নিউজ ডেস্ক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১:২৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

আমি মরে গেলে তুমি শহিদ মাতার সম্মান পাবে, মা!

“মা তুমি চিন্তা করো না, আমি মরে গেলে তোমাকে বীরের মা বলে ডাকবে মানুষ, তুমি শহিদের মায়ের সম্মান পাবে। তোমাকে সবাই শ্রদ্ধা করবে”- পাঁচ আগস্ট দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দিতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা বাধা দিলে একথা বলে বেরিয়ে যান সাদ। এটাই মায়ের সঙ্গে সাদ-এর শেষ কথা।

 

ঢাকার ধামরাই পৌরসভার কায়েতপাড়া নিবাসী শফিকুল ইসলাম ও আঞ্জুমান আরার পুত্র আফিকুল ইসলাম সাদ। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী। দুই ভাইয়ের মধ্যে সাদ বড়। সাদ-এর মা আঞ্জুমান আরা বাসস প্রতিবেদককে জানান, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা আঞ্জুমান আরার সাথেই শেষ কথা হয় আফিকুল ইসলাম সাদের। বন্ধুদের সাথে দেখা করার কথা বলে মায়ের কাছ থেকে ২০টাকা চায় সে। মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়েই বেরিয়ে পড়ে সাদ। তখন মা বারবার আন্দোলনে যেতে নিষেধ করলে বলে, “মা, তুমি আমার জন্য চিন্তা করো না, আমার অনেক বন্ধুরাও তো গেছে, আমার কিছু হয়ে গেলে বা মরে গেলে তোমাকে সবাই শহিদের মা, বীরের মা বলবে।” এর কিছুক্ষণ পরই সাভার উপজেলা ও থানার মধ্যবর্তী হার্ডিঞ্জ স্কুলের সামনে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন আফিকুল ইসলাম সাদ।

 

আঞ্জুমান আরা বলেন, সাদ বের হওয়ার পরপরই আমার ছোট ছেলে সাজিদুলও ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এরপরই কানে ভেসে আসে গোলাগুলির শব্দ। এলাকাবাসী বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় সাজিদুলকে। সাজিদুলের কাছেই জানতে পারি সাদ আন্দোলনে গিয়েছে। বারবার ফোনে খোঁজ নিচ্ছিলাম। দুপুরে পরপর দু’বার কথাও হয়। তৃতীয়বার বেলা ৩টার দিকে ফোন দিলে আর ফোন রিসিভ করে না। তখনই মনের ভেতর কেমন যেন করতে থাকে। এর কিছুক্ষণ পর অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন আসে আমার কাছে। বলে, আন্টি আফিকুল তো মাথায় আঘাত পেয়েছে, ওকে আমরা সবাই স্থানীয় ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। অল্প পরে আবারও ফোন দিয়ে বলে, এখানে রাখেনি, আমরা ওকে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, আপনারা চলে আসুন। তখন আমরা সবাই দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ আমার ছেলে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তখন দ্রুত তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের আইসিইউতে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩দিন পর ৮ আগস্ট সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সাদ। সাদ এর মৃত্যুতে থমকে গেছে একটি পরিবারের স্বপ্নও। আদরের সন্তানের মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না শহিদ সাদের বাবা-মা।

 

জানা যায়, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শুরু থেকেই সাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদী বিভিন্ন পোষ্ট দিয়ে নিজের সমর্থনের কথা জানান দেন। ৪ আগস্ট ফেসবুকে পোস্ট করেন, “কুড বি এ নিউ রাইজ”। এরপর লেখেন, “যেই দেশের ইতিহাস রক্ত দিয়ে শুরু হয়েছে ওই ইতিহাস আবার লিখতে রক্তই লাগবে। সাদ-এর বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, “কোথা থেকে কি হয়ে গেলো! আমি হতবাক। আমার পুরো পরিবারটি এলোমেলো হয়ে গেলো। এ শোক কিভাবে কাটাবো আমরা। তিনি বলেন, আট তারিখ সকালে যখন চিকিৎসকরা বললো সাদ আর নেই, তখন আমি সাদের সামনে গিয়ে ওকে তিনবার বাবা বাবা বলে ডাকি, যদি মিরাকল কিছু হয়ে যায়। কিন্তু আমার বাবা আর উঠলো না। আমার ছেলেটা অত্যন্ত মেধাবী ছিল। পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছে। এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। চাকুরির প্রতি আগ্রহ না থাকলেও বড় হয়ে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন ছিল সাদ-এর। একটি বুলেটে সবকিছুই শেষ হয়ে গেলো।

