প্রতারণা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে সংঘটিত অপরাধের তথ্য প্রকাশ না করার অভিযোগে ৪০ জনের মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিল চেয়ে মামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট। সোমবার, ৫ অক্টোবর এক ঘোষণায় বিভাগটি জানায়, দেশটির বিভিন্ন ফেডারেল জেলা আদালতে এসব মামলা করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে একসঙ্গে এতসংখ্যক নাগরিকত্ব বাতিলের মামলা করার ঘটনা এটিই সর্বোচ্চ বলে দাবি করেছে জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট।
মামলাগুলো ন্যাচারালাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি, যৌন নির্যাতন, অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিও রয়েছেন। আবার কারও বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, বিয়েসংক্রান্ত প্রতারণা কিংবা আগের বহিষ্কারাদেশ গোপন করে অভিবাসন সুবিধা ও নাগরিকত্ব নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে মামলা দায়ের হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব ইতিমধ্যে বাতিল হয়ে গেছে, এমন নয়। জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট আদালতের কাছে নাগরিকত্ব ও ন্যাচারালাইজেশন সনদ বাতিলের আদেশ চেয়েছে। ফলে এসব আবেদনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতেই হবে।
জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে নাগরিকত্ব অর্জন অথবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন কিংবা ভুলভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব নেওয়া হলে তা বাতিলের সুযোগ রয়েছে। সরকারের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিয়ম ছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এই উদ্যোগকে আধুনিক ইতিহাসের বৃহত্তম নাগরিকত্ব বাতিলের পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসুরক্ষার স্বার্থে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান। জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের সিভিল ডিভিশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রেট শুমেটও নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
মামলাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি চীনে জন্ম নেওয়া সাবেক নৌসেনা জিনচাও ওয়েইয়ের বিরুদ্ধে। জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি চীনের কাছে সামরিক গোপন তথ্য বিক্রির ষড়যন্ত্রে যুক্ত হন। ওই বছরের মে মাসে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব পান। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে ওয়েই গুপ্তচরবৃত্তিসহ একাধিক অপরাধে দণ্ডিত হন এবং তাঁকে ২০০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় তাঁর অপরাধের তথ্য গোপন এবং সামরিক চাকরির সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ না করার অভিযোগে নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করা হয়েছে।
চীনের হয়ে কাজ করার ঘটনায় দণ্ডিত পিং লির বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট বলেছে, তিনি চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ভিন্নমতাবলম্বী, গণতন্ত্রপন্থী ব্যক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন। কর্মস্থল থেকে পাওয়া সংবেদনশীল তথ্যও তিনি সরবরাহ করেছিলেন। ২০২৪ সালে প্রয়োজনীয় পূর্বঘোষণা ছাড়া চীনের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অপরাধ স্বীকার করেন তিনি। নিউইয়র্কের ভ্যালি স্ট্রিমের বাসিন্দা আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়া ভারিস জান সাফির বিরুদ্ধেও নাগরিকত্ব বাতিলের মামলা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে করা অভিযোগে বলা হয়, তিনি ১৯৯৫ সালে তারিক মেহমুদ নামে জাল পাকিস্তানি পাসপোর্ট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়।
সরকারের অভিযোগ, বহিষ্কারের আদেশের পরও তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়েননি এবং নতুন পরিচয় ব্যবহার করেন। পরে এক মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করে অভিবাসন সুবিধা নেন। নাগরিকত্বের সাক্ষাৎকারে আগের পরিচয় ও অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য গোপন করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আহমাদ বাহার খাট্টাক ও সৈয়দ মাশহুদ উল হকের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলায় একাধিক পরিচয় ব্যবহার এবং আগের বহিষ্কারাদেশ গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। আহমেদ খান ও সৈয়দ ফুরকান আলীর বিরুদ্ধে বিয়েসংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। সরকারের দাবি, আগের বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় ভুয়া তথ্য বা নথির মাধ্যমে নতুন বিয়ের ভিত্তিতে তাঁরা অভিবাসন সুবিধা নিয়েছিলেন।
ভারতে জন্ম নেওয়া বলবিন্দর সিংয়ের বিরুদ্ধে দুই পরিচয়ে অভিবাসন আবেদন করার অভিযোগ রয়েছে। সরকারের ভাষ্য, দ্বিতীয় পরিচয়ের মাধ্যমে তিনি স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা এবং পরে নাগরিকত্ব লাভ করেন। নেপালে জন্ম নেওয়া দিব্যা ভট্টরাইয়ের বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে শুরু হওয়া অভিবাসন নথিসংক্রান্ত প্রতারণার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার তথ্য গোপনের অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ওই অপরাধে তিনি দোষ স্বীকার করেন। জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কয়েকটি মামলার ভিত্তি নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে সংঘটিত শিশু যৌন নির্যাতনের অপরাধ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর এসব অপরাধে দণ্ডিত হন। সরকারের অভিযোগ, নাগরিকত্বের আবেদন ও সাক্ষাৎকারের সময় অপরাধের তথ্য গোপন করায় তাঁরা নাগরিকত্বের জন্য প্রয়োজনীয় নৈতিক চরিত্রের শর্ত পূরণ করতে পারেননি।
অর্থনৈতিক অপরাধের অভিযোগও রয়েছে মামলাগুলোর মধ্যে। কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া ইউসমারি শার্লি দুরান মেহিয়ার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ইরানে জন্ম নেওয়া রালফ নাবাভির বিরুদ্ধে কর ফাঁকির তথ্য এবং কানাডায় জন্ম নেওয়া অ্যান্ড্রু কোল্ডিকাটের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারসংক্রান্ত প্রতারণার তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অপরাধে তাঁদের দণ্ডিত হওয়ার তথ্যও জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাগুলো ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মোট ১৯টি ফেডারেল বিচারিক জেলায় করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন