আবুল কাসেম
১ অক্টোবর ২০২৬, ৪:৩২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

পিঙ্ক অক্টোবর ২০২৬: গোলাপি রিবনের বার্তা পৌঁছাক মানুষের জীবনে

অক্টোবর এলেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চোখে পড়ে গোলাপি রিবন। হাসপাতালের দেয়ালে, কর্মক্ষেত্রের আয়োজনে, দোকানের পণ্যে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিতে- সবখানে তার উপস্থিতি। এই প্রতীক স্তন ক্যান্সার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একটি মাসজুড়ে যত আলোচনা হয়, তার কতটা মানুষের কাজে লাগে? কেউ উদ্বেগ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে চাইলে পথ খুঁজে পান কি? পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে পারেন কি? পিঙ্ক অক্টোবরের সার্থকতা খুঁজতে হলে এসব প্রশ্নও করতে হবে।

 

যুক্তরাষ্ট্রে স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাসের শুরু ১৯৮৫ সালে। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, নারীদের স্ক্রিনিং সম্পর্কে জানাতে এক সপ্তাহের প্রচারাভিযান হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে আয়োজনটি পুরো অক্টোবরজুড়ে বিস্তৃত হয়। গোলাপি রিবনও ধীরে ধীরে পরিচিতি পায়। সুসান জি কোমেন সংস্থার তথ্য বলছে, ১৯৯১ সালে নিউইয়র্কে তাদের একটি আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের রিবন দেওয়া হয়েছিল। চার দশকের বেশি সময় পর প্রতীকটি এখন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এবার ভাবার বিষয়, এর পেছনের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে।

 

সচেতনতা বলতে অনেক সময় একটি পোস্ট শেয়ার করা, গোলাপি পোশাক পরা বা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়াকে বোঝানো হয়। এসব কাজ আলোচনা শুরু করতে সাহায্য করে। তবে আলোচনা সেখানেই থেমে গেলে যে মানুষটির সহায়তা প্রয়োজন, তাঁর জীবনে পরিবর্তন আসে না। কার্যকর সচেতনতা মানুষকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয়, উদ্বেগের কথা বলতে স্বস্তি দেয় এবং প্রয়োজনীয় সেবার পথ দেখায়। সেই পথের কোথাও বাধা থাকলে তা দূর করার চেষ্টাও সচেতনতার অংশ।

 

নীরবতা সেই পথের প্রথম বাধা হতে পারে। শরীর নিয়ে উদ্বেগের কথা বলতে অনেকের অস্বস্তি হয়। কেউ পরিবারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবেন, কেউ পরীক্ষার সম্ভাব্য ফল নিয়ে ভয় পান। আবার কেউ মনে করেন, ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য সময় বের করা স্বার্থপরতা। এ অবস্থায় ‘ভয় পাবেন না’ বলা যথেষ্ট নয়। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করতে পারেন এবং বিচার বা উপহাসের আশঙ্কা ছাড়াই সাহায্য চাইতে পারেন।

 

 

পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ উদ্বেগের কথা জানালে তাঁকে মন দিয়ে শোনা দরকার। ‘কিছু হবে না’ বলে অপেক্ষা করানোর চেয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করা বেশি কাজে আসে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া, সঙ্গে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দেওয়া কিংবা চিকিৎসকের কথা বুঝে নিতে সহায়তা করা এসব ছোট কাজ বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারে। সহায়তা করার অর্থ অবশ্য অন্যের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয় বরং তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটিও সম্মান করতে হবে।

 

সঠিক তথ্যের অভাবেও উদ্বেগ বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞাপন ও চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শ প্রায়ই একসঙ্গে মিশে যায়। পরিচিত কারও অভিজ্ঞতা শুনে নিজের জন্য একই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নাও হতে পারে। তাই সচেতনতা প্রচারে সহজ ভাষায় নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া জরুরি। কোথায় চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া যাবে, কার সঙ্গে পরীক্ষার প্রয়োজন নিয়ে কথা বলা যায় এবং ফল পাওয়ার পর কীভাবে পরবর্তী নির্দেশনা বুঝতে হবে- এসব ব্যবহারিক প্রশ্নের উত্তর মানুষের বেশি প্রয়োজন।

 

