যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ আগস্ট মোট ফেডারেল ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এর মাত্র পাঁচ মাস আগে, মার্চে ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ পাঁচ মাসেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের সঙ্গে আরও প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে।
মার্কিন সরকারের মোট বা গ্রস জাতীয় ঋণের মধ্যে বর্তমানে জনগণের হাতে থাকা সরকারি ঋণ প্রায় ৩২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। বাকি অংশ ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকা ঋণ। অর্থনীতিবিদদের কাছে জনগণের হাতে থাকা ঋণ অর্থনৈতিক চাপ পরিমাপের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের এই ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। গত এক দশকে দেশটির মোট জাতীয় ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় ঋণ ছিল প্রায় ১৯ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
করোনা মহামারির সময় ঋণ বৃদ্ধির গতি আরও বেড়ে যায়। সে সময় ট্রাম্প ও পরবর্তী সময়ে জো বাইডেন প্রশাসনের ব্যাপক সরকারি ব্যয়, জরুরি সহায়তা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি ঋণের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে অবকাঠামো বিনিয়োগ, জ্বালানি ও শিল্পখাতে সরকারি সহায়তা এবং অন্যান্য ব্যয়ের পাশাপাশি আগের ঋণের সুদ পরিশোধও ফেডারেল বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বৃদ্ধির দায় কোনো একটি প্রশাসনের ওপর এককভাবে চাপানো যায় না। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও জাতীয় ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। একই সময়ে ২০১৭ সালের কর সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে ফেডারেল ঘাটতি বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরবর্তী বাইডেন প্রশাসনের সময়ও বিভিন্ন সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসূচির কারণে ঋণ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু ঋণের মোট পরিমাণ নয়, বরং এর সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। জুলাই মাসেই সরকারকে প্রায় ৪৩২ বিলিয়ন ডলার ধার করতে হয়েছে।
ঋণের সুদ পরিশোধ এখন ফেডারেল সরকারের অন্যতম বড় ব্যয়ে পরিণত হয়েছে। কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের হিসাবে, ঋণের সুদ ব্যয় জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়ের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ঋণের এই ধারা অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যান্য সরকারি অগ্রাধিকারে ব্যয় সংকোচন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ বন্ডবাজারেও উদ্বেগ তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় সরকারের নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণের খরচ, বিশেষ করে মর্টগেজের সুদের হারেও পড়তে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় আশঙ্কা হলো, জাতীয় ঋণ যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়বে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতায় ২০৩৬ অর্থবছরের শেষে মোট জাতীয় ঋণ ৬৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ফলে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক শুধু একটি বিশাল অঙ্কের ঋণকে নির্দেশ করছে না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘাটতি, করনীতি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দুই দলের প্রশাসনের সময়েই ঋণ বেড়ে চলায় এখন দেশটির সামনে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন