২২ জানুয়ারী ২০২৪, ৩:৩৭ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধন: কী বলছেন সেখানকার মুসলমানরা?

ফুলজাঁহা যেখানে থাকেন, কাটরা নামের সেই পাড়াটা নতুন রাম মন্দিরের ঠিক পিছনেই। কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এখানেই থাকেন।

ফুলজাঁহা যখন নয় বছরের, তখনই, সাতই ডিসেম্বর, ১৯৯২ উত্তেজিত জনতা তাদের বাড়িতে হামলা করে, মেরে ফেলে ওর বাবা ফতেহ মুহম্মদকে।

তবে সেই দিনের কথা ভাবতে বসলে হাতের কাজ যে পড়ে থাকবে!

রাম মন্দির উদ্বোধনের আগে তার এখন দম ফেলারও সময় নেই। পরিবারের চার সদস্যই দ্রুত হাতে মিষ্টির বাক্স বানাচ্ছেন। ওই বাক্সে ভরেই মিষ্টি যে রাম মন্দিরের প্রসাদ হিসাবে দেবে সবাই।

কাজ করতে করতেই তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “এখন তো অযোধ্যায় শান্তিই রয়েছে, কোনও সমস্যা নেই। এত কঠিন পথ যখন আমরা পেরিয়ে এসেছি, তো আগামী দিনেই কী হবে দেখা যাবে। একটা আশঙ্কা যদিও থেকেই যায় যে কখন কিছু ঘটে না যায়, তবে অযোধ্যায় এখন শান্তিই আছে।”

ফুলজাহাঁর বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরেই হাফিজ-উর-রহমান থাকেন। ৩১ বছর আগের সেই দাঙ্গার দিনে, যে দাঙ্গায় ফুলজাহাঁর বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছিল, তিনি একটা হিন্দু পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।

তবে সেই দাঙ্গায় নিজের জ্যাঠা আর বড়ভাইকে হারিয়েছিলেন হাফিজ-উর-রহমান।

তিনি বলছিলেন, “ওই দাঙ্গার পর থেকে তো এখানে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় আছে। কিন্তু এখনও অযোধ্যায় বড় কোনও আয়োজন হলে, লাখ লাখ মানুষ জড়ো হলে কিছুটা ভয়ে থাকি আমরা। এবারও সেরকমই একটা চাপা ভয় আছে। আশা করি শান্তিতেই মিটবে সব কিছু।”

দীর্ঘ আইনি লড়াই

ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয় ১৯৯২-র ছয়ই ডিসেম্বর।

তার পরে অযোধ্যা-সহ গোটা দেশে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়ায়, তাতে অন্তত দুই হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন।

এরপরে হিন্দু আর মুসলমান – দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে ইলাহাবাদ হাইকোর্ট, তারপরে সুপ্রিম কোর্টে লম্বা আইনি লড়াই চলে।

হিন্দু সংগঠনগুলির বক্তব্য ছিল বাবরি মসজিদ আসলে রাম জন্মভূমি আর তা বানানো হয়েছিল একটি মন্দির ধ্বংস করেই।

সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ২০১৯ সালে এক ঐতিহাসিক রায়ে জানায় যে “বাবরি মসজিদ অন্যায় ভাবে ভাঙ্গা হয়েছিল।” তবে শীর্ষ আদালত এটাও নির্দেশ দিয়েছিল যে অযোধ্যায় বিতর্কিত জমিতে মন্দির তৈরি হবে।

আদালতের নির্দেশেই অযোধ্যা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ধন্নিপুরে একটা নতুন মসজিদ বানানোর জন্য জায়গা দেওয়া হয়।

কী বলছেন অযোধ্যার মুসলমানরা?

ঘটনাচক্রে রাম মন্দির পরিসরের আশেপাশের এলাকাতে প্রায় একডজন মসজিদ, মাদ্রাসা আর মাজার রয়েছে। মন্দিরগুলিতে যখন পুজো পাঠ হয়, ওই মসজিদ, মাদ্রাসা আর মাজারেও পাশাপাশি চলতে থাকে আজান আর নামাজ আদায় করা।

প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের অযোধ্যা জেলায় পাঁচ লক্ষ মুসলমানও থাকেন। এঁদের মধ্যে হাজার পাঁচেক মানুষ তো নতুন রাম মন্দিরের আশে পাশেই থাকেন।

অযোধ্যা লাগোয়া শহর ফৈজাবাদে মুহম্মদ খালিক খানের ষ্টেশনারি দোকান আছে। তারা কয়েক প্রজন্ম এখানেই বসবাস করেন।

তিনি বলছিলেন, “এই দিন দশেক আগে টাটশাহ মসজিদে অযোধ্যা থেকে কয়েকজন এসেছিলেন। তারা বলছিলেন যে প্রচুর মানুষ অযোধ্যায় আসবেন, তাই তারা আপাতত বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।”

“তবে উলেমারা তাদের বোঝান যে আপনারা ঘরবাড়ি ছেড়ে কেন যাবেন, আমরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছি। এরপরে পুলিশের পক্ষ থেকেও তাদের বোঝানো হয়, তারাই রক্ষা করবেন সবার।”

আবার এই খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে অযোধ্যার কিছু মুসলমান পরিবার মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠার কয়েকদিন আগে সাময়িক ভাবে অন্য কোথাও চলে গেছেন।

স্থানীয় প্রশাসন ও রাজ্য সরকার অবশ্য জোর দিয়ে বলছেন যে অনুষ্ঠানের আগে-পরে নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে, কারও ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

