আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারপাশে শুধুই জল আর অজানা অন্ধকারের গভীরতা। হাওয়া বইছে হালকা, কিন্তু তার মাঝে একটা অস্থিরতা লুকানো,কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ছোট রাবারের নৌকা। যাত্রী প্রায় ত্রিশজন।আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। গেইম শুরুর যথাযথ দিন।
গেইমের শুরুতেই এই রহস্যময় পরিবেশে, অন্ধকারে ছোট রাবারের নৌকাটির মধ্যে ত্রিশজন যাত্রী চেপে বসে আছে। কিছু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। নৌকার মাঝি মাথা নিচু করে চালাচ্ছে, মনে হয় সে জানে সামনে বিপদ আছে। যাত্রীরা ভীত। কারো কারো চোখ অন্ধকারের মাঝে স্বপ্ন দেখছে। কেউ বা ভাবছে এই যাত্রা শেষ হবে কি না। সামনের দিকে অন্ধকারের মধ্যে কিছু দেখা যাচ্ছে না, শুধু গভীর জল আর অজানা অনিশ্চয়তা। চারপাশে অন্ধকারের বলয় ঘিরে ধরেছে, আকাশের তারাগুলোর আলো যেন ক্ষণস্থায়ী, অপ্রতুল।যাত্রীরা সবাই ভীত, কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছে, কেউ বা চোখের কোণে অশ্রু লুকাচ্ছে। কিছু মানুষ মনে মনে ভাবছে, এই অন্ধকারের শেষে কি কখনো তারা আলোর তীরে ফিরতে পারবে? এই অজানা অনিশ্চয়তা কি শেষ হবে কখনো?
উজ্জ্বল যেন নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত চাপ অনুভব করছে। তার বুক কাঁপে তিরতির করে। আর বুকের পাশে উঁকি দেয় আরেকটি মিষ্টি মুখ জিনিয়া। শ্যামলা দীঘল চুলের এই মেয়েটি কী যে মায়ায় জড়িয়ে রাখে উজ্জ্বলকে। ইতিহাস বইতে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ছবির মত দেখতে এই যুবকের অবয়ব স্বপ্নের দিকে এগোতে থাকা এই যাত্রায় কখনো কখনো মনে হয় এই পথের শেষ কোথায়। তার মনে হচ্ছে, যেন এই অন্ধকারের মধ্যে কিছু ভয়ঙ্কর বিপদ লুকিয়ে আছে। আর এই বিপদ আসছে কি না!
সামনের দিকে অন্ধকারের মধ্যে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু গভীর জল, অজানা অনিশ্চয়তা আর তার স্বপ্নের জন্য লড়াই। এই মুহূর্তে উজ্জ্বল বুঝতে পারছে না এই যাত্রার শেষ কোথায়। সে জানে, এই অন্ধকারের মধ্যে তার স্বপ্নের আলো জ্বলবে কি না, তা এখনই সিদ্ধান্ত হবে। উজ্জ্বল যেন এই যাত্রার অংশ, যেখানে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে কেউ জানে না কি তা! মনেমনে ভাবে একদিন জিনিয়ার জন্য ফিরতে হবে। নৌকা ধীরে ধীরে লিবিয়ার সীমান্ত ছেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের মাঝে, ত্রিশজন তাদের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে চলেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আতঙ্কে, কেউ কেউ আশা নিয়ে। কারণ যেকোন সময় হয়তো ওরা সীমান্তের নিরাপত্তা বাহিনীর কারো নজরে পড়তে পারে।
নৌকার চারপাশে জলরাশি, আর অন্ধকারের মধ্যে কিছুই স্পষ্ট নয়। উজ্জ্বল চোখ বন্ধ করে গভীর মনোযোগের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। তার মনে আসে মায়ের কথা, সেই সুন্দর, প্রেমময় মুখের কথা। মায়ের চোখের মায়া, ভালোবাসা, তার জন্য সবকিছুই যেন তার হৃদয়ে ঝড় তুলছে। সে মনে মনে বলে, “মা, আমি তোমার জন্য কখনোই কিছু করতে পারিনি, কিন্তু একটা স্বপ্নের জন্য আমি লড়াই করছি। তোমাকে সুখী করতে চাই।” উজ্জ্বলের চোখে অশ্রু ঝরতে লাগল, যেন এই অন্ধকারের যাত্রা তাকে আরও একবার প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে এলো। সে জানে, এই কঠিন মুহূর্তগুলো তার জন্য এক পরীক্ষার মতো। সে আবার মনে মনে প্রার্থনা করে, আল্লাহ যেন তাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তার স্বপ্ন পূরণের জন্য শক্তি দেন। এভাবেই, অন্ধকারের মাঝে তার মনোভাব আরও দৃঢ় হয়, স্বপ্নের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে।
বুকের কাছে পানির বোতল শক্ত করে ধরে থাকে। গ্রামের নাম কুলঞ্জ। সবুজে ঘেরা, শান্ত আর নিরিবিলি। পাশেই বয়ে গেছে নদী। সেই গ্রামে থাকে উজ্জ্বল নামে এক ছেলে। খুব বেশি কিছু ছিল না তার, কিন্তু ছিল একটা বড় স্বপ্ন। একদিন সে নিজের পরিবারকে সুখে রাখবে। প্রতিদিন ভোরে উঠে উজ্জ্বল বাবার সাথে মাঠে কাজ করত, তারপর স্কুলে যেত। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু চোখে ছিল আশা, স্বপ্ন। গ্রামের মানুষরা বলত, “এত কষ্ট করে কী হবে?” উজ্জ্বল শুধু হেসে বলত, “একদিন দেখবেন।”
ছোট সে গ্রামে থাকতো উজ্জ্বল।তার স্বপ্ন ছিল বড়। গ্রীসের নীল সমুদ্র হাতছানি দিয়ে ডাকতো।বড় হয়ে গ্রীসে গিয়ে কাজে লাগবে এবং নিজের আর পরিবারের জীবিকা চালাবে। অনেকদিন ধরে সে স্বপ্ন দেখতো, গ্রীসের সমুদ্রের ধারে গিয়ে বাংলাদেশী বিরিয়ানী আর হাঁসের ভূনার রেস্টুরেন্ট দিয়ে নতুন জীবন শুরু করবে। উজ্জ্বলের গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে চলতো শান্ত নদী, কিন্তু তার চোখে ভেসে থাকতো ভূমধ্য সাগরের নীল জলরাশি। গ্রামের অভাবের সংসার, অভাবের তাড়নায় উজ্জ্বল পড়াশোনা বেশি দূর চালাতে পারেনি। তাই কিশোর বয়স থেকেই তার মাথায় ঘোরে বিদেশ বিভূঁইয়ের চিন্তা। সে শুনেছিল গ্রীসে কৃষিকাজ এবং পর্যটন শিল্পে অনেক কাজ পাওয়া যায়।
প্রথমেই গিয়ে সাগর পাড়ে কোন রেস্টুরেন্টে কাজ নিবে বা গ্রীসের কোনো অলিভ বাগানে কাজ করবে।গ্রামের বড় ভাইদের গ্রীসে যাওয়ার গল্প শুনে উজ্জ্বলের স্বপ্ন আরও রঙিন হয়ে ওঠে। সে প্রায়শই নদীর পাড়ে বসে থাকতো আর ভাবতো, একদিন সেও এই গ্রামের মাটি ছেড়ে পাড়ি জমাবে সুদূর গ্রীসে। রোদে পোড়া চামড়া আর কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত শরীর নিয়ে সে স্বপ্ন দেখতো।যেন সে বিকেলে সমুদ্রের ধারে বসে অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে পরিবারের কথা ভাবছে।
সে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো গ্রীসে যাওয়ার জন্য।কলেজ শেষ করে ইংলিশ স্পিকিং কোর্স করলো। উজ্জ্বল খুবই পরিশ্রমী ছেলে। তার বাবা-মা ছিলো খুব গরিব। উজ্জ্বল ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশুনা করতো, যাতে বড় হয়ে কিছু একটা করতে পারে। একদিন উজ্জ্বল তার বাবার কাছে বলে, “আব্বা, আমি গ্রীসে যাবো। ওখানে অনেক কাজ আছে, আমি হয়তো কিছুদিন পরে অনেক টাকা নিয়ে ফিরে আসবো।” রফিক নামের দালালের সাথে যোগাযোগ করে এবার সে শহরে গিয়ে পাসপোর্ট করে ফেললো।ভিতরে তার ভীষন উত্তেজনা। মনে চিন্তা কীভাবে বারো লক্ষ টাকা যোগাড় করবে।
ভিটেমাটি বন্ধক রেখে তার বাবা তাকে বারো লক্ষ টাকা সংগ্রহ করে দিলেন। উজ্জ্বলের জমানো টাকা এবং পরিবারের শেষ সম্বলটুকু নিয়ে সে একদিন পৌঁছায় রফিকের কাছে। সূদখোর মহাজনের জিম্মায় বাবার বসতবাটী রেখে তার কাছ থেকে বারো লক্ষ টাকা নিয়ে দালালকে দিয়েছে। বাবা মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছেন -দোয়া করি বাবা। সে বড় আশা নিয়ে ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে টিকেট কাটলো। তার গ্রীস যাওয়ার দিন এলো। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর থেকে ওরা এক গ্রামের চারজন ছেলে রওনা দিলো। ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর ওদের এয়ার জর্ডান এ তুলে দিলো।
