মো. আব্দুল বাছিত
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২:৪৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কমলা হ্যারিস : এক অদম্য নারীর জীবন ও কর্ম

কমলা হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক অদম্য নারী। তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী, যিনি আমেরিকায় নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয় বংশদ্ভূত সিনেটর ছিলেন। যিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। তিনি কেবল আমেরিকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা নন, বরং তিনি পুরো বিশ্বের নারীদের অদম্য-সাহসিকতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

 

জন্ম পরিবার

কমলা হ্যারিস ১৯৬৪ সালের ২০ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ডোনাল্ড জে. হ্যারিস এবং মাতা শ্যামলা গোপালান। তাঁর বাবা ডোনাল্ড জে. হ্যারিস, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং মা শ্যামলা গোপালন একজন ভারতীয় তামিল জীববিজ্ঞানী। কমলা হ্যারিসের মায়া নামে একটি ছোট বোন। সে একজন আইনজীবী এবং MSNBC রাজনৈতিক বিশ্লেষক। দুই বোন পড়াশোনার সময় থেকে বাবা-মায়ের সাথে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে থাকতেন। কমলার সাত বছর বয়সে তাঁর বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর থেকে দুই বোন মায়ের সাথেই থাকতেন এবং ছুটির দিনে তারা বাবার সাথে দেখা করতে যেতেন। কমলা হ্যারিস কখনো তাঁর নিজের শিকড়কে ভুলেননি। সত্যি বলতে তিনি কখনো ভুলতে চাননি। তিনি তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন, ‘শ্যামলা গোপালন হ্যারিসের মেয়ে-এই পরিচয়টুকুর থেকে বড় কোনো সম্মান পৃথিবীতে হতে পারে বলে আমি বিশ্বাসই করি না।

 

কৈশোর ও শিক্ষাজীবন

কমলার কৈশোর কেটেছে কানাডার মন্ট্রিলে। তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে ১৯৭৬ সালে তাঁর মা শ্যামলা মন্ট্রিলের জেনারেল হাসপাতালে চাকরি নেন এবং দুই মেয়ে কমলা ও মায়াকে নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। তখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর। কানাডায় বসবাস করলেও তাঁর মন পড়ে থাকতো যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের শহরে। তিনি কানাডার সহপাঠীদের কাছে সদা হাস্যোজ্জ্বল মেয়ে ছিলেন। নাচতে খুবই পছন্দ করতেন।

২০১৯ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথায় কমলা ওই সময়ের স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে রৌদ্রোজ্জ্বল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে, স্কুল বছরের মাঝখানে ১২ ফুট তুষারে ঢাকা ফরাসিভাষী বিদেশি শহরে চলে যাওয়ার চিন্তা তখন অন্তত দুঃখজনকই ছিল।’ কৈশোরে কমলা ফরাসি ভাষা একদমই জানতেন না। তাঁর মা তাঁকে একটি ফরাসিভাষী স্কুলে ভর্তি হতে জোর করেছিলেন। কিন্তু কমলার জন্য ফরাসি ভাষা শেখা বেশ কঠিন হয়ে যায়। পরে তাঁকে দ্বিভাষিক (দুই ভাষা প্রচলিত) একটি স্কুলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ইংরেজি ভাষার ওয়েস্টমাউন্ট হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন কমলা। সেখান থেকেই তিনি ১৯৮১ সালে হাইস্কুল পাশ করেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খুবই বন্ধুসুলভ ও বহির্মুখী। সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে অন্যদেরকে সাহায্য করতেন।

