বাংলা সংবাদ ডেস্ক
১১ জানুয়ারী ২০২৬, ৩:২৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশসহ চার নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যাচাই

বিশ্ব ২০২৬ সালে এসে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ বা বিভাজন, ভ্রান্ত তথ্যের বিস্তার ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এমন অবস্থায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে? চলতি বছর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনগুলোতে সে পরীক্ষাই হতে যাচ্ছে।

 

 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে চারটি নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো, হয় গণতান্ত্রিক মানদণ্ডকে আরও শক্তিশালী করবে, নয়তো স্বাধীন ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা আরও ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। নির্বাচনগুলো হতে যাচ্ছে- বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র (মধ্যবর্তী), ব্রাজিল ও কুইবেকে (কানাডার প্রদেশ)।

 

 

 

বাংলাদেশ: জেনজির জন্য বড় সুযোগ

বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন দেশটিকে এমন কিছু দিতে যাচ্ছে, যা গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেখা যায়নি। নাগরিকদের- বিশেষ করে তরুণদের জন্য এটি একটি মুক্ত, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক ভোটে অংশ নেওয়ার প্রকৃত সুযোগ। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার উৎখাতে ভূমিকা রাখা জেনারেশন জেডের (জেনজি) জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। একদলীয় শাসনে যেসব প্রতিষ্ঠান অন্তঃসারশূন্য হয়ে গিয়েছিল, সেগুলো পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয় এই সরকারকে।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সরকার প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্য হস্তান্তরের জন্য এগুলো অপরিহার্য ভিত্তি। অন্যদিকে দেশটির জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ ১৮ বছরের নিচে। এ অবস্থায় তরুণ নেতারা নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের আবির্ভাব একটি উল্লেখযোগ্য তৃণমূলভিত্তিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।  ফেব্রুয়ারিতে যা ঘটবে সেটির প্রতিধ্বনি ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক মানদণ্ড ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সুদৃঢ় করতে পারে। কিন্তু নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া পুনর্জাগরণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

 

 

যুক্তরাষ্ট্র: মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ট্রাম্পের ক্ষমতা

মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী ৩ নভেম্বর। যেখানে ভোটের আওতায় থাকবে নিম্নকক্ষের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সবগুলো (৪৩৫) আসন। এ ছাড়া, উচ্চকক্ষ সিনেটের এক’শর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হবে।  যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীনরা হেরে যায়। ফলে আসন্ন নির্বাচনটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় টিকে থাকা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি করেছে। সম্প্রতি হওয়া জরিপ দেখাচ্ছে, রিপাবলিকানরা হাউসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা মাত্র ২ থেকে ৩ আসনে সীমিত হয়ে যেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসকে কাজে লাগিয়ে নিজের পছন্দের আইন পাস (যেমন- কর ও ব্যয় সংক্রান্ত ‘বিগ, বিউটিফুল’ বিল) করিয়েছেন। এ ছাড়া, নিজের পছন্দের বিচারক নিয়োগের অনুমোদন করানোর পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা তদারকির প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেছেন।

 

 

ফলে আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যদি উচ্চ বা নিম্নকক্ষের যেকোনো একটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়, তাহলে আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। এমনকি ডেমোক্রেটিক পার্টি নিয়ন্ত্রিত হাউস ট্রাম্পের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মনোভাবের পরীক্ষা নেবে। নভেম্বরে ট্রাম্পের মেয়াদ দুই বছরে পা দেবে। এরই মধ্যে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক মানের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ আছে। কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক পার্টি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে কি না সেটিও নির্ধারিত হবে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে।

 

 

ব্রাজিল: স্বাভাবিকতায় ফিরবে?

ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে আগামী ৪ অক্টোবর। ৭৯ বছর বয়সী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে পারেন। জিতলে সেটি হবে তাঁর চতুর্থ মেয়াদের শাসন। লুলার রাজনৈতিক জীবন নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ২০১৭ সালে তিনি দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১২ বছরের কারাদণ্ড পান। ফলে ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ২০১৯ সালে তিনি মুক্তি পান। দুই বছর পর তাঁর সাজা বাতিল হয়। ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ক্ষমতায় থাকা জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অল্প ব্যবধানে জয়ী হন। পরের বছর একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান কাটিয়ে তিনি এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আছেন। আর অভ্যুত্থান চেষ্টার দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন বলসোনারো।

 

 

বর্তমানে লুলাকে নিয়ে সমর্থকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, এক-তৃতীয়াংশ ব্রাজিলীয় মনে করেন লুলা ভালো কাজ করছেন। আর এক-তৃতীয়াংশের মতে, দেশ পরিচালনার কাজ যথাযথ হচ্ছে না। জরিপে অংশগ্রহণকারী বাকিরা মধ্যমপন্থা বেছে নিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন বলসোনারোর বড় ছেলে ফ্লাভিও। জাইরের ডানপন্থি রাজনীতি নতুন কারও হাতে টিকে থাকতে পারে কি না সেটির পরীক্ষাও হবে আসন্ন নির্বাচনে। এ ছাড়া, ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজন, অস্থিরতার ইতিহাস পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া কিংবা গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকা না থাকাটাও নির্ধারণ করবে অক্টোবরের নির্বাচন।

 

 

কুইবেক: স্বাধীনতার জন্য নতুন চাপ?

কুইবেক কানাডার প্রদেশ হলেও এর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও আইনি ব্যবস্থার কারণে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে। পাশাপাশি এর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। এমন অবস্থায় আগামী ৫ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন একটি ভিন্ন ধরনের গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ সামনে আনছে।  প্রদেশটির বর্তমান সরকার ফরাসি ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক ও ধর্মনিরপেক্ষতা সম্প্রসারণ করে একটি আইন প্রণয়ন করেছে। যা এরই মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের প্রচারে এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠবে। পাশাপাশি কুইবেকের সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নও সামনে আনবে।

 

 

নির্বাচনটি মূলত, ফরাসি ভাষাভাষী ভোটারদের কাছে প্রাণের লড়াইয়ে রূপ নেবে। প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয়-ডানপন্থি জোট ‘আভেনির কুইবেক’, লিবারেল পার্টি অব কুইবেক এবং পার্টি কুইবেকোয়া (পিকিউ)। বর্তমানে জনমত জরিপে পিকিউ এগিয়ে আছে। দলটি কুইবেকের স্বাধীনতা সংক্রান্ত তৃতীয় দফা গণভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলে, কানাডায় সাংবিধানিক উত্তেজনা বাড়বে। এটির ওপর দেশটির ভবিষ্যত গতিপথও নির্ভর করতে পারে।

 

 

সূত্র:দ্য কনভারসেশন

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নতুন সংসদের জন্য ১১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা

কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল সিলেটের উদ্যোগে বিশ্ব কিডনি দিবস পালিত

ইসরায়েল থেকে রাষ্ট্রদূত স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করল স্পেন

ক্রীড়ামন্ত্রীর ঘোষণা, ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবে না ইরান

ওয়াশিংটনে টাইটানিক ধাঁচে ট্রাম্প–এপস্টেইন ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্ক

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি পরিবারের ইফতার ও দোয়া মাহফিল সম্পন্ন

শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দক্ষ জাতি গঠন সরকারের অগ্রাধিকার

রাজনীতি এখন সস্তা তামাশায় পরিণত হয়েছে ট্রাম্পের বর্ণবাদী ভিডিওর জবাবে ওবামা

ইতিহাসের সর্বোচ্চ করদাতা হওয়ার পথে মাস্ক জীবদ্দশায় দেবেন ৫০০ বিলিয়ন ডলার

এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি হাকালুকি হাওরে বেড়েছে পরিযায়ী ও জলচর পাখির সংখ্যা

১০

নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট ৩৬ এর বিশেষ নির্বাচন ডায়ানা মোরেনো বিজয়ী

১১

নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে মাতৃভাষা দিবস উদযাপন

১২

১৩

ওয়াশিংটন ডিসি দূতাবাসে মাতৃভাষা দিবস উদযাপন

১৪

নিউইয়র্কের চার এলাকায় চালু হচ্ছে শিশুদের ফ্রি চাইল্ড কেয়ার

১৫

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বাণিজ্য চুক্তি

১৬

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সহায়তা নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু

১৭

ইরানে যুদ্ধে অনীহা, আপত্তি জানাচ্ছেন অনেক মার্কিন সেনা

১৮

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনার প্রভাব: দেশে ডলারের দাম বেড়েছে

১৯

একুশে পদক পেলেন ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি ব্যান্ড দল

২০