চাবুকের হিস হিস বনাম ফেড়ারেল আইন
ইশতিয়াক রুপু
২০১৬ সালের জানুয়ারী মাসের শেষ দিকে দেশে গেলাম বেড়াতে। ঢাকায় নেমে পরদিন বিমানে সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জ।দিন দশেক পর ফিরলাম ঢাকায়।সপ্তাহ খানেক থাকার কথা।দুদিন পরই জরুরী ভিত্তিত্তে ফিরতে হলো নিজ শহরে।
ফেরার পথে চড়লাম এনার বিলাসবহুল বাসে। সিট পড়লো একেবারে সামনে ড্রাইভারের পিছনে।জোড়া আসনে আমি ও আমার স্ত্রী। মহাখালী থেকে বাস ছাড়ার কিছুক্ষন পর বাসের ভিতর সামনের দিকে এক যুবক দাড়ালেন। পরনে ধবধবে সাদা সার্টের সংগে কালো প্যান্ট। পায়ে চকচকে কালো সু।গলায় সুদৃশ্য একটি টাই।ছোট একটি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলতে শুরু করলেন। সম্মানিত সকল যাত্রীবৃন্দকে জানাই গুড মর্নিং। মুসলমান ভাইদের সালাম আর হিন্দু ভাইদের নমস্কার। স্বাগত জানাই এনা পরিবহনের এই বিলাসবহুল কোচে। আমাদের গন্তব্য শাহজালালের পূন্যভূমি দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ সিলেট নগরী। পথে কোনরুপ বাঁধা বিপত্তি না থাকলে ইনশাল্লাহ আমরা নিরাপদে যথাসময়ে সিলেট নগরীতে গিয়ে পৌছব। আজকের এই যাত্রা পথে চালকের আসনে আছেন বিদেশ থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত চালক জনার মিম্বর আলী। তাকে সহায়তা করবেন সহকারী ফুল মিয়া।
সম্মানিত যাত্রীবৃন্দের সব ধরনের সেবায় আছি, আমি কচি মজুমদার। আপনাদের যে কোন প্রয়োজনে আসন থেকে আওয়াজ দিবেন আমি এক সেকেন্ড বিলম্ব না করে আপনাদের নিকট পৌছে যাবো। বলেই যাত্রীদের একটি ফ্রেশ ব্রান্ডের পানির বোতল এবং সাথে ছোট একটি কেক যাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। সবাইকে পানির বোতল আর কেক দিয়ে ঘোষনা দিলেম আসন থেকে আওয়াজ দিবেন এক সেকেন্ড বিলম্ব না করে আপনাদের নিকট পৌছে যাবো। বলেই যাত্রীদের একটি ফ্রেশ ব্রান্ডের পানির বোতল এবং সাথে ছোট একটি কেক যাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দিলেন।
সবাইকে পানির বোতল আর কেক দিয়ে আবারো সবার মুখামুখি দাড়ালেন কচি মজুমদার। আগের মত টাইটি টেনে ঠিক করে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে প্রথমে বলতে শুরু করলেন ইংরেজীতে। পূর্বে বাংলায় যা বলেছিলেন তার সার সংক্ষেপ।কার জন্য বললেন তা বুঝা গেলো না।কেননা পুরো বাসে তো কোন সাদা ইংরেজ নেই। তবে ভুল ভাঙ্গলো বিরতিতে এসে। পুরো বাসে মাত্র একজন চীনা যাত্রী। যে কিনা কন্ডাক্টরের সংগে কখা বলেছে ফোনের সাহায়্যে একজন দোভাষীর মাধ্যমে। মনে হলো কচি সাহেব সেই চীনা যাত্রীর জন্য ইংরেজী ভাষায় পাঁকামো করলেন।