স্ক্রিনিংয়ের বার্তাও স্পষ্ট হওয়া দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস টাস্ক ফোর্স গড় ঝুঁকিতে থাকা ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী নারীদের প্রতি দুই বছর অন্তর ম্যামোগ্রাফির সুপারিশ করে। তবে সবার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এক নয়। নিজের বয়স, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী কী করা উচিত, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করাই ভালো। নিয়মিত পরীক্ষার পরিকল্পনা থাকলেও নতুন কোনো উদ্বেগ দেখা দিলে নির্ধারিত তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও চিকিৎসকের কাছে জানতে হবে। সচেতনতার লক্ষ্য আতঙ্ক তৈরি করা নয় বরং যথাসময়ে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

 

কিন্তু সুপারিশ জানা আর পরীক্ষা করাতে পারা এক বিষয় নয়। একটি অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য কাজ থেকে ছুটি, যাতায়াত, শিশুর দেখাশোনার ব্যবস্থা কিংবা পরীক্ষার খরচ জোগাড় করতে হতে পারে। পরীক্ষাকেন্দ্র দূরে হলে বা যোগাযোগের ব্যবস্থা কঠিন হলে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কেউ পিছিয়ে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির ২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, যাতায়াতের সমস্যা ও অন্যান্য প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে ম্যামোগ্রাফি করানোর হারের সম্পর্ক রয়েছে। তাই মানুষকে শুধু ‘পরীক্ষা করুন’ বললে চলবে না বরং পরীক্ষা করার বাস্তব সুযোগও সহজ করতে হবে।

 

একটি পরীক্ষার পরও সহায়তার প্রয়োজন শেষ হয় না। ফল হাতে পাওয়ার অপেক্ষা, অস্বাভাবিক ফলের ব্যাখ্যা বোঝা এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী পরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রতিটি ধাপেই মানুষ অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র যদি সহজ ভাষায় পরের ধাপ বুঝিয়ে দেয়, যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট পথ রাখে এবং প্রয়োজনীয় সেবার ঠিকানা জানায়, তা রোগীর জন্য বড় সহায়তা। অক্টোবরের প্রচারে এই ধারাবাহিকতার কথাও আসা উচিত। কতজন পরীক্ষা করিয়েছেন, সেই হিসাবের পাশাপাশি ফলের পর প্রয়োজনীয় সেবা কতজন পেয়েছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

সব মানুষের অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রে স্তন ক্যান্সারে মৃত্যুহার ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৪৪ শতাংশ কমেছে এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। একই সঙ্গে আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে শ্বেতাঙ্গ নারীদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের মৃত্যুহার ৩৭ শতাংশ বেশি বলে জানানো হয়েছে। একটি জাতীয় গড় তাই সবার পরিস্থিতি তুলে ধরে না। স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানোর সুযোগ এবং সেবার অভিজ্ঞতায় যে অসমতা আছে, সচেতনতা প্রচারে সেটিও গুরুত্ব পেতে হবে।

 

এ দায়িত্ব শুধু রোগী বা তাঁর পরিবারের নয়। কর্মক্ষেত্র প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য সময় বের করার সুযোগ দিতে পারে। স্থানীয় সংগঠন নিজেদের এলাকার সেবার ঠিকানা সহজ ভাষায় জানাতে পারে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ফল জানার প্রক্রিয়া বোঝার মতো করে সাজাতে পারে। যাঁরা প্রচারাভিযান চালান, তাঁরা এমন মানুষের কথাও শুনতে পারেন, যাঁদের কাছে বার্তা পৌঁছায় কিন্তু সেবায় পৌঁছানো কঠিন হয়। তাঁদের অভিজ্ঞতা জানলে আয়োজন আরও কার্যকর করা সম্ভব।

 

সহায়তার পথ কোথায় আছে, সেটিও প্রচারের অংশ হওয়া দরকার। যুক্তরাষ্ট্রে সিডিসির একটি কর্মসূচির মাধ্যমে কম আয় এবং পর্যাপ্ত বিমা সুবিধা না থাকা যোগ্য নারীরা বিনা খরচে বা কম খরচে স্ক্রিনিং ও রোগনির্ণয়সংক্রান্ত সেবা পেতে পারেন। মিশিগানে এ ধরনের সহায়তার জন্য Breast and Cervical Cancer Control Navigation Program রয়েছে। স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ে সাধারণ যোগ্যতার বয়স ৪০ থেকে ৬৪ বছর; আয় ও বিমাসংক্রান্ত শর্তও প্রযোজ্য। যোগ্যতা এবং কাছাকাছি সেবার তথ্য জানতে ৮৪৪-৪৪৬-৮৭২৭ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। এমন নির্দিষ্ট তথ্য একটি সাধারণ সচেতনতার বার্তাকে বাস্তব সহায়তায় রূপ দিতে পারে।

