আবুল কাসেম
২ জুন ২০২৬, ৫:২৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ফ্যাশন, চলচ্চিত্র আর সংস্কৃতিতে আজও জীবন্ত মেরিলিন মনরো

হলিউডের ইতিহাসে এমন তারকা খুব কমই আছেন, যাঁদের জীবন, প্রেম, সাফল্য ও মৃত্যু নিয়ে এতটা রহস্য ˆতরি হয়েছে, যতটা হয়েছে মেরিলিন মনরো-কে ঘিরে| তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী ছিলেন না; ছিলেন বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় সংস্কৃতির সবচেয়ে আলোচিত নাম| তাঁর হাসি, সৌন্দর্য, আবেদনময় উপস্থিতি, ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম এবং রহস্যময় মৃত্যু সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক কিংবদন্তি|

 

 

জন্ম থেকে সংগ্রামের শুরু

১৯২৬ সালের ১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেন মেরিলিন মনরো| জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল নোর্মা জিন মর্টেনসন| পরে তিনি পরিচিত হন নোর্মা জিন বেকার নামেও| তাঁর ˆশশব ছিল দুঃসহ ও অনিশ্চয়তায় ভরা| মায়ের মানসিক অসুস্থতার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাঁকে থাকতে হয়েছে অনাথ আশ্রম, পালক পরিবার ও সরকারি হোমে| বাবার পরিচয়ও ছিল অস্পষ্ট| নিরাপদ ˆশশব, পারিবারিক স্নেহ কিংবা স্থায়ী আশ্রয় এর কোনোটাই পাননি তিনি| মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেন জেমস ডুগার্টিকে| মূলত অনাথ আশ্রমে ফিরে যাওয়া এড়াতেই এই বিয়ে| কিন্তু এই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর ¯স্বামী নৌবাহিনীতে যোগ দিলে নোর্মা কাজ নেন একটি বিমান কারখানায়| সেখানেই বদলে যায় তাঁর ভাগ্য|

 

 

ক্যামেরার সামনে নতুন জীবন

কারখানায় কাজ করার সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি প্রচারণামূলক ফটোশুটে অংশ নেন তিনি| ফটোগ্রাফার ডেভিড কোনোভারের ক্যামেরায় তাঁর ছবিগুলো নজর কাড়ে| এরপর শুরু হয় মডেলিং| কিছুদিনের মধ্যেই তিনি চুলের রং বদলে ¯^র্ণালি করেন, নতুন লুক ˆতরি করেন এবং হলিউডে অডিশন দিতে শুরু করেন| টোয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্স তাঁকে চুক্তিবদ্ধ করে| তখনই জন্ম হয় নতুন নাম- মেরিলিন মনরো“মেরিলিন” নামটি নেওয়া হয়েছিল ব্রডওয়ের অভিনেত্রী মেরিলিন মিলারের নাম থেকে, আর “মনরো” ছিল তাঁর মায়ের পারিবারিক পদবি|

 

 

হলিউডে উত্থান

প্রথমদিকে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও খুব দ্রুতই নিজের আবেদন, অভিনয় দক্ষতা এবং ক্যামেরা উপস্থিতির কারণে আলাদা হয়ে ওঠেন তিনি| ১৯৫০-এর দশকে তিনি হয়ে ওঠেন হলিউডের সবচেয়ে বড় নারী তারকা| তাঁর অভিনীত জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডস, নায়াগ্রা, দ্য সেভেন ইয়ার ইচ, সাম লাইক ইট হট, বাস স্টপ, লেটস মেক ইট লিগ্যাল-একের পর এক হিট সিনেমা আসতে থাকল| বিশেষ করে “সাম লাইক ইট হট” চলচ্চিত্রটি তাঁকে এনে দেয় গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার| যদিও তাঁকে দীর্ঘদিন শুধুই “সেক্স সি¤^ল” হিসেবে দেখা হয়েছে, তিনি নিজেকে একজন সিরিয়াস অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন|

 

 

সেই সাদা স্কার্টের দৃশ্য

বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যগুলোর একটি এসেছে “দ্য সেভেন ইয়ার ইচ” থেকে| নিউইয়র্কের সাবওয়ে ভেন্ট থেকে বাতাস উঠে মেরিলিনের সাদা স্কার্ট উড়িয়ে দিচ্ছে- এই দৃশ্য তাঁকে চিরকালীন আইকনে পরিণত করে| এই পোশাকটি পরবর্তীতে নিলামে প্রায় ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়|

 

প্রেম, বিয়ে ও ব্যক্তিগত অস্থিরতা

মেরিলিন মনরোর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত আলোচিত| তিনি মোট তিনবার বিয়ে করেন| প্রথম ¯স্বামী জেমস ডুগার্টির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি বিয়ে করেন কিংবদন্তি বেসবল খেলোয়াড়
ডি ম্যাগিয়োকে| কিন্তু এই সম্পর্কও টেকেনি| ডি ম্যাগিয়ো নাকি মেরিলিনের খোলামেলা ইমেজ ও জনপ্রিয়তা মেনে নিতে পারতেন না| মেরিলিন এরপর ১৯৫৬ সালে বিয়ে করেন বিখ্যাত নাট্যকার নাট্যকার আর্থার মিলারকে| মিলার ছিলেন ইহুদি| তাঁকে বিয়ে করার জন্য ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেন মেরিলিন| কিন্তু মানসিক চাপ, গর্ভপাত, হতাশা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত এই সংসারও ভেঙে দেয়|

 

 

জন কেনেডি ও গোপন সম্পর্কের গুঞ্জন

মেরিলিন মনরোর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গুঞ্জন| ১৯৬২ সালে কেনেডির জন্মদিনে “হ্যাপি বার্থডে মিস্টার প্রেসিডেন্ট” গানটি পরিবেশন করে তিনি ব্যাপক আলোচনায় আসেন| অনেকের দাবি, তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল| আবার কেউ কেউ মনে করেন, এসব ছিল অতিরঞ্জিত গসিপ| তবে এই সম্পর্ক নিয়েই পরে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ˆতরি হয়|

এলভিস প্রিসলির সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন

এলভিস প্রিসলি-এর সঙ্গেও মেরিলিনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে| বলা হয়, তাঁরা একাধিকবার গোপনে দেখা করেছিলেন| যদিও বিষয়টি কখনো প্রকাশ্যে ¯কার করা হয়নি|

 

 

সৌন্দর্যের রহস্য

মেরিলিন মনরো নিজের সৌন্দর্য ধরে রাখতে খুবই সচেতন ছিলেন| তিনি নিয়মিত ব্যায়াম করতেন, ওজন তুলতেন এবং ঘুমকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন| তিনি বিশ্বাস করতেন, ভালো ঘুম নারীর সৌন্দর্যের প্রধান উপাদান| ঠান্ডা পানিতে গোসল করতেন এবং রোদ এড়িয়ে চলতেন, যাতে ত্বকে ট্যান না পড়ে| তাঁর বিখ্যাত লাল লিপস্টিক, প্লাটিনাম ব্লন্ড চুল ও আবেদনময় ভঙ্গি পরে হলিউডের “গ্ল্যামার আইকন” ধারণাকেই বদলে দেয়|

 

 

নগ্ন ফটোশুট ও সাহসী ¯সীকারোক্তি

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অর্থকষ্টে পড়ে তিনি নগ্ন ফটোশুট করেছিলেন| পরে সেই ছবিগুলো প্রকাশ্যে এলে হলিউডে তুমুল আলোচনা শুরু হয়|

কিন্তু বিষয়টি অসীকার না করে মেরিলিন নিজেই ¯সীকার করেন যে ছবিগুলো তাঁর| সেই সময়ের রক্ষণশীল সমাজে এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ| অনেকে মনে করেন, যৌনতা ও নারীদেহ নিয়ে আমেরিকান সমাজের প্রচলিত ট্যাবু ভাঙতে মেরিলিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন|

 

 

মানসিক অবসাদ ও নিঃসঙ্গতা

পর্দার উজ্জ্বলতার আড়ালে মেরিলিন ছিলেন ভীষণ একাকী| অনিদ্রা, উদ্বেগ, হতাশা এবং ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে তাঁকে গ্রাস করে|

হলিউড তাঁকে সৌন্দর্যের প্রতীক বানালেও একজন মানুষ হিসেবে তাঁর ভঙ্গুরতা খুব কম মানুষই বুঝেছিল|

তিনি বারবার চেষ্টা করেছিলেন নিজেকে একজন গভীর ও দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে প্রমাণ করতে| কিন্তু অধিকাংশ প্রযোজক তাঁকে কেবল গ্ল্যামারের প্রতীক হিসেবেই ব্যবহার করেছেন|

 

রহস্যময় মৃত্যু

১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় মেরিলিন মনরোকে| তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৬| সরকারিভাবে তাঁর মৃত্যুকে “সম্ভাব্য আত্মহত্যা” বলা হয়| অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ গ্রহণই মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল| অনেকে মনে করেন, তাঁর মৃত্যু ¯^াভাবিক ছিল না| কেউ বলেন রাজনৈতিক গোপন তথ্য জানার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল| কেউ আবার কেনেডি পরিবারকে ঘিরে নানা তত্ত্ব হাজির করেন| তবে আজও নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেনি, কী ঘটেছিল সেই রাতে|