কমলা হ্যারিস এরপর ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলের কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বাস করলেও পড়ালেখা করেছেন অভিজাত থাউজেন্ড ওকস স্কুলে। সেই স্কুলে এক সময় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ছিল শ্বেতাঙ্গ। এখান থেকে পড়ালেখা শেষ করে তিনি বিখ্যাত হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালযয়ে ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করেন। তিনি এখান থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি নিয়ে পড়ালেখা করেন। পরবর্তীতে তিনি হেস্টিংস কলেজ অফ দ্য ল, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ইউসি হেস্টিংসে থাকাকালীন তিনি ব্ল্যাক ল স্টুডেন্ট্স এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮৯ সালে একজন জুরিস ডক্টর সহ স্নাতক অর্জন করেন এবং ১৯৯০ সালের জুনে ক্যালিফোর্নিয়া বারে ভর্তি হন।

 

কর্মজীবন

কমলা হ্যারিস একজন আইনজীবী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি প্রথমে আলমেদা কাউন্টি জেলা অ্যাটর্নি অফিসে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি সানফ্রান্সিসকো ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসে নিযুক্ত হন। পরে সান ফ্রান্সিসকোর সিটি অ্যাটর্নি অফিসে কাজ করার সুযোগ পান। তিনি ২০০৩ সালে সানফ্রান্সিসকোর জেলা অ্যাটর্নি হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে কমলা হ্যারিস ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে কমলা হ্যারিস পুনরায় উক্ত পদে নির্বাচিত হন। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত কমলা হ্যারিস ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জুনিয়র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হিসেবে কাজ করেছেন।  ২০১৬ সালের সিনেট নির্বাচনে কমলা লরেটা সানচেজকে পরাজিত করে দ্বিতীয় আফ্রিকান আমেরিকান মহিলা হিসেবে এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় আমেরিকান হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে কাজ শুরু করেছিলেন।

কমলা হ্যারিস মূলত কানাডায় বসবাসের সময়ই আইনজীবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এ সম্পর্কে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচনী প্রচারের সময় একটি ভিডিও বক্তব্যে বলেন, ‘যখন আমি হাইস্কুলে ছিলাম, আমার প্রিয় বান্ধবীদের একজন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল। এটা আমি জানতে পারি। আমার আইনজীবী হওয়ার পেছনে এটা একটা বড় কারণ। আমি তার মতো মানুষদের সুরক্ষা দিতে চেয়েছিলাম।’ কমলার বন্ধু ওয়ানডা কাগান বেশ কয়েক মাস তাঁদের সঙ্গে থেকেছেন। ওয়ানডা কাগানকে তাঁর সৎবাবা নির্যাতন করতেন। কমলা নিজেই বলেছেন, একসময় কানাডায় ভালো সময় কাটাতে শুরু করলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাঁর ‘মন খারাপ হতো’। বলেন, ‘আমি সব সময় বাড়িতে ফিরে যেতে চাইতাম।’ কানাডা থেকে হাইস্কুল পাশ করে কমলা ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান।

কর্মজীবনে কমলা হ্যারিস একজন সিনেটর হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, ড্রিম অ্যাক্ট, গাঁজার ফেডারেল ডি-শিডিউলিং, অ্যাসল্ট অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের নাগরিকত্বের উপায় এবং প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্স সংস্কারের পক্ষে কথা বলেছিলেন। সিনেটের শুনানিকালে তিনি ট্রাম প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সম্পর্কে কিছু যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এই কৃতিত্বের জন্যও তিনি জাতীয় প্রোফাইল অর্জন করতে সক্ষম হন। কমলা হ্যারিস ২০১৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী ডগলাস এমহফকে বিয়ে করেন। ডগলাসের আগের পক্ষের দুই সন্তান রয়েছে-কোল ও এলা। তারা কমলা হ্যারিসের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন।

 

রাজনীতি

কমলা হ্যারিস ২০০৩ সালে প্রথম নারী ও কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাটনিং জেনারেল পদে নিযুক্ত হলে ডেমোক্যাটিক পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত বাড়তে থাকে। পরে তিনি ২০১৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার জুনিয়ার সিনেটর পদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হন। সিনেটর হিসেবে তাঁর ধারালো প্রশ্ন করার ক্ষমতা বারবার আলোচিত হয়েছে সংবাদমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়ায়। টানা দুই টার্ম ধরে তিনি সফল অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্বপালনকালে বেশ আলোচিত হন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে নিজের মিশ্র ঐতিহ্য বিষয়ে সাবলীল আলাপ তাকে জনসাধারণের কাছে আরো জনপ্রিয় করে তোলে। এছাড়া তাঁর প্রতি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমর্থনও সাহায্য করেছে বলে মনে করেন অনেকে। সিনেটর পদে নির্বাচিত হবার পর কমলা বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সোচ্চার হন। সমকামীদের বিবাহের অধিকারের পক্ষে, মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে থাকার পাশাপাশি কমলা বিভিন্ন সময়ে পুলিশনীতিতে বদলের দাবি তুলেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ ও পুলিশের অনৈতিকতা বিষয়ে কড়া সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী ভাইস প্রেসিডেন্টের শপথ নেন। আসন্ন ৫ নভেম্বর ২০২৪ সালে ৬০তম চতুর্বার্ষিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে কমলা হবেন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। কমলার পারিপার্শ্বিকতা দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে—কমলা হ্যারিস সেই ইতিহাস গড়তে চাচ্ছেন। তাঁর অদম্য সাহসিকতা, ঐকান্তিকতা, সুদূরপ্রসারী চিন্তা আর কর্মচাঞ্চল্য মনোভাব যেন সেই সম্ভাবনার পথকে আরো ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছে। তাঁর বিজয়কে দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ৫ নভেম্বর ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

 

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানের মানচিত্রে মার্কিন পতাকা, ট্রাম্পের পোস্ট ঘিরে তোলপাড়

টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘পার্টনার কংগ্রেস’ ও কৃষি প্রযুক্তি মেলা অনুষ্ঠিত

মিশিগানে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে যুবলীগের আলোচনা সভা

নিউইয়র্কে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘বাংলাদেশ ডে প্যারেড’

ভুয়া তথ্য দিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব, ১২ জনের সিটিজেনশিপ বাতিলের উদ্যোগ

মিশিগানে এডভোকেট বৃন্দের পরিচিতি ও সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

মার্কিন ‘কঠোর ৫ দফা’ প্রস্তাবে না বলল ইরান

আগামী ২৫ ও ২৬ জুলাই মিশিগানে বসছে বাংলাদেশি আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদে ইতি টানতে যাচ্ছেন স্টারমার

হাউজিং ভাউচার তহবিল কমায় নিউইয়র্কে বাড়ছে আবাসন সংকটের শঙ্কা

১০

কমলগঞ্জে চা শ্রমিকদের মানববন্ধন ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালুর দাবিতে

১১

তাইওয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সতর্কবার্তা

১২

যুক্তরাষ্ট্রে শেষকৃত্যের ব্যয় বেড়ে চরম চাপে প্রবাসী মুসলিম পরিবার

১৩

জেলা প্রশাসকের প্রবাসী সম্মাননায় ভূষিত প্রিন্সিপাল মাওঃ আতিকুর রহমান

১৪

গেমস্টপের ৫৫.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল ইবে

১৫

আইসের ‘নো-বন্ড’ নীতি বাতিল, জামিনে মুক্তির সুযোগ পাচ্ছেন অভিবাসীরা

১৬

মৌলভীবাজার শহরে ছয় তলা ভবন থেকে তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

১৭

জরুরি সেবায় কাটছাঁট নয়, ১২৪.৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট আনলো নিউইয়র্ক সিটি

১৮

কোভিডকালে ট্যাক্স ফাইলিংয়ে জরিমানা দেওয়া ব্যক্তিদের রিফান্ডের সম্ভাবনা

১৯

ফেন্টানাইল চক্রে জড়িত অভিযোগ, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানসহ ১৩ জনকে নিষিদ্ধ করল যুক্তরাষ্ট্র

২০