের জনপ্রিয় নাম ‘বেস্ট রেট ’

মিশিগানে আধুনিক রিয়েল এস্টেট সেবায় সুনাম কুড়াচ্ছে ‘মাইলিভিং বাই আমেরিকান রিয়েলটরস’

মিশিগানে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার প্রতীক ‘এ টু জেড ফার্মেসি’

স্বপ্নের পথে বাধা: মিশিগানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের শেষ কোথায়?

২৫০ বছরের আমেরিকা: গৌরবের সঙ্গে আত্মবিশ্লেষণও

১০

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি: যুদ্ধ, প্রেম ও জীবনের কথক: নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

১১

কর ও ব্যয়ের চাপে আবাসন খাত, অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষ

১২

বাংলাদেশের কূটনীতিতে নয়া বার্তা শুরুতেই মালয়েশিয়া ও চীন

১৩

জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিতে এমসি কলেজে জুলোজি ক্লাবের কুইজ

১৪

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায়, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট

১৫

মিশিগানে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শামসুজ্জামান সংবর্ধিত

১৬

মিশিগানে দুর্গা টেম্পল ডেট্রয়েটের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য কমিউনিটি বনভোজন অনুষ্ঠিত

১৭

৮ আগস্ট  ‘’বাংলাদেশ ল’য়ার্স এসোসিয়েশন অফ মিশিগান, ইউএসএ এর ফ্যামিলি ডিনার- ২০২৬‘’ অনুষ্ঠিত হবে

১৮

মিশিগানে বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি ইনক’র উদ্যোগে শিক্ষাণুরাগী শামসুজ্জামান শাহজাহানকে সংবর্ধনা

১৯

মিশিগানে সিলেট সদর দক্ষিণ সুরমা অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগান’এর অভিষেক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

২০