প্রতি বছরের অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে পালিত হয় কলম্বাস দিবস। ২০২৬ সালে দিনটি পড়েছে ১২ অক্টোবর। সরকারি ছুটির তালিকায় এটি একটি পরিচিত নাম; অনেক ইতালীয়-আমেরিকানের কাছে দিনটি তাঁদের ঐতিহ্য ও সামাজিক স্বীকৃতির প্রতীক। অথচ একই দিন আমেরিকার বহু আদিবাসীর মনে করিয়ে দেয় ভূমি হারানো, নিপীড়ন ও দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কথা। একটি দিন কীভাবে দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার বাহক হয়ে উঠল, তা বুঝতে হলে উৎসবের গল্পের পাশাপাশি প্রশ্ন তোলা মানুষের কথাও শুনতে হবে।
১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে কলম্বাস বাহামা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। ইউরোপ ও আমেরিকার ইতিহাসে তাঁর এই যাত্রা গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে দুই মহাদেশের মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল বাড়ে। কিন্তু স্কুলের পাঠ্যবইয়ে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ‘কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন’ কথাটি ইতিহাসের পূর্ণ বিবরণ নয়। তাঁর আগমনের সময় ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ সমগ্র আমেরিকায় অসংখ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিজেদের সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করছিল। ইউরোপীয়দের কাছে কোনো ভূখণ্ড নতুন হতে পারে; সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে সেটি ছিল বহু প্রজন্মের ঘর।
কলম্বাস দিবসের প্রতিষ্ঠার পেছনেও রয়েছে আরেকটি ইতিহাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইতালীয় অভিবাসীদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সহজে আসেনি। তাঁরা বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। ১৮৯১ সালে নিউ অরলিন্সে ইতালীয় বংশোদ্ভূত ১১ জনকে জনতা হত্যা করে। এর পরের বছর কলম্বাসের যাত্রার চারশ বছর পূর্তিতে প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হ্যারিসন দেশজুড়ে স্মরণ অনুষ্ঠানের আহ্বান জানান। সময়ের সঙ্গে কলম্বাস ইতালীয়-আমেরিকানদের কাছে এমন এক প্রতীকে পরিণত হন, যার মাধ্যমে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ইতিহাসে নিজেদের স্থান দাবি করতে পেরেছিলেন। তাঁদের কাছে দিনটির গুরুত্ব তাই শুধু একজন নাবিককে ঘিরে নয়; নিজেদের পরিচয় ও মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত।

সরকারি স্বীকৃতিও এসেছে ধাপে ধাপে। ১৯৩০-এর দশকে কলম্বাস দিবস জাতীয় পর্যায়ে পালনের উদ্যোগ জোরদার হয়। ১৯৩৭ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ১২ অক্টোবর দিনটি পালনের ঘোষণা দেন। পরে ১৯৭১ সাল থেকে অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবার এটি ফেডারেল ছুটি হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই দীর্ঘ পথচলা দেখায়, কোনো স্মরণ দিবসের অর্থ কেবল অতীতের ঘটনা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও তাকে নতুন অর্থ দেয়।
সেই নতুন অর্থই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। আদিবাসীদের দৃষ্টিতে কলম্বাসের যাত্রাকে শুধু সাহসী অভিযান হিসেবে উদযাপন করা হলে এর পরের পরিণতি আড়ালে থেকে যায়। ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের সঙ্গে যুদ্ধ, দাসত্ব, জোরপূর্বক স্থানান্তর, ভূমি দখল ও রোগের বিস্তার আমেরিকার বহু আদিবাসী সমাজকে বিপর্যস্ত করেছে। কলম্বাসের পর কয়েক শতাব্দীর সব অন্যায়ের দায় এক ব্যক্তির ওপর চাপানো ইতিহাসচর্চা নয়। কিন্তু তাঁর আগমনকে এই দীর্ঘ পরিবর্তনের সূচনালগ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাও যথার্থ নয়। ইতিহাসের প্রতি সততা চাইলে যাত্রার সাহস এবং সেই যাত্রার পর মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়- দুটিই বলতে হবে।
এ কারণেই ‘আদিবাসী দিবস’ বা Indigenous Peoples’ Day পালনের দাবি গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৯২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে শহর কলম্বাস দিবসের নাম পরিবর্তন করে আদিবাসী দিবস রাখে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বিভিন্ন স্থানে দিনটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু অতীতের ক্ষতি স্মরণ করা নয়; আজও টিকে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, অবদান ও অধিকারকে দৃশ্যমান করা। আদিবাসীরা ইতিহাসের বিলুপ্ত কোনো অধ্যায় নন- তাঁরা বর্তমান আমেরিকার অংশ।
এই বিতর্ককে দুই সম্প্রদায়ের স্মৃতির মধ্যে প্রতিযোগিতা বানালে সমাধান কঠিন হয়। ইতালীয়-আমেরিকানদের প্রতি বৈষম্য ছিল বাস্তব; আদিবাসীদের ওপর ঔপনিবেশিক অন্যায়ও বাস্তব। একটি সত্যকে সম্মান জানাতে অন্য সত্যটি মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত: জাতীয় উৎসব, স্মৃতিস্তম্ভ ও পাঠ্যবইয়ে কীভাবে উভয় ইতিহাসের জন্য জায়গা তৈরি করা যায়?
কলম্বাস দিবস তাই ক্যালেন্ডারের একটি ছুটির চেয়ে বড় বিষয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের অভিযানের বিবরণ নয়; যাঁদের জীবন সেই অভিযানে বদলে গেছে, তাঁদের সাক্ষ্যও ইতিহাস। ১২ অক্টোবরকে অর্থবহ করতে হলে উদযাপনের পাশাপাশি আত্মসমালোচনার সাহস প্রয়োজন। তখন দিনটি বিভেদের কারণ হয়ে আটকে না থেকে সত্য, মর্যাদা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার আলোচনার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন