জেইন-লাস্কি পার্কের বর্তমান চোখজুড়ানো মনোরম দৃশ্য এই কয়েক বছর আগেও ছিলোনা। জরাজীর্ণ, অপরিচ্ছন্নতায় অনেকটা অন্ধকারে ছিল এই মাঠ। আমেরিকান ব্যবসায়ী এবং ক্রীড়া সংগঠক রাল্ফ কুকারলি উইলসন জুনিয়রের নামে প্রতিষ্ঠিত রাল্ফ কুকারলি উইলসন জুনিয়র ফাউন্ডেশন নজর দেয় মাঠটিতে। সময়ের প্রেক্ষাপটে এখন এই মাঠ আলোয় এসেছে। বদলে দিয়েছে কনান্ট এবং ইস্ট ডেভিসন এলাকাসহ আশপাশের সমগ্র এলাকাকে। সিটি অব ডেট্রয়েটের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জেইন-লাস্কি পার্কটি সকলের জন্য সকাল ৬টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে।
বৃক্ষশোভিত এই মাঠে লোকজন ছুটে আসে সকাল-বিকাল। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর সহজ লোকেশনের জন্য সকলের নিকট প্রিয় হয়ে উঠেছে। আরাম-আয়েশ খুঁজতে নানা শ্রেণি-পেশার লোকজন এখানে আসেন। বাঙালি-ইন্ডিয়ান-আফগান লোকজনের বিভিন্ন স্মৃতি তৈরি করছে জেইন-লাস্কি পার্ক। বাঙালিদের নিকট পার্কটি জেইন ফিল্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বাংলাটাউন সাইন
মিশিগানে বাংলায় লেখা ‘ধন্যবাদ’ শব্দটিও অনেক বিদেশির নিকট কৌতূহল তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্য হতে কেউ মিশিগানে বেড়াতে এলে বাংলা টাউন সাইনটির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেন। জেইন-লাস্কি পার্কটিও এক নজরে দেখে যান। দিনে দিনে এই সাইন অজস্র স্মৃতি তৈরি করছে।
গাছ ফুল পাথর ঘেরা মনোরম পরিবেশ
কেউবা দোলনায় বসে দুলছেন, কেউবা বেঞ্চে বসে সুখ-দুঃখের গল্প করছেন এমনি সব বিষয়ে ভরপুর জেইন-লাস্কি পার্ক। একটু পরপর গাছের সারি কিংবা রাখা রয়েছে ছোট বড় পাথর, কোথাও বিশ্রামের জন্য রাখা বেঞ্চ – এ এক অনবদ্য মনোরম পরিবেশ। একবার ঘুরতে এসে জায়গাটির প্রেমে পড়ে যান লোকজন এবং দূরের এলাকা থেকেও বারবার ছুটে আসেন। বসার জন্য সুব্যবস্থা থাকায় আশপাশ এলাকার বয়স্ক লোকজনও এখানে নিত্যদিন ছুটে আসেন।
শিশুদের প্লে গ্রাউন্ড
জেইন-লাস্কি পার্ক হচ্ছে ডেট্রয়েট শহরের পার্ক সিস্টেমের তেরোটি আঞ্চলিক পার্কের মধ্যে একটি, জেলা ৩ কনান্টে অবস্থিত পার্কটি লাস্কি রিক্রিয়েশন সেন্টারের পাশেই। ৬৫ একর পার্কটিতে একাধিক খেলার মাঠ, বাস্কেটবল কোর্ট, স্প্ল্যাশ প্যাড এবং শহরের একমাত্র পাবলিক পুট কোর্স রয়েছে। বিশেষ করে এটি শিশুদের খেলাধুলার অনবদ্য একটি স্থান হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। শিশুর মুখরিত কলকাকলিতে জমজমাট থাকে পুরো এলাকা।
সাইক্লিং
এদিক-ওদিক বাইসাইকেল নিয়ে শিশু-কিশোরদের ছুটোছুটি, ব্যস্ত রয়েছেন সঙ্গে আসা অভিভাবকেরা – কখন না জানি ঘটে যায় দুর্ঘটনা, যদিও এখানে সে সুযোগ নেই। শিশু-কিশোরদের নিরাপদে সাইক্লিং করার সুবর্ণ সুযোগ একে দিচ্ছে জেইন-লাস্কি পার্ক। অন্যান্য স্থানের চেয়ে সকল দিক থেকেই জায়গাটি নিরাপদ হয়ে উঠায় এখানে ছুটে আসেন অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের সাইক্লিং ট্রেনিং দিতে।
মেয়েদের খেলাধুলা
