যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশি নবীন চিকিৎসক ডা. অদিতি সাহা অনন্যা| চিকিৎসক হিসেবে ¯^প্নের পথচলা শুরু করার অল্প সময়ের মধ্যেই তার এমন অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য গভীর বেদনার| একই সঙ্গে এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে-উন্নত বিশ্বের আধুনিক সড়কব্যবস্থাও কেন প্রাণহানি পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না?
মিশিগান অঙ্গরাজ্য উন্নত মহাসড়ক, কঠোর ট্রাফিক আইন এবং আধুনিক যানবাহন ব্যবস্থাপনার জন্য পরিচিত| কিন্তু বাস্তবতা বলছে, অবকাঠামো যত উন্নতই হোক, চালকের অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতা থাকলে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা যায় না| সাম্প্রতিক কয়েক দিনেই রাজ্যের বিভিন্ন কাউন্টিতে একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে| মেসন কাউন্টিতে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর মৃত্যু, ওকল্যান্ড টাউনশিপে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণহানি, মনরো কাউন্টিতে অননুমোদিত এটিভির সংঘর্ষে এক কিশোরের মৃত্যু এবং লেনাওয়ি কাউন্টিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আরেকটি প্রাণ ঝরে যাওয়া-এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বরং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের স্পষ্ট প্রতিফলন|
প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে আলাদা পরিস্থিতি থাকলেও একটি বিষয় অভিন্ন তা হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের ভুল বা অবহেলা| অতিরিক্ত গতি, নিয়ন্ত্রণহীন চালনা, ট্রাফিক আইন অমান্য, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোনে মনোযোগ দেওয়া কিংবা অননুমোদিত যানবাহন ব্যবহার-এসব কারণই প্রতিদিন নতুন নতুন দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে| প্রযুক্তি চালককে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু দায়িত্ববোধের বিকল্প হতে পারে না|
মিশিগানে বাংলাদেশি কমিউনিটি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে| প্রতিবছর নতুন অভিবাসী, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা এখানে বসতি গড়ছেন| অনেকেই প্রথমবারের মতো বরফে ঢাকা পিচ্ছিল রাস্তা, দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ে, উচ্চগতির যান চলাচল এবং ভিন্ন ট্রাফিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন| ফলে শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জন করাই যথেষ্ট নয় বরং স্থানীয় সড়কব্যবস্থা, আবহাওয়া এবং নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ|
এ কারণেই এখন কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানোর সময় এসেছে| বাংলাদেশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধন রক্ষায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তেমনি সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও তাদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন| নতুন চালকদের জন্য ট্রাফিক আইনবিষয়ক ওরিয়েন্টেশন, শীতকালীন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, তরুণদের জন্য নিরাপদ ড্রাইভিং কর্মশালা এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতামূলক উদ্যোগ বহু দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে|
একটি দুর্ঘটনা কয়েক সেকেন্ডে ঘটে, কিন্তু তার বেদনা বয়ে বেড়াতে হয় একটি পরিবারকে সারাজীবন| নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার প্রথম পদক্ষেপ তাই শুরু হোক আমাদের প্রত্যেকের সচেতনতা, সংযম এবং দায়িত্বশীল আচরণ থেকেই|
মন্তব্য করুন