বাংলা সংবাদ ডেস্ক
২০ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪০ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ছাড়াল ৪০ লাখ কোটি ডলার, বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকটের শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন (৪০ লাখ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে ব্যয় যেভাবে হু হু করে বাড়ছে, সে তুলনায় করছাড়ের কারণে রাজস্ব আদায় অনেক কম হচ্ছে। ফলে এক বড় ধরনের আর্থিক সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ দৈনিক নগদ অর্থ ও ঋণস্থিতি বিবরণী অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক শূন্য ৪৭ ট্রিলিয়ন (৪০ লাখ ৪ হাজার ৭০০ কোটি) ডলার। এর মধ্যে জনগণের কাছে থাকা ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ৩২ দশমিক ২৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ঋণ ৭ দশমিক ৭৮২ ট্রিলিয়ন ডলার। মাত্র এক দশকের কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশটির সরকারি ঋণ ছিল ১৯ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার।

 

সরকারি ঋণ বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে ট্রাম্প ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা সামলাতে সরকারের নেওয়া জরুরি ঋণ কর্মসূচির কারণে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ ঋণের জন্য দায়ী এ দুই প্রেসিডেন্টের নেওয়া আর্থিক নীতি এবং দীর্ঘদিনের কর ও ব্যয়ের মধ্যকার কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা। বাজেট পর্যবেক্ষণকারী গোষ্ঠীগুলো বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়ানোর আশঙ্কা করছিল। তারা সতর্ক করে বলেছে, আইনপ্রণেতারা যদি এখনই এ বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর ব্যবস্থা না নেন, তবে দেশটিতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট নেমে আসবে।

 

নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থা কমিটি ফর এ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিস বলেছেন, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ শুধু সরকারের খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে টের পাওয়া যায় এবং ঘুরেফিরে কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষের পকেটেই টান পড়ে।

 

ম্যাকগিনিস বলেন, সরকার যত বেশি ঋণ নেবে, মূল্যস্ফীতির চাপ তত বাড়বে, বাজেটের অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হবে এবং দেশের ভেতরের জরুরি পরিস্থিতি বা বিদেশে অস্থিরতার সময় যুক্তরাষ্ট্র আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ম্যাকগিনিস আরও বলেন, ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। অথচ ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর মাত্র পাঁচ মাসের কম সময়ের মধ্যে এটি ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘর ছুঁয়েছে। গত ২০ বছরের কম সময়ে দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪ গুণ বেড়েছে।

 

ট্রাম্প-বাইডেনের আমলে ঋণ বেড়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের সময়কার বিভিন্ন নীতির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের আয়ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা দায়ী। এর মধ্যে করোনাভাইরাস মহামারির সময় সরকারের বিপুল ব্যয়ও বড় ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বেড়েছে ৭ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এর অর্ধেকের বেশি বেড়েছিল তাঁর মেয়াদের শেষ ৯ মাসে, মহামারি মোকাবিলায় সরকারি ব্যয়ের কারণে।

 

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আরও ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ বেড়েছে; অর্থাৎ দুই মেয়াদ মিলিয়ে তাঁর সময়ে এখন পর্যন্ত সরকারি ঋণ বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বেড়েছিল ৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। তাঁর সময়েও করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং অন্যান্য সরকারি কর্মসূচিতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

 

সুদ পরিশোধে বাড়ছে ব্যয়

যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এর প্রায় ৬০ শতাংশ যায় বাধ্যতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা, বয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবা, নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এবং সাবেক সেনাসদস্যদের চিকিৎসা। এ ছাড়া প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে। ঋণের পরিমাণ ও সুদের হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যয়ও বাড়ছে।

 

২০২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ছাড়িয়ে যায়। চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সুদ পরিশোধের ব্যয় স্বাস্থ্যসেবা খাতের বড় কর্মসূচি মেডিকেয়ারে ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পর এটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাত।

 

বাজেট–ঘাটতিও বাড়ছে

গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ছিল ৪৩২ বিলিয়ন ডলার। দেশটির ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় বাজেট ঘাটতি। শুল্ক থেকে পাওয়া আয় কমে যাওয়া এবং বয়স্কদের সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট–ঘাটতি পুরো ২০২৫ অর্থবছরের ঘাটতিকে ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছর শেষ হতে এখনো দুই মাস বাকি।

 

যুক্তরাষ্ট্রের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অবসর ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ও সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জন্ম নেওয়া বড় প্রজন্মটি অবসর নেওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ারের মতো কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু বেতন ও আয়কর থেকে সরকারের যে রাজস্ব আসে, তা এসব ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

 

সূত্র: রয়টার্স

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে বিবিসিসিআইয়ের মতবিনিময় সভা

১

বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতিতে ৭০ হাজার ডলারের ফি প্রস্তাব ট্রাম্পের

২

ব্রাডফোর্ডে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের নির্বাচনী প্রচারে গুলজার-কুদ্দুস-মনির প্যানেল

৩

বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতির নতুন কমিটি গঠনের দায়িত্ব আহ্বায়ক কমিটির

৪

আমেরিকান নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ, ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের

৫

সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ট্রাম্পের অনুমোদন

৬

বাংলাদেশিদের মার্কিন ভিজিট ভিসায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার বন্ড

৭

দুই দিনব্যাপী দুর্গোৎসবে সাজবে টাইমস স্কয়ার, আয়োজন ১০ ও ১১ অক্টোবর

৮

বিদেশি কর্মীদের জন্য বড় স্বস্তি, এইচ-১বি ভিসার ১ লাখ ডলারের ফি স্থগিত

৯

মার্কিন প্রবেশপথে বদল আসছে, পাসপোর্ট স্ট্যাম্পের বদলে গুরুত্ব পাবে I-94

১০

৩০ ডলারে কেনা চিত্রকর্ম বিক্রি হলো সাড়ে ১৩ লাখ ডলারে

১১

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে বৈধ অভিবাসন কমেছে ৯৬ শতাংশ

১২

কর রিটার্নে নাগরিকত্বের তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের

১৩

২ কোটির বেশি প্রবীণের জন্য এককালীন ৯০ ডলারের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৪

জ্যাকসন হাইটসে প্রকাশ্যেই ভুয়া পাসপোর্ট ও গ্রিন কার্ড বিক্রি

১৫

সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষণে নতুন ব্যাচ নিচ্ছে USA Consulting Tech

১৬

আমেরিকান পাসপোর্টে বৈপ্লবিক পরিবর্তন: অনলাইনেই আবেদন, ছবি তোলা যাবে মোবাইলে

১৭

সেন্টার ফর এনআরবির উদ্যোগে ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা সভা

১৮

ইতিহাস গড়ল স্টারশিপ প্রথম কক্ষপথে পৌঁছে ২৬টি স্যাটেলাইট স্থাপন

১৯

সৌদিতে বাংলাদেশি জনশক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির

২০