মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আশা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে। যুদ্ধবিরতির পর যে স্বস্তির পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল, সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় তা নতুন করে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার জবাবে তারা ইরানের সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে মার্কিন হামলাকেই যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে এবং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরকে চুক্তি ভঙ্গের জন্য দায়ী করছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু দুটি দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যার অভিঘাত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি বহন করতে হয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, কয়েক দিন আগেও যুদ্ধবিরতির ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। জাহাজ চলাচল শুরু হয়, কূটনৈতিক আলোচনাও এগোচ্ছিল। কিন্তু নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই সম্ভাবনা আবারও প্রশ্নের মুখে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিশোধের রাজনীতি যতই তীব্র হয়, আলোচনার টেবিল ততই দূরে সরে যায়।
আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা হলো, এর কোনো প্রকৃত বিজয়ী থাকে না। সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িক সুবিধা অর্জন করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় সংঘাত শেষ পর্যন্ত আরও নতুন সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে যেতে না দেওয়া। জাতিসংঘ, আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক অংশীদারদের উচিত উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য সংলাপের ব্যবস্থা করা। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক তদন্তই প্রকৃত সত্য উদঘাটনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
বিশ্ব আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন নতুন কোনো বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধের সামর্থ্য কারও নেই। অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং মানবিক সংকটের এই সময়ে যুদ্ধ নয়, শান্তিই হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান অগ্রাধিকার।
প্রশ্নটি তাই এখনো রয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের শেষ কোথায়? এর উত্তর আরও ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনে নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা, সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কূটনৈতিক উদ্যোগেই নিহিত। কারণ যুদ্ধের সমাপ্তি যুদ্ধ দিয়ে নয়, শান্তির পথেই সম্ভব।
মন্তব্য করুন