 

সাদ-এর বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পড়ার টেবিল, বিছানা, খেলার ট্রফিগুলো শোভা পাচ্ছে ঘরের আনাচে কানাচে। সবই আছে নেই শুধু সাদ। সকাল গড়িয়ে দুপুর, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, আজো যেন প্রতীক্ষায় বাবা-মা আর ভাই। তবু ফেরে না সাদ। ছেলেকে হারিয়ে এ্যালবামের ছবি, আলমারিতে রাখা খেলার ট্রফি’র মাঝেই মা আঞ্জুুমান আরা খুঁজে ফিরছেন নাড়ি ছেঁড়া ধন ছেলের স্মৃতি। সাদ-এর অনুপস্থিতি মানতে পারছেন না বাবা শফিকুল ইসলাম কিংবা আদরের ছোট ভাই সাজিদুলও।

 

সাদ-এর ছোট ভাই সাজিদুল বলেন, “সাদ আমার বড় ভাই হলেও তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। আমাকে অনেক ভালোবাসতো সে। যে কোন কিছুই আমার সাথে শেয়ার করতো। আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেত। কেন যে আমাকে সেদিন সঙ্গে নিলো না, বুঝতে পারছি না। ভাইয়ের জন্য সকলের কাছে দোয়া চাই।” তিনি বলেন, যেদিন দেশ থেকে সত্যিকারের বৈষম্য দূর হবে, সেইদিনই সার্থক হবে আমার ভাইয়ের আত্মত্যাগ। সাদ-এর প্রতিবেশি ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান অভি, ছাত্র-জনতার এ আন্দোলনে নিহত ভাগ্নের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ ন্যায় বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি সাদ অত্যন্ত ভালো ছেলে ছিল। সমাজের সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল তার। তার ভালো ব্যবহারের জন্য মহল্লার সবাই তাকে স্নেহ করতো। সাদ-এর জন্য সকলের কাছে দোয়া চান তিনি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ট্রাম্পের অভিবাসন অভিযানে পরিবারছাড়া লক্ষাধিক শিশু

আইসের গণগ্রেপ্তারে লাগাম, স্বস্তিতে নিউইয়র্কের অভিবাসীরা

সংসদ সদস্যকে পাত্তাই দিচ্ছেন না উপজেলা প.প কর্মকর্তা, স্থানীয় মহলে চাপা ক্ষোভ

চুক্তি জটিলতায় মিশিগান মেডিসিন ছাড়তে হতে পারে আড়াই লাখ রোগীকে

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মাথার দাম ঘোষণা ইরানের, পুরস্কার ৫৮ মিলিয়ন ডলার

ইরানের মানচিত্রে মার্কিন পতাকা, ট্রাম্পের পোস্ট ঘিরে তোলপাড়

টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘পার্টনার কংগ্রেস’ ও কৃষি প্রযুক্তি মেলা অনুষ্ঠিত

মিশিগানে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে যুবলীগের আলোচনা সভা

নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘বাংলাদেশ ডে প্যারেড’

ভুয়া তথ্য দিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব, ১২ জনের সিটিজেনশিপ বাতিলের উদ্যোগ

১০

মিশিগানে এডভোকেট বৃন্দের পরিচিতি ও সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

১১

মার্কিন ‘কঠোর ৫ দফা’ প্রস্তাবে না বলল ইরান

১২

আগামী ২৫ ও ২৬ জুলাই মিশিগানে বসছে বাংলাদেশি আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল

১৩

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদে ইতি টানতে যাচ্ছেন স্টারমার

১৪

হাউজিং ভাউচার তহবিল কমায় নিউইয়র্কে বাড়ছে আবাসন সংকটের শঙ্কা

১৫

কমলগঞ্জে চা শ্রমিকদের মানববন্ধন ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালুর দাবিতে

১৬

তাইওয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সতর্কবার্তা

১৭

যুক্তরাষ্ট্রে শেষকৃত্যের ব্যয় বেড়ে চরম চাপে প্রবাসী মুসলিম পরিবার

১৮

জেলা প্রশাসকের প্রবাসী সম্মাননায় ভূষিত প্রিন্সিপাল মাওঃ আতিকুর রহমান

১৯

গেমস্টপের ৫৫.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল ইবে

২০