বাংলা সংবাদ ডেস্ক
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ডলারের বিকল্প খুঁজছে বিভিন্ন দেশ

বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর উপায় খুঁজছে। একই সঙ্গে মার্কিন ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে এমন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় দুই বছর পার হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা, পররাষ্ট্রনীতিতে নিষেধাজ্ঞার বাড়তি ব্যবহার এবং আইনগত সীমা অতিক্রমের অভিযোগ—এসব কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চীন বিভাগের সাবেক প্রধান এসওয়ার প্রসাদ বলেন, ‘ভূরাজনৈতিক কারণ এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ডলারকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি বিনিয়োগকারীরা ডলারভিত্তিক সম্পদ থেকে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।’ তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বৈশ্বিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। দেশটির শেয়ারবাজার ও আর্থিক খাতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোতে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে ডলারের বিকল্প হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের মতো কোনো মুদ্রা এখনও তৈরি হয়নি।

 

মঙ্গলবার কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের নিলাম সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে এবং বৈশ্বিক লেনদেনে ডলারের আধিপত্য অটুট রয়েছে। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছে, আর একজন নেতা প্রতিযোগিতাকে ভয় পায় না।’ তবে বন্ডবাজারে চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফা দাবি করায় ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার চলতি সপ্তাহে ৫ শতাংশের ওপরে উঠেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ।

 

একই সময়ে কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারী মার্কিন সম্পদে নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। বিশ্বের বৃহত্তম সার্বভৌম সম্পদ তহবিল নরওয়ের ওয়েলথ ফান্ড চলতি মাসে জানিয়েছে, তারা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ কমিয়ে আরও ভালো আয়ের সুযোগ খুঁজবে। ডলারের বৈশ্বিক অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ডলারে সম্পন্ন হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে ডলারের অংশীদারত্ব ধীরে ধীরে কমছে। ২০১৫ সালে যেখানে বৈশ্বিক রিজার্ভের ৬৪ শতাংশ ছিল ডলারে, ২০২৫ সালের শেষে তা নেমে এসেছে ৫৬ শতাংশে।

 

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ডলার ও নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাকে পররাষ্ট্রনীতির শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইরান ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এ ব্যবস্থারই অংশ। তবে নিষেধাজ্ঞার বাড়তি ব্যবহারের কারণে অনেক দেশ বিকল্প অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডিজিটাল মুদ্রা ও নতুন প্রযুক্তি ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করছে। চীন হংকং, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে নিয়ে ‘এমব্রিজ’ নামে একটি আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল মুদ্রা প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত ও কম খরচে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

অন্যদিকে রাশিয়া ও ভারত সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তির একটি ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছে। এর ফলে দুই দেশ পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে। ডলারের বিকল্প খোঁজার পাশাপাশি অনেক দেশ আবার স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভে সংরক্ষিত স্বর্ণের পরিমাণ বিদেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণকে ছাড়িয়ে যায়। একই বছর প্রথমবারের মতো প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার অতিক্রম করে।

 

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভল্ট থেকে নিজেদের স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। নেদারল্যান্ডস সম্প্রতি উত্তর আমেরিকায় সংরক্ষিত ৯৫ টন স্বর্ণের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নিয়েছে। একইভাবে চলতি বছরের মার্চে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ১২৯ টন স্বর্ণ প্যারিসে স্থানান্তর করে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্ব অর্থনীতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে ঋণ বৃদ্ধি, নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা অনেক দেশ, কোম্পানি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কতটা নির্ভরশীল থাকা উচিত। অলিভার ওয়াইম্যানের অংশীদার এবং মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ড্যানিয়েল ট্যানেনবাউম বলেন, ‘সরকার ও কোম্পানিগুলো এখন ভাবছে, যদি কোনো দিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে তার অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে, তাহলে কী ঘটতে পারে।’

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসায় লাগাম, মার্কিন নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানটি

বিজিবির অভিযানে মাদক-অস্ত্রসহ ৯১৩ কোটি টাকার পণ্য জব্দ, আটক ২৮১

ডেট্রয়েট থেকে আটলান্টিক সিটি, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃত উপস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ডলারের বিকল্প খুঁজছে বিভিন্ন দেশ

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র

গ্রিন কার্ড স্পনসরশিপে নতুন নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রে, যাচাই হবে স্পনসরের ক্রেডিট তথ্য

সৌদি আরবে ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ডাকযোগে ভোটের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের উদ্যোগে বাধা

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ভোটের অভিযোগে ৭ গ্রিন কার্ডধারী গ্রেপ্তার

ছয় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছাড়ার হার সর্বোচ্চ

১০

প্রথমবার প্রকাশ্যে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের স্বীকারোক্তি যুক্তরাষ্ট্রের

১১

নবীনদের বরণ, গ্র্যাজুয়েটদের বিদায়: ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বিজিএসএ’র যাত্রা শুরু

১২

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি সংকটে মার্কিন সামরিক বাহিনী

১৩

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৪ বছরের বেশি থাকতে না দেওয়ার নীতি স্থগিত

১৪

মিশিগানে বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভা ও এডভোকেট ই ইউ শহিদুল ইসলাম শাহিনকে সংবর্ধনা

১৫

১৬

গ্রিন কার্ডের পথে নতুন বাধা, ভিসা নম্বর ও পাবলিক চার্জে অনিশ্চয়তা

১৭

যুক্তরাষ্ট্রে কিছু অভিবাসীদের ফেডারেল মেডিকেইড হারানোর ঝুঁকিতে

১৮

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার পর কাজের অনুমতিতে লাগবে ১ লাখ ডলারের ফি

১৯

ডাবলিনে পর্তুগিজ বাংলাদেশি কমিউনিটি ইন আয়ারল্যান্ডের উদ্যোগে জমকালো মিলনমেলা 2026 অনুষ্ঠিত

২০