জর্ডান পৌঁছৈনোর পর দালালের লোকজন ওদের বাসে তুলে দিলো।এক নিরিবিলি এলাকায় বাস থেকে নামিয়ে কাভার্ড ভ্যানে তুলে দিলো। ওরা লিবিয়ার পোর্টে নিয়ে নামিয়ে দিলো রাতের অন্ধকারে। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন তাকে অন্য অভিবাসীদের সাথে একটি ছোট, জরাজীর্ণ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়। যে ভূমধ্য সাগরের নীল জলরাশির স্বপ্ন সে সুনামগঞ্জের নদীর পাড়ে বসে দেখতো, সেই সমুদ্রই এখন তার সামনে এক সাক্ষাৎ মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।
নৌকায় খাবার নেই, জল নেই, আর চারিদিকে শুধু অথৈ পানি। দালালেরা তাদের সাথে পশুর মতো আচরণ করতে থাকে, কিন্তু তখন আর পেছনে ফেরার কোনো পথ ছিল না। তার মনে হচ্ছে, এই অন্ধকারের মাঝে তার স্বপ্নের আলো জ্বলে উঠবে কি না তা এখনো অজানা। তবে তার মনে একটাই বিশ্বাস, এই অন্ধকার কাটিয়ে সে একদিন পৌঁছাবে তার স্বপ্নের দেশে। উজ্জ্বল চোখ বন্ধ করে গভীর মনযোগের সঙ্গে তার মা-বাবার কথা মনে করে। তার মনে পড়ে মা-বাবার স্নেহময় মুখ, সেই প্রিয় হাসি, আর আদর-আশ্রয়। তাদের জন্য সুখের দিন ফিরে আসুক, এই স্বপ্নের জন্য সে লড়াই করছে।
উজ্জ্বল মনে মনে বলে, “মা, বাবা, আমি তোমাদের জন্য অনেক কিছু করতে চাই। এই অন্ধকারের মধ্যে আমি তোমাদের স্মরণ করে শক্তি নিচ্ছি। তোমাদের ভালোবাসা আমার এই পথে চলার শক্তি।” সে জানে, এই অন্ধকারের মাঝে তার মা-বাবার মুখের কথা, সেই মায়াময় হাসি তার হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই স্মৃতিগুলো তাকে আরও একবার সাহস দেয়, যেন বলতে চাচ্ছে এই যাত্রা শেষ হবে। সুখ আসবে। আবার ফিরে পাবে তার স্বপ্নের আলো । নৌকার চারপাশে জলরাশি, আর অন্ধকারের মধ্যে কিছুই স্পষ্ট নয়। এই যাত্রা কি শেষ হব।
উজ্জ্বল চোখ বন্ধ করে গভীর মনযোগের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। তার মনে আসে মায়ের কথা, সেই সুন্দর, প্রেমময় মুখের কথা। মায়ের চোখের মায়া, ভালোবাসা, তার জন্য সবকিছুই যেন তার হৃদয়ে ঝড় তুলছে। সে মনে মনে বলে, “মা, আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারিনি, কিন্তু এই স্বপ্নের জন্য আমি লড়াই করছি। তোমাকে সুখী করতে চাই।” উজ্জ্বলের চোখে অশ্রু ঝরতে লাগল, যেন এই অন্ধকারের যাত্রা তাকে আরও একবার প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে এলো। সে জানে, এই কঠিন মুহূর্তগুলো তার জন্য এক পরীক্ষার মতো। সে আবার মনে মনে প্রার্থনা করে, আল্লাহ যেন তাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তার স্বপ্ন পূরণের জন্য শক্তি দেন। এভাবেই, অন্ধকারের মাঝে তার মনোভাব আরও দৃঢ় হয়, স্বপ্নের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে।
গত মাসের এক সন্ধ্যায় লিবিয়ার তোবরুক অঞ্চল থেকে একটি রাবার বোটে করে মোট ত্রিশজন যাত্রী গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রাপথে নৌকাটি দিক হারিয়ে ফেলে এবং টানা ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। এ সময় যাত্রীরা খাবার ও পানির তীব্র সংকটে পড়েন। ইয়েরাপেত্রা উপকূল থেকে প্রায় ৫২ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে একটি বিপদগ্রস্ত নৌকার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়।
চতূর্থ দিন উজ্জ্বল ক্ষুধাকাতর হয়ে, জলের তৃষ্ণায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। পরে একটি উদ্ধারকারী জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছাব্বিশজনকে জীবিত উদ্ধার করে। এরা জনপ্রতি বারো লাখ টাকা চুক্তিতে উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসে যেতে চাইলেও যেতে পারেনি।আর মৃত চারজনের মধ্যে একজন ছিল উজ্জ্বল।
মন্তব্য করুন