যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন দুটি নির্বাহী আদেশ জারি করে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধ এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। জুনে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের উদ্যোগ আটকে দেওয়ার পর নতুন করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মগ্রহণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার নীতিকে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বলা হয়। আইনগতভাবে এটিকে ‘জুস সলি’ বা ‘মাটির অধিকার’ বলা হয়। এই নীতি মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে সুরক্ষিত।
গৃহযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সাবেক দাসদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ১৪তম সংশোধনী প্রণয়ন করা হয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পান, বাবা-মা মার্কিন নাগরিক না হলেও। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান এবং কিছু নির্দিষ্ট মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পান না।
পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম ও ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসে জন্মগ্রহণকারীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিক হন। তবে আমেরিকান সামোয়ায় জন্মগ্রহণকারীরা নাগরিক না হয়ে ‘নন-সিটিজেন ন্যাশনাল’ হিসেবে বিবেচিত হন। বিদেশি নাগরিকরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশটিতে ভ্রমণ করলে তাকে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বলা হয়। সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়ায় সে সাধারণত মার্কিন নাগরিকত্ব পায়, এটাই এই ব্যবস্থার প্রধান আকর্ষণ।
তবে পর্যটন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া নিজে অবৈধ নয়। সন্তান জন্ম দেওয়াই ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গোপন করে ভিসা নেওয়া বা ভিসার অপব্যবহার করা বেআইনি হতে পারে। বার্থ ট্যুরিজমের নির্ভুল সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কারণ কোনো নারী যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসেছেন কি না, জন্মনিবন্ধনের তথ্য থেকে তা নির্ধারণ করা কঠিন। সিডিসির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশি ঠিকানার মায়েদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে ৯ হাজার ৫০০টির কিছু বেশি শিশু জন্ম নেয়। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রে মোট জন্ম ছিল প্রায় ৩৭ লাখ। অর্থাৎ এই সংখ্যা মোট জন্মের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ।
তবে এটি বার্থ ট্যুরিজমের প্রকৃত সংখ্যা নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে আসা কেউ স্থানীয় কোনো ঠিকানা ব্যবহার করে জন্মনিবন্ধন করতে পারেন। মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে আনুমানিক ২০ হাজার থেকে ২৬ হাজার শিশু বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে জন্ম নেয়। অর্থাৎ মোট বার্ষিক জন্মের প্রায় শূন্য দশমিক ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। তবে গবেষকরা বলছেন, সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ কোনো নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন কি না, তা সরকারি তথ্য থেকে সব সময় বোঝা যায় না।
ট্রাম্পের প্রথম আদেশটি এমন কিছু শিশুর জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করছে, যাদের বাবা-মা দুজনই মার্কিন নাগরিক নন। এতে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য, বিদেশি সরকারের কর্মী, প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করা ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন ভূখণ্ডে বসবাসকারী ব্যক্তিদের সন্তানদের বিষয়ে নতুন বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় আদেশটি বার্থ ট্যুরিজম বন্ধে পররাষ্ট্র ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে আরও কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছে।
তবে এসব আদেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ১৪তম সংশোধনী জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ভিত্তি এবং সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের আগের আদেশকে বেআইনি ও সংবিধানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে রায় দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি দিয়েছিল, বার্থ ট্যুরিজম দেখিয়ে দেয় যে বর্তমান জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ব্যবস্থার অপব্যবহার হচ্ছে। তবে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এ যুক্তির জবাবে বলেন, পৃথিবী বদলালেও সংবিধান একই রয়েছে। বিশ্বে ৩০টির বেশি দেশ প্রায় অবাধে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেয়। এর মধ্যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোসহ লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ দেশ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এমন দুটি দেশ, যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন-অবস্থা বিবেচনা না করেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে সংশোধিত ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত অন্তত একজন বাবা-মা নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হলে শিশুর নাগরিকত্বের অধিকার তৈরি হয়।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য করুন