কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি নিয়ে চলা এক ঐতিহাসিক মামলার নিষ্পত্তি করতে ১৭ বিলিয়ন (১ হাজার ৭০০ কোটি) ডলার দিতে রাজি হয়েছে মেটা। একই সঙ্গে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশু সুরক্ষায় নতুন কিছু পদক্ষেপ যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি অঙ্গরাজ্যের আনা অভিযোগের মুখে মেটা এই আপসে পৌঁছাল। বুধবার অঙ্গরাজ্যগুলোর অ্যাটর্নি জেনারেলরা আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রথমে ২০২৩ সালে এই প্রযুক্তি জায়ান্টের বিরুদ্ধে ২৯টি অঙ্গরাজ্য মামলা করে। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি এবং নিউ জার্সিও ছিল। এই আপসের কারণে বিচারকাজটি সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল। তা না হলে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে বিচারক প্যানেলের সামনে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে দাঁড়াতে হতো বলে ধারণা করা হচ্ছিল। এক বিবৃতিতে অ্যাটর্নি জেনারেল জে জোনস বলেন, এই চুক্তির ফলে কেবল ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যই ৩৫৩ মিলিয়ন (৩৫ কোটি ৩০ লাখ) ডলার পাবে। অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোক্তা অধিকার রক্ষার ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় একটি আপস-মীমাংসা।
জোনস বলেন, ‘তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলা আসক্তিজনক ও ক্ষতিকর নকশার (ডিজাইন) বিষয়ে মেটা বছরের পর বছর ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে।’ এই আপস-মীমাংসা ‘এসব বিপজ্জনক চর্চার অবসান ঘটাবে। পাশাপাশি এটি একটি অর্থবহ স্বস্তি এনে দেবে, যা শিশুদের অনলাইনের ক্ষতিকর দিক থেকে রক্ষা করবে।’ একটি ব্লগ পোস্টে মেটা বলেছে, তারা বাবা-মায়েদের ক্ষমতায়ন এবং কিশোরদের সহায়তা করার জন্য দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে।
কোম্পানিটি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও একই ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। ১৭ বিলিয়ন ডলারের এই আপসের অর্থ ২০২৫ সালে মেটার আয় করা ২০১ বিলিয়ন ডলারের খুব সামান্য একটি অংশ মাত্র। মামলায় মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, কোম্পানিটি ইচ্ছা করেই এমন কিছু ফিচার তৈরি করেছে, যা শিশুদের তাদের প্ল্যাটফর্মে আসক্ত করে। আবার এই বিষয়টি তারা জনগণের কাছে লুকিয়েও রেখেছে। এর মাধ্যমে মেটা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসংকটে ফেলার জন্য দায়ী। মামলায় আরও যুক্তি দেওয়া হয়, বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়াই ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে মেটা কেন্দ্রীয় সরকারের আইন ভঙ্গ করেছে।
গত সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ ইওভন গঞ্জালেস রজার্স এই বিচারকাজ পরিচালনা করছিলেন। ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি গত মঙ্গলবার শেষের দিকে তাঁর জবানবন্দি দেওয়া শুরু করেন। সেখানে তিনি শিশু সুরক্ষা ও গোপনীয়তার বিষয়ে মেটার অতীতের কর্মকাণ্ড এবং অগ্রগতির পক্ষে সাফাই গান। অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মামলাগুলোর বিচারকাজ পরে শুরু হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া আরও নয়জন অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেদের নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যে মামলা দায়ের করেছিলেন।
যেসব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেবে মেটা
প্রস্তাবিত আপসরফা অনুযায়ী, মেটা বেশ কিছু সুরক্ষামূলক ফিচার যুক্ত করতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহারকারী শিশুদের জন্য দৈনিক সময়সীমার একটি ‘কঠোর সীমা (হার্ড ক্যাপ)’ এবং ব্যবহারের মাঝে বিরতি দেওয়ার সুবিধা যুক্ত করা।
সপ্তাহের স্কুল চলাকালে মেটা পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেবে। সেই সঙ্গে বুলিং (হয়রানি), খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধি (ইটিং ডিজঅর্ডার) এবং নিজের ক্ষতি করার মতো ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকাতে ‘শক্তিশালী’ বয়স-নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা চালু করবে। পাশাপাশি ‘বয়সের উপযোগী’ কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও আনা হবে। বাবা-মায়েদের নজরদারির (প্যারেন্টাল কন্ট্রোল) ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য করা হবে। এ ছাড়া ‘লাইক’ গোনার মতো সামাজিক তুলনামূলক ফিচারগুলোতেও সীমাবদ্ধতা আনা হবে।
সূত্র: এপি
মন্তব্য করুন