যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের টিকাদান ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। সোমবার ১০ আগস্ট স্বাক্ষর করা এক নির্বাহী আদেশে শিশুদের জন্য নতুন ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড চাইল্ডহুড ভ্যাকসিন রেকমেন্ডেশনস’ চালুর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হাম, মাম্পস ও রুবেলার যৌথ এমএমআর টিকাকে ভবিষ্যতে পৃথক তিনটি টিকায় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শিশুদের টিকাদানের সময়সূচি, টিকার ধরন এবং প্রয়োগের পদ্ধতি নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বর্তমান টিকাদান কর্মসূচি পর্যালোচনা করে নতুন সুপারিশ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের জন্য সমমানের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি সংখ্যক টিকা সুপারিশ করা হয়। এ কারণে কোন টিকা কখন, কী ক্রমে এবং কীভাবে দেওয়া হবে, তা নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে।
বর্তমানে এমএমআর টিকার মাধ্যমে একই সঙ্গে হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। নতুন পরিকল্পনায় দেশীয়ভাবে পৃথক টিকা উৎপাদন সম্ভব হলে তিনটি রোগের জন্য আলাদা টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভব হলে প্রতিটি টিকা পৃথক চিকিৎসা-সাক্ষাতে দেওয়ার নির্দেশনার কথাও রয়েছে। এতে শিশুদের টিকা দিতে অভিভাবকদের আগের তুলনায় চিকিৎসকের কাছে বেশি বার যেতে হতে পারে। হোয়াইট হাউসে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের আগে ট্রাম্প জানান, নতুন সুপারিশের আওতায় অটিজমসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হবে। তবে নির্বাহী আদেশের লিখিত অংশে অটিজমের কোনো উল্লেখ রাখা হয়নি।
নতুন নীতিতে শিশুদের টিকাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে থাকবে সব শিশুর জন্য নিয়মিত সুপারিশ করা টিকা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকবে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য নির্ধারিত টিকা। আর তৃতীয় শ্রেণির টিকা দেওয়া হবে চিকিৎসক ও পরিবারের যৌথ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনে আরএসভি প্রতিরোধী মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, হেপাটাইটিস এ ও বি, মেনিনগোকক্কাল বি, মেনিনগোকক্কাল এসিডব্লিউওয়াই এবং ডেঙ্গু টিকাকে উচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নিরাপদ শিশু টিকাবিষয়ক এইচএইচএস টাস্কফোর্সকে ৯০ দিনের মধ্যে একক রোগভিত্তিক টিকার সুযোগ বাড়ানো, টিকার উপাদান ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য উন্নত করা এবং নজরদারি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানের বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে টিকাদান নীতি আধুনিকায়ন এবং অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়ানোই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য।
তবে প্রশাসনের এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু ও কিশোরস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. মেলিসা স্টকওয়েল নিউজউইককে বলেছেন, এমএমআর টিকাকে তিনটি পৃথক ইনজেকশনে ভাগ করার পক্ষে বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাবিষয়ক কোনো প্রমাণ নেই। স্টকওয়েলের মতে, এ ধরনের পরিবর্তনে পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে এবং শিশুদের আরও বেশি ইনজেকশন নিতে হবে। অথচ এতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বাড়তি কোনো সুবিধা নেই। বরং আলাদা সময়ে টিকা দেওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব ডোজ সম্পন্ন না হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে শিশুরা আরও দীর্ঘ সময় সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবে।
তিনি বলেন, হাম, মাম্পস ও রুবেলা সাধারণ শৈশবকালীন অসুস্থতা নয়। হাম থেকে নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহ হতে পারে। মাম্পসের কারণে শ্রবণশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। আর রুবেলা গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব কিংবা জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। স্টকওয়েল আরও জানান, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এমএমআর টিকার পৃথক সংস্করণ বাজারে নেই। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত যৌথ এমএমআর টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। এটি হাম ও রুবেলার বিরুদ্ধে প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং মাম্পসের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৬ শতাংশ সুরক্ষা দেয়।
টিকা দেওয়ার সময় পিছিয়ে দেওয়া কিংবা দীর্ঘ বিরতিতে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা বাড়ে না বলেও সতর্ক করেন স্টকওয়েল। বরং এতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকান সিনেটর ও চিকিৎসক বিল ক্যাসিডি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এমন পরিবর্তন আনার মতো প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রেসিডেন্টের নেই। শিশুদের টিকা নিরাপদ ও কার্যকর এবং টিকার সঙ্গে অটিজমের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ক্যাসিডির আশঙ্কা, একই সুরক্ষা পেতে শিশুদের যদি একাধিকবার চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়, তাহলে অনেক পরিবার টিকা নেওয়া পিছিয়ে দিতে পারে। এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এদিকে কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে টিকা সংক্রান্ত নিয়মে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন সুপারিশ অনুসরণ নাও করতে পারে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সুপারিশের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মন্তব্য করুন