বিজেপি সংসদ সদস্যর আশ্বাস

অযোধ্যা থেকে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন বিজেপির সংসদ সদস্য লাল্লু সিং বিবিসিকে বলছিলেন, “সবার নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কারও আশঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।”

তার কথায়, “যেভাবে অযোধ্যার অন্য বাসিন্দারা থাকছেন, সংখ্যালঘুরাও সেভাবেই থাকেন। নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখি আমরা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো যা কাজ করছেন, সবার উন্নতির জন্যই করছেন।”

“সেখানে কেউ এটা বলতে পারবে না যে এই ধর্মের মানুষের জন্য বাড়তি কিছু করা হয়েছে বা অন্য ধর্মের জন্য কম করা হয়েছে। আমাদের সংগঠন কখনই আমাদের বলে নি যে কারও থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চল, কারণ ভারতের নাগরিক তো সবাই”, বলছিলেন এমপি লাল্লু সিং।

তবে বেশ কিছুদিন আগে আমি রাম মন্দির পরিসরের শ’খানেক মিটারের মধ্যে অবস্থিত একটা বড় মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, যেখানে হাজি হাফিজ সৈয়দ ইখলাকের সঙ্গে কথা হয়েছিল।

তিনি বলেছিলেন, “এই পরিসরের কাছাকাছি সংখ্যালঘুদের বেশ কিছু জমি জায়গা আছে। তাদের কেউ কেউ দ্বিধায় রয়েছেন যে কতদিন এখানে থাকা যাবে।”

এবার অযোধ্যায় গিয়ে আমি আবারও তার কাছে গিয়েছিলাম। এবার অবশ্য তিনি আমার সঙ্গে আর কথা বললেন না। এক কর্মচারী তার কাছ থেকে ফিরে এসে আমাকে জানালেন, “হাজি সাহেব সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না।”

তিনি বলছিলেন, “সংখ্যালঘুদের এটা মনে হচ্ছে যে তাদের মতামত কম নেওয়া হচ্ছে। আমার ধর্মীয় স্থানের যদি পুনর্জীবন ঘটানো হত তাহলে তো আমারও ভাল লাগত আর যে গঙ্গা-যমুনা সম্প্রীতির কথা আমরা বলি, সেটাও জোর পেত যে হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রী সব সম্প্রদায়ের জন্য, কোনও এক বিশেষ ধর্মের জন্য নন তিনি।”

“এখানে সমাজ কোনও রাজনীতির মধ্যে জড়াতে চায় না, আবার রাজনীতির অংশও হয়ে উঠতে চায় না। যেখানে যা আছে, সেরকমই থাকুক, শুধু এটুকুই চায় সবাই”, বলছিলেন মি. কাদরি।

আবার অযোধ্যা শিয়া ওয়াকফ্ কমিটির প্রেসিডেন্ট হামিদ জাফর বলছিলেন, “যখন সুপ্রিম কোর্টের রায় এসে গেছে, তার ওপরে আর কোনও তর্ক বিতর্ক চলে না।”

“কিন্তু ২২শে জানুয়ারির আগে এখানে যত সংবাদ মাধ্যম আসছে, তাদের একটা অংশ বারে বারে মুসলমানদের কাছে জানতে চাইছে যে আমরা ২২ তারিখ কী করব। এটা অনুচিত। আরে ভাই, ২২ তারিখে তারা সেটাই করবেন, যেটা ২১ তারিখ করেছেন!”, বলছিলেন মি. জাফর।

ফুলজাঁহারা যেরকম রামচন্দ্রের প্রসাদী মিষ্টির বাক্স বানাচ্ছিলেন কদিন আগে, সেটাই করবেন ২২ তারিখেও।

রাম মন্দিরে পুজোর আরও নানাবিধ আয়োজনকে কেন্দ্র করে যে ‘মন্দির অর্থনীতি’ চলে, সেখানে যে হিন্দু-মুসলমান কোনও ভাগ নেই। বিবিসি নিউজ

বাংলা সংবাদের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে হ্যামট্রাম্যাক থেকে নতুন ফ্রি বাস সেবা

১

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নতুন ভিসা বিধিনিষেধ

২

মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘বেস্ট অব দ্য ওয়েস্ট ইয়ুথ লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন তাহমিদ চৌধুরী

৩

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বারহাম সালিহ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

৪

সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে

৫

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসী তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে

৬

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

৭

মেডিকেইডের ওষুধের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের

৮

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মী ভিসায় ১ লাখ ডলারের ফি আরও এক বছর

৯

তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাড়ল সুদের হার

১০

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রিনকার্ডে নতুন পাবলিক চার্জ নিয়ম

১১

গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসায় লাগাম, মার্কিন নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানটি

১২

বিজিবির অভিযানে মাদক-অস্ত্রসহ ৯১৩ কোটি টাকার পণ্য জব্দ, আটক ২৮১

১৩

ডেট্রয়েট থেকে আটলান্টিক সিটি, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃত উপস্থিতি

১৪

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ডলারের বিকল্প খুঁজছে বিভিন্ন দেশ

১৫

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র

১৬

গ্রিন কার্ড স্পনসরশিপে নতুন নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রে, যাচাই হবে স্পনসরের ক্রেডিট তথ্য

১৭

সৌদি আরবে ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

১৮

ডাকযোগে ভোটের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের উদ্যোগে বাধা

১৯

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ভোটের অভিযোগে ৭ গ্রিন কার্ডধারী গ্রেপ্তার

২০