মাল্টি-স্পোর্টস এলাকা হিসেবে আশপাশে পরিচিতি পেয়েছে জেইন-লাস্কি পার্ক। মেয়েরা দল বেঁধে খেলছে, ছুটোছুটি করছে – এমন দৃশ্য নিয়মিত চোখে পড়ে এই পার্কে এলে। নিজস্ব সংস্কৃতি, রীতিনীতি মেনে এখানে যে যার মতোই খেলাধুলায় মগ্ন। বোরকা পরে যেমন একদল মেয়েরা খেলছে, অন্যদিকে জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে খেলছে অন্যদল। ভিন্ন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতির এ এক অনবদ্য মেলবন্ধন – কেউ কারও বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে না, আপন কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে।
আইসক্রিম খাওয়ার দোকান
এখানে আসা শিশু-কিশোর-তরুণদের আইসক্রিম খাওয়ার প্রতি রয়েছে আগ্রহ। সে সুযোগে পার্কের নিকটবর্তী এলাকায় অস্থায়ী আইসক্রিম খাওয়ার দোকান বসিয়ে দেন কেউ কেউ।
ফ্রি গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা
জেইন-লাস্কি পার্কে আসা লোকজনের সুবিধার্থে রয়েছে ফ্রি গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা। সে কারণে কেবল আশপাশের লোকজন নয় বরং দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকেই গাড়ি নিয়ে আসেন জেইন-লাস্কি পার্কে। গাড়ি পার্কিং সুবিধা থাকার ফলে গাড়ি রেখে নিশ্চিন্তে পার্কে ঘুরে বেড়াতে পারেন লোকজন।
ভ্রাম্যমাণ টয়লেট সুবিধা
জেইন-লাস্কি পার্কে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ টয়লেট সুবিধা। আশপাশে টয়লেট না থাকায় লোকজন বিপাকে পড়তে পারে এই ভাবনা থেকে কর্তৃপক্ষ এই সুবিধাটি চালু করে, যার কারণে এখানে আসা লোকজন নির্বিঘ্নে নিজেদের এই জরুরি কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন।
বাঙালিদের মেলা
বাঙালিদের নিকট দিন দিন খুবই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে পার্কটি। কয়েক মাস পূর্বে মিশিগানে এসেছিলেন বাংলা রক গানের কিংবদন্তি জেমস। তার কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে এই পার্কে। হাজার হাজার লোকের উপস্থিতি নতুনভাবে এই পার্কের পরিচিতি এনে দেয়। বাঙালিরা এখন জেইন ফিল্ড হিসেবে সহজেই চিনেন পার্কটিকে। নিয়মিত বাঙালি কমিউনিটির বিভিন্ন মেলার আয়োজন হয় এখানে। সহজ লোকেশন থাকায় এখানে অনুষ্ঠান আয়োজনের হিড়িক বাড়ছে।
ফ্যামিলি পার্টি
কেবল মেলা নয়, বাঙালিদের পারিবারিক নানা আয়োজনও এখন এই জেইন-লাস্কি পার্কে সম্পন্ন হচ্ছে। বারবিকিউ পার্টিসহ পিকনিক সেরে নিচ্ছেন অনেকেই। পরিবারের লোকজন নিয়ে সকাল-দুপুর কিংবা সন্ধ্যায় জড়ো হচ্ছেন এই পার্কে। ফ্যামিলি পার্টির পছন্দের লোকেশনে পরিণত হচ্ছে জেইন ফিল্ড খ্যাত জেইন-লাস্কি পার্ক।
প্রোপার্টি ভ্যালু
একসময় এই এলাকার খুব একটা মূল্য না থাকলেও এখন সেই অবস্থা আর নেই। লাফিয়ে বেড়ে গেছে প্রোপার্টি ভ্যালু। জেইন-লাস্কি পার্কের বদৌলতে এলাকায় এসেছে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন। সিটি অব ডেট্রয়েট পার্কস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান জেইন-লাস্কি পার্ককে মূলধনের উন্নতির জন্য উচ্চ অগ্রাধিকার হিসাবে চিহ্নিত করেছে। পার্কে সম্প্রদায়ের লোকজনের ব্যস্ততা প্রমাণ করে যে বাসিন্দারা জেইন-লাস্কি পার্কের সুফল পাচ্ছেন। ফলস্বরূপ, জেইন-লাস্কি পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন প্ল্যান তৈরি করছে এবং বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সামগ্রিক এলাকার মানসিক বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে জেইন-লাস্কি পার্ক।

মন্তব্য করুন