১২ মে ২০২৩, ৭:২৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

প্লাস্টিক-পলিথিন থেকে সুরমা নদীকে বাঁচান

দেশের দীর্ঘতম নদীপ্রণালির অন্যতম সুরমা আজ ভালো নেই। উজানে প্রকল্প ও টিপাইমুখ বাঁধ এবং ভাটিতে নদীর প্রবাহে বাধা, জকিগঞ্জের অমলসীদে সুরমার প্রবেশমুখে পলি পরে বিশাল চর জেগেছে। সিলেট নগরীর আশপাশে সুরমা প্লাস্টিক-পলিখিন বর্জ্যে চাপা পড়েছে। ২৩২২