বাংলা সংবাদ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ৫:১৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইরানকে ঘিরে মার্কিন কৌশল: সম্ভাব্য লক্ষ্য ও পদ্ধতির বিশ্লেষণ

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন চালানো হলে ওয়াশিংটন দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে বারবার হুমকি দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

 

আজ বুধবার বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির কিছু কর্মীকে সন্ধ্যার মধ্যে ঘাঁটি ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা এবং এর জবাবে দেশটির পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।

 

 

ইরানে ক্রমেই খারাপ হতে থাকা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ক্ষমতায় থাকা দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক গণ–আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে তাঁরা দেশটিতে ক্ষমতায় রয়েছেন।

 

 

গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ তাঁর এই মন্তব্যের পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ আসন্ন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়।তবে ওয়াশিংটন যদি সত্যিই ইরানে হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের হাতে কী কী বিকল্প রয়েছে এবং সেগুলো কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি দেখে নেওয়া যাক:

 

 

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কেমন

 

যুদ্ধজাহাজগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটির এক বিশাল নেটওয়ার্ক চালু রয়েছে। গত জুন মাস থেকে এখন পর্যন্ত এই পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।এই ১৯টি অবস্থানের মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।

 

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কূটনীতিকদের উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে বুধবারের মধ্যে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কী কারণে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। আল-উদেইদ হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি, যেখানে দেশটির ১০ হাজার সেনা অবস্থান করে। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরান এই ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল।

 

 

একজন কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি অবস্থানগত একটি পরিবর্তন মাত্র, আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি খালি করার মতো কিছু নয়।’ এই পদক্ষেপের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ তাঁর জানা নেই বলেও ওই কূটনীতিক জানান।গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে ইরানের অন্তত দুটি পারমাণবিক কেন্দ্রে ১৪টি ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ফেলার পর এই ঘটনা ঘটল। এ ধরনের হামলা চালানোর মতো সামরিক সক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

 

 

যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলা চালাতে পারে

 

অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প এমন সংক্ষিপ্ত ও ক্ষিপ্র অভিযান পছন্দ করেন, যেখানে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে থাকে।

 

 

উদাহরণ হিসেবে অধ্যাপক আকবরজাদেহ সম্প্রতি ভেনেজুয়েলা থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং ২০২০ সালে ইরাকের বাগদাদে ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করেন।

 

 

গত বছরের জুনে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘তথাকথিত “সর্বোচ্চ নেতা” কোথায় লুকিয়ে আছেন, তা আমরা ঠিকঠাক জানি।’

 

 

তখন ট্রাম্প আরও লিখেছিলেন, ‘তিনি (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) একটি সহজ লক্ষ্যবস্তু, কিন্তু সেখানে নিরাপদ আছেন—আমরা তাঁকে সরিয়ে দিচ্ছি না (হত্যা করছি না!), অন্তত এখন নয়। কিন্তু আমরা বেসামরিক নাগরিক বা মার্কিন সেনাদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চাই না। আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।

 

 


আকবরজাদেহ মনে করেন, যেহেতু ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাই এটি একটি সম্ভাবনা হতে পারে। তবে ট্রাম্পকে এর ‘অনিবার্য প্রতিক্রিয়ার’ জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার মতো কোনো অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানে চালানো অসম্ভব। ওই অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে তুলে নেওয়া হয়েছিল।

 

 

অধ্যাপক আকবরজাদেহ বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার মতো কোনো অভিযান ইরানে চালানো সক্ষমতার দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন। মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোকে সেখানে অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে এবং ট্রাম্প তেমন কিছু করতে পারেন—এই আশঙ্কায় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ইতিমধ্যে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

 

 

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, ‘ইরান হয়তো মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো সুনির্দিষ্ট হামলার মাধ্যমে সর্বোচ্চ নেতা বা বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে সরিয়ে দিতে চায়। এরপর তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট অংশকে পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ইস্যুতে সেই সিদ্ধান্তগুলো নিতে বাধ্য করবে, যা বর্তমান নেতৃত্ব অস্বীকার করে আসছে।

 

 

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার ঘটনা থেকে তাদের পর্যবেক্ষণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র ইরানে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চায়, তবে তারা সেনা পাঠিয়ে দেশটিতে আগ্রাসন চালাতে যাচ্ছে না। এমনকি ইরাক বা আফগানিস্তানে আমরা যা দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানে সে ধরনের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা জাতি গঠনের লক্ষ্যে এগোচ্ছে না।’

 

 

ইরানে কি স্থল অভিযান সম্ভব?

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটন ইরানে স্থল সেনা পাঠাবে এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এ বিষয়ে অধ্যাপক আকবরজাদেহ বলেন, ‘ট্রাম্প জাতি গঠনকারী নন। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি রক্ষা কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি বিশ্বাস করেন না। মনে রাখতে হবে, তিনি আফগানিস্তানকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাই তিনি ইরানে স্থল অভিযানের ঝুঁকি নেবেন না। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।’ট্রাম্পের অধীনেই যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে শুরু হওয়া আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধ অবসানে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল।

 

 

২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কয়েক মাসের আলোচনার পর কাতার সরকারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধে দোহা চুক্তি সই করেছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা ও তালেবান প্রতিনিধিরা। তবে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব পালনের সময়।

 

 

সূত্র: আল জাজিরা

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্রে ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ ব্যবস্থায় সমর্থন বেড়ে জরিপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ

১

৭ কোটি শিশুর ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট’ প্রস্তুত,ক্লেইম করতে হবে অভিভাবকদের

২

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে বিবিসিসিআইয়ের মতবিনিময় সভা

৩

বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতিতে ৭০ হাজার ডলারের ফি প্রস্তাব ট্রাম্পের

৪

ব্রাডফোর্ডে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের নির্বাচনী প্রচারে গুলজার-কুদ্দুস-মনির প্যানেল

৫

বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতির নতুন কমিটি গঠনের দায়িত্ব আহ্বায়ক কমিটির

৬

আমেরিকান নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ, ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের

৭

সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ট্রাম্পের অনুমোদন

৮

বাংলাদেশিদের মার্কিন ভিজিট ভিসায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার বন্ড

৯

দুই দিনব্যাপী দুর্গোৎসবে সাজবে টাইমস স্কয়ার, আয়োজন ১০ ও ১১ অক্টোবর

১০

বিদেশি কর্মীদের জন্য বড় স্বস্তি, এইচ-১বি ভিসার ১ লাখ ডলারের ফি স্থগিত

১১

মার্কিন প্রবেশপথে বদল আসছে, পাসপোর্ট স্ট্যাম্পের বদলে গুরুত্ব পাবে I-94

১২

৩০ ডলারে কেনা চিত্রকর্ম বিক্রি হলো সাড়ে ১৩ লাখ ডলারে

১৩

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে বৈধ অভিবাসন কমেছে ৯৬ শতাংশ

১৪

কর রিটার্নে নাগরিকত্বের তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের

১৫

২ কোটির বেশি প্রবীণের জন্য এককালীন ৯০ ডলারের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৬

জ্যাকসন হাইটসে প্রকাশ্যেই ভুয়া পাসপোর্ট ও গ্রিন কার্ড বিক্রি

১৭

সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষণে নতুন ব্যাচ নিচ্ছে USA Consulting Tech

১৮

আমেরিকান পাসপোর্টে বৈপ্লবিক পরিবর্তন: অনলাইনেই আবেদন, ছবি তোলা যাবে মোবাইলে

১৯

সেন্টার ফর এনআরবির উদ্যোগে ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা সভা

২০