 

চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের পাশে থাকার কথাও পিঙ্ক অক্টোবরে জায়গা পাওয়া উচিত। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আলাদা; সবাই একই ধরনের আশ্বাস শুনতে চান না। কেউ কথা বলতে চান, কেউ গোপনীয়তা চান, কেউ দৈনন্দিন কাজে সাহায্য পেলে স্বস্তি পান। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলার আগে তাঁর প্রয়োজন কী, তা জিজ্ঞেস করা ভালো। হাসপাতালে যাতায়াত, ঘরের কাজ বা সন্তানের দেখাশোনায় সাহায্য অনেক সময় বড় বড় কথার চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়।

 

গোলাপি পণ্য বিক্রি ও অনুদান সংগ্রহের আয়োজনেও একই বাস্তববোধ প্রয়োজন। অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কোন কাজে ব্যবহার হচ্ছে এবং রোগী বা কমিউনিটি কীভাবে উপকৃত হচ্ছেন এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকলে মানুষের আস্থা বাড়ে। একটি রিবন মানুষকে থামিয়ে ভাবতে শেখাতে পারে, সেই ভাবনা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব আয়োজক থেকে শুরু করে আমাদের সবার।

 

অক্টোবর শেষে গোলাপি রিবন খুলে রাখা হবে। কিন্তু যিনি এখনো উদ্বেগের কথা কাউকে বলতে পারেননি, যিনি পরীক্ষার খরচ বা যাতায়াতের উপায় খুঁজছেন, কিংবা যিনি ফল হাতে নিয়ে পরের পদক্ষেপ বুঝতে চাইছেন তাঁর প্রয়োজন তখনও থাকবে। পিঙ্ক অক্টোবর ২০২৬-এর সাফল্য তাই কত জায়গা গোলাপি হলো, সে হিসাবে মাপা যায় না। মাপতে হবে কতজন নির্ভয়ে কথা বলতে পারলেন, সময়মতো সেবায় পৌঁছালেন এবং কঠিন সময়ে কতজনকে পাশে পেলেন। নীরবতা ভাঙার আহ্বান এবার সেই কাজের অঙ্গীকার হোক পুরো অক্টোবরজুড়ে এবং বাকি এগারো মাস।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সেন্টার ফর এনআরবির উদ্যোগে ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা সভা

১

ইতিহাস গড়ল স্টারশিপ প্রথম কক্ষপথে পৌঁছে ২৬টি স্যাটেলাইট স্থাপন

২

সৌদিতে বাংলাদেশি জনশক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির

৩

নিউইয়র্কে সরকারি চাকরির আবেদন সহজ করতে ‘জবস এনওয়াইসি সেন্টার’

৪

বাংলাদেশকে সুখবর দিল যুক্তরাষ্ট্র

৫

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন, সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান

৬

হলুদ পাতায় হেমন্ত, জাহাঙ্গীর চৌধুরী

৭

ভালোবাসার দেশ, ইশতিয়াক রুপু

৮

বাফেলোর শরৎ, হাবিব ফয়েজি

৯

​নিউইয়র্কে ২৫ মেয়রকে নিয়ে আরবান ২০ সম্মেলন সম্পন্ন

১০

গ্লোবাল বাংলাদেশি চেম্বার অফ কমার্সের যাত্রা শুরু

১১

কম খরচে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনার সুযোগ, মিলতে পারে ১ লাখ ডলার

১২

মামদানির ‘ভিশন জিরো’ পরিকল্পনা, নিউইয়র্কে আসছে গাড়িমুক্ত পথচারী এলাকা

১৩

ষাট পেরিয়ে নতুন শুরু: কর্নেল স্যান্ডার্সের জীবন ও কেএফসির বিশ্বজয়ের গল্প

১৪

মিশিগানে আবাসনসংকট: স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আর কত দিন দায় এড়াবে?

১৫

কলম্বাস দিবস: উৎসবের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা আমেরিকার আরেক ইতিহাস

১৬

পিঙ্ক অক্টোবর ২০২৬: গোলাপি রিবনের বার্তা পৌঁছাক মানুষের জীবনে

১৭

জাতিসংঘে বিরল ইতিহাস গড়লেন প্রধানমন্ত্রী

১৮

বিদেশি সাংবাদিকদের ভিসায় সামাজিকমাধ্যম যাচাই শুরু যুক্তরাষ্ট্রের

১৯

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের পুরো ভাষণ

২০