ঘোষনা শেষ করে পুরো বত্রিশ দাঁত খুলে হেসে হেসে যোগ করলেন সম্মানিত যাত্রীদের মনোরঞ্জনের জন্য আছে ইউ টিউবের সাহায্যে নাটক ও গান শুনবার ব্যবস্থা। আর টিক তখনই শুনলাম পাশের সিটের একজনের আওয়াজ। নাউজবিল্লাহ। হঠাৎ স্যার আওয়াজ শুনে চোখ ফেরালাম। দেখি পাশে সহাস্য সেই কন্ডাক্টর। হাতে দুটো পানির বোতল সাথে দু টুকরো কেইক। আমাদের দিকে সবকিছু বাড়িয়ে দিয়ে বলছে,স্যার এগুলি আপনার ও ম্যাডামের জন্য একস্ট্রা। রেখে দিন স্যার। ক্ষিদা লাগলে খেয়ে নিবেন।বললাম, না না এতো খাবার আর পানি লাগবে না। ছেলেটি জোর করে সামনের ব্যাগে রেখে দিলো।
হঠাৎ চালকের সামনের আয়নায় চোখ পড়লো। দেখি বাসের ড্রাইভার আমাদের দিকে তাকিয়ে এসব দেখে হাসছে। আরে কি বিপদজনক। ড্রাইভারের চোঁখ থাকবে সামনের রাস্থার দিকে, আর সে কিনা বার বার তার উপরের গ্লাসে আমাদের দেখছে। কিন্তু কেনো? সেই কেনোর উত্তর পেলাম ভৈরবে যাত্রাবিরতিতে এসে।
বাস বিরতিতে এক রেষ্টুরেন্টের সামনে থামলে পরে , নামতে যাবো।দেখি বাসের কন্ডাক্টর কচি সাহের দুই হাতে পিছনের সব যাত্রীদের পথ আগলে দাড়িয়ে আছেন। আর আমাদের তাগাদা দিয়ে বলছেন। স্যার আপনারা আগে নামুন । বাকি যাত্রীরা বিরক্ত না হলেও দেখি বেশ আগ্রহ নিয়ে কচির এইসব পাঁকামো দেখছেন। বাস থেকে নামিয়ে একপ্রকার জোর করে রেস্টুরেন্টের ভিতরে নিয়ে গেলো। বয়দের ডাকাডকি করে চা সাথে হাল্কা খাবার খাইয়ে সাথে সাথে এসে বাসে তুলে দিলেন। পড়ে গেলাম ভাবনায়। ছেলেটি এসব কি করছে? আর কেনই করছে?
উত্তরটি সক্ষিপ্ত করেই বলি।
বাস বিরতিতে এক রেষ্টুরেন্টের সামনে থামলে পরে , নামতে যাবো। তখন দেখি বাসের কন্ডাক্টর কচি সাহের দুই হাতে পিছনের সব যাত্রীদের পথ আগলে দাড়িয়ে আছেন। আর আমাদের তাগাদা দিয়ে বলছেন। স্যার আপনারা আগে নামুন । বাকি যাত্রীরা বিরক্ত না হলেও দেখি বেশ আগ্রহ নিয়ে কচির এইসব পাঁকামো দেখছেন।
উত্তরটি সক্ষিপ্ত করেই বলি। আমাদের কচি, ইউটিউবে আমার রচিত গানে দেশের নামকরা শিল্পীদের গান শুনতে গিয়ে সাথে আমাকে ও অনেক বার দেখেছে। আর তাই আজ হঠাৎ করে আমাকে বাসে পেয়ে এইসব বাড়াবাড়ী রকমের আদর আর আপ্যায়ন!সব শেষ হলো যখন সে জানতে চাইলো আমাক পরের সিড়ি কবে বের হবে। মজার বিষয় হলো আমাকে কিন্তু প্রথমে আবিস্কার করেন বাসের চালক তথা বিদেশে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত ড্রাইভার মিন্বর আলী।
তেমনি গত সপ্তাহে আমি পেয়ে গেলাম আরেক বাসের মহিলা চালক কে। ম্যারিল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক ফেরত আসার পথে। আমেরিকার বিখ্যাত গ্রেহাউন্ড কোম্পানীর বিশ হাজার বাসের একটিতে চড়েছি নিউইয়র্ক আসবো বলো। যথারীতি স্ত্রী আছেন সাথে। পেয়ে গেলাম আরেক বাসের মহিলা চালক কে। ম্যারিল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক ফেরত আসার পথে। আমেরিকার বিখ্যাত গ্রেহাউন্ড কোম্পানীর বিশ হাজার বাসের একটিতে চড়েছি নিউইয়র্ক আসবো বলো।৫২,সিটের বাসের একজন চালকই সব কিছু। ভ্রমনে নেই দ্বিতীয় কাউকে। কোন হেলপার না কন্ডাক্টর।তিনি সবকিছু। চালকের সহকারী থেকে শুরু করে ঘোষনাকারীর সব কাজ বাস চালক মহিলা নিজে করে চলছেন।
বাসে উঠার আগে টিকেট চেক করলেন। যাত্রীদের মালামাল নিজেই নিচে রাখলেন। সব করলেন নিজের হাতে। চালকের আসনে বসে ছোট্ট একটি ঘোষনা দিলেন। বলে গেলেন যাত্রী হিসাবে বাসের ভিতর কি করা যাবে আর কি করা যাবে মা। সবশেষে বললেন, বাসের ভিতরে সকল কার্য়ক্রম দেশের শক্তিশালী আইন ফেড়ারেল আইন মোতাবেক চলবে।
ফেড়ারেল আইন মানেই বড্ড শক্ত আইনে। শুধু একবার কেউ যদি ঐ আইনে পড়েন তখন বুঝবেন। কতো ধানে কতো চাল।মজার বিষয় এসব শক্ত শক্ত আইন কানুন শুধু ভালোবাসার নগরী নিউইয়র্কে নয়। দেশের সর্বত্র এই আইন খুউব কড়া এবং কার্যকর। মহিলা চালক খুউব গম্ভীর হয়ে সহজ ভাষাতে সাধারন সম্বোধনে যা বলে গেলেন। বাসের ৫২ জন যাত্রী বিনা বাক্যব্যয়ে সব নিয়ম কানুন পুরো যাত্রাকালীন সময়ে মেনে চললেন। কারন চালক একটি শব্দ বেশ কয়েক বারই জোরের সাথে উচ্চারন করলেন। তা হলো ফেড়ারেল আইন। কোন আওয়াজ নেই কোন চিৎকার চেচামেচি। কোন ভিড়িও চললো না। কেউ পানির বোতল আর কেইক নিয়ে এসে জোরাজুরি করলো না। পুরো পথটাই ছিলো শুনশান নিরবতা। ভালবাসার নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনে কোন্পানীর নিজস্ব টার্মিনাল এসে বাস থেকে নামতে নামতে একটি গল্প মনে পড়লো।
পুরো ভারত তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। লর্ড কর্ণওয়ালিশ অবকাশ যাপনে গেলেন যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে।স্কটিশ এক সেনাপতির সাথে ঘোড়ায় চড়ে বেড়িয়েছেন বৈকালিক ভ্রমনে। দুর্গের বাইরে একজন মেষ পালক ঘোড়ায় চড়ে বিশেষ ধরনের চাবুক নিয়ে মেষ চরাচ্ছেন। সেই চাবুকে হিস হিস করে একধরনের ভয় ধরানো আওয়াজ বেরুতো। যা শুনে মেষশাবকরা ভয় পেতো।
স্কটিশ সেনাপতি কৌতুহল বশত: লর্ডকে জিজ্ঞেস করলেন, মাত্র শদুয়েক ব্রিটিশ কিভাবে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে শাষন করছে।লর্ড কর্নওয়ালিশ সেই মেষ পালকের হাতের বিশেষ শব্দআলা চাবুকের দিকে নির্দেশ করে বললেন। প্রায় তিনশত মেষ শাবক কে যদি একজন মেষপালক তার হাতের চাবুকের বিশেষ আওয়াজ দিয়ে পালন করতে পারে। তাহলে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় কে বিশেষ আইন দিয়ে বশে রাখা কোন বিষয় নাকি হে সেনাপতি ?
সেই পরাধীন ভারতীয়ের একজন উত্তরসূরী হয়ে আমার মনে নতুন এক ভাবনা আসল তাহলে ভালোবাসার নিউইয়র্ক সহ গোটা আমেরিকাতে ফেডারেল আইনের মত বিশেষ আইন কি ঐ বিশেষ আওয়াজ সম্বলিত চাবুকের হিস হিস আওয়াজের মতো শুনায়। না অন্য কোন কারনে পুরো বাস থাকে নিরব আর নিস্তব্ধ।
মন্তব্য করুন