 

 

মৃত্যুর পরেও কিংবদন্তি

মৃত্যুর পরও মেরিলিন মনরোর জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে| তাঁর ব্যবহৃত পোশাক, প্রসাধনী, চিঠি, এমনকি ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও কোটি টাকায় নিলামে বিক্রি হয়| তিনি আজও ফ্যাশন, সিনেমা, পপ সংস্কৃতি ও নারীর ¯^াধীনতার আলোচনায় অন্যতম বড় নাম|

 

 

কেন আজও রহস্যময়?

মেরিলিন মনরোকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই, কারণ তাঁর জীবনে একই সঙ্গে ছিল- দারিদ্র্য ও খ্যাতি, প্রেম ও নিঃসঙ্গতা, সাফল্য ও হতাশা, গ্ল্যামার ও ভঙ্গুরতা| তিনি ছিলেন একাধারে ¯^প্নের নারী, আবার এক অসহায় মানুষও| তাঁর হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা ও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা| শেষ পর্যন্ত মেরিলিন মনরোর জীবন যেন এক অসমাপ্ত চলচ্চিত্র যেখানে আলো ছিল, করতালি ছিল, অগণিত ভক্তের ভালোবাসা ছিল; কিন্তু ছিল না মানসিক শান্তি কিংবা সত্যিকারের নিরাপদ আশ্রয়| পর্দার ঝলমলে হাসির আড়ালে তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন নিঃসঙ্গতা, অনিশ্চয়তা আর ভাঙাচোরা এক জীবনের গল্প| হয়তো এ কারণেই মৃত্যুর এত দশক পরও তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল ফুরায় না|

 

 

সময়ের সঙ্গে অনেক তারকার নাম হারিয়ে গেছে, কিন্তু মেরিলিন মনরো আজও রয়ে গেছেন বিশ্ব সংস্কৃতির এক চিরসবুজ প্রতীক হয়ে| তাঁর জীবন যেন একই সঙ্গে সাফল্যের রূপকথা ও ট্র্যাজেডির উপাখ্যান| মৃত্যুর এতগুলো বছর পরও মেরিলিন অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছেন|

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হোয়াইট হাউসের নেতৃত্বে পরিবর্তন, চিফ অব স্টাফ হলেন স্টিফেন মিলার

১

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে আইপ্যাকের ব্যয় ৮৪ মিলিয়ন ডলার, ৫৫ মিলিয়নই বিফলে

২

বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় ধস, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষতি ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার

৩

আটক অভিবাসীদের অবস্থান প্রকাশে বাধা, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে চার সংস্থার মামলা

৪

কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্প কি শুল্ক ও অভিবাসন নীতি ধরে রাখতে পারবেন?

৫

বিজয় ভাষণে জেডি ভ্যান্সকে কেন ‘হাবিবি’ বললেন আবদুল আল-সাঈদ

৬

মিশিগানে বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতির নতুন কমিটির অভিষেক ১৫ নভেম্বর

৭

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন ইতিহাস গড়লেন ১০ প্রার্থী

৮

গ্রিনকার্ড ও ওয়ার্ক পারমিটের আবেদনে কঠোর হচ্ছে ইউএসসিআইএস

৯

স্পিকার পদে কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্ব, নতুন ইতিহাসের অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র

১০

‘ট্রাম্পই এখনো প্রেসিডেন্ট’, সোশ্যাল মিডিয়ায় হোয়াইট হাউস

১১

মার্কিন কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ পেয়ে ডেমোক্র্যাটদের সামনে যেসব সুযোগ

১২

কমলগঞ্জে প্রবাসীর বাড়িতে চুরির ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য, ক্ষতি ৩ লাখ টাকা

১৩

সহজে পালনীয় নবীজির ২০টি সুন্নত

১৪

নিত্যজীবনের ১০টি অবহেলিত সুন্নত

১৫

মার্কিনকর্মীদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের

১৬

বাড়বে শীত: আগাম প্রস্তুতিই নিরাপত্তার প্রধান শর্ত

১৭

রোড ক্র্যাশ নিরসন: শুধু আইন নয়, সকলকেই দায়িত্ব নিতে হবে

১৮

মিডটার্ম ইলেকশনে ব্যালটে নেই ট্রাম্প, তবু পরীক্ষাটা তাঁরই

১৯

আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন: আইরিন খান

২০