রবীন্দ্রসাহিত্যের গবেষণার জন্য অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ এবং রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় শিল্পী বুলবুল ইসলাম চলতি বছর বাংলা একাডেমির ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ পেয়েছেন। গত ১১ মে সোমবার বিকালে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক ও মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এদিন সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে বাংলা একাডেমি।
রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ এর বাড়ী শ্রীমঙ্গল এবং শ্রীমঙ্গল কলেজে পড়ার সুবাদে তিনি আমার বাংলার শিক্ষক ছিলেন। তার এই প্রাপ্তি আমাকে আনন্দিত এবং আপ্লুত করেছে। তাই তাকে নিয়ে দুই লাইন লিখতে মন চাইছে। কলেজের প্রথম দিনের বাংলার ক্লাসে প্রায় আড়াইশ ছাত্র। বড় অডিটোরিয়াম। ধারণা ছিল স্যার খুব গম্ভীর, কড়া, রাশভারী টাইপের হবেন। স্যার এলেন। দেখলাম খুব সাধারণ, কিন্তু কথাবার্তা, উচ্চারণ অসাধারণ। মনে হলো যেন অনেক দিনের চেনা। সহজেই সবার সাথে মিশে গেলেন। তিনি পড়াতে শুরু করলেন শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাস থেকে। শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে কয়েক মূহূর্ত আনমনা হয়ে গেলেন। মনে হলো তিনি যেন সাক্ষাত শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রের নদীর তীরে রাতের রোমাঞ্চকর নৌকা ভ্রমণের বর্ণনা দিচ্ছেন। এত বড় হলে পিন পতন নীরবতা। পরবর্তী সময়ে স্যারের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক হয়। আমার বাবা ভাল বক্তা ছিলেন তাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে ডাক পড়তো, সেখানে স্যারের সাথে উনার দেখা হতো, কথা হতো। আসা যাওয়া ছিলো।
তাছাড়া সাংবাদিকতা করার সুবাদে ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহরম আলী, গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী জ্যোৎস্না গোস্বামীসহ স্যারদের সাথে প্রায়ই দেখা হতো কথা হতো। কথা হতো শ্রীমঙ্গলের সমস্যা, সম্ভাবনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি নিয়ে। মিশিগান আসার পর কয়েকজন মিলে এখান থেকে ‘সাঁকো’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করতাম, প্রতিটি সংখ্যায় তার একটি লেখা দেয়ার চেষ্টা করতাম। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি আমাদের জন্য লেখা পাঠাতেন। তখন ইমেল ছিল না, ডাকে বা কারো মাধ্যমে তার লেখাগুলো আমরা পেতাম। তার জীবনযাপন খুবই সাধারণ। তবে সব সময় মাটি ও মানুষের সাথে তার যোগাযোগ ছিল এবং আছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে দিতেন। শ্রেণী প্রথা, বিভাজন, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ ১৯৪৯ সালের ৬ নভেম্বর তৎকালীন সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল থানার গন্ধর্বপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা দেবেন্দ্রনাথ দাশ, মা লাবণ্য দাশ। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ এমএ পাস করেন। তিনি বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। বাংলা সাহিত্যে তাঁর শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে ১৯৭৫ সালে প্রভাষক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন এই লেখক। এরপর বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা শেষে ঝিনাইদহের কেশবচন্দ্র কলেজ থেকে ২০০৬ সালে প্রফেসর হিসেবে অবসরে যান।
তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: রম্যাণি রুচিরা (১৯৭০ – প্রথম কাব্যগ্রন্থ), অনীহার অন্ধকারে আমি, বৈশালীর প্রতি সনেটগুচ্ছ, এই নশ্বরতা চাই, ফেসবুকে আমার রুবাইগুলি, কবিতা সমগ্র (১ম ও ২য় খণ্ড), এই ইলিশের দেশ, দাঁড়াও দুঃখ (কাব্যনাটক)। তার প্রকাশিত উপন্যাস: গার্গী, হাসন রাজা : রঙের বারই, হেমন্তবালার রবীন্দ্রনাথ। তার প্রকাশিত প্রবন্ধ ও গবেষণা: শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ, সিলেটে নজরুল, হাসন রাজা শব্দ নৈঃশব্দ্য, বোবা বেহাগ, প্রাপক সিলেটিরা, ভেঙে যাই তাবৎ ঘরানা, অরবিন্দ দি গ্রেট (আধ্যাত্মিক অগ্নি পুরুষ), রাধারমণ তাঁর শাক্তপদাবলী, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ।
তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য বইয়ের মধ্যে ‘রবীন্দ্রপত্র’, ‘দেখা অদেখা’ এবং ‘আমার নিজস্ব তর্জা’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সংবাদ মাধ্যমকে কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ বলেন, “আমার রবীন্দ্রমগ্নতা আশৈশবের। কোনো প্রাপ্তি বা সম্মানের জন্য এ কাজে আমি জীবন ব্যয় করিনি। বাংলা একাডেমির পুরস্কারকে আমি উপরি পাওনা হিসেবেই বিবেচনা করি। মফস্বলে থেকেও যে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করা যায়, সেটার এক অগ্নিপরীক্ষায় আমি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলাম। বাংলা একাডেমির এই স্বীকৃতি আমাকে আরও বেশি কাজ করার অনুপ্রেরণা ও দায়িত্ববোধ এনে দিয়েছে।”
মন্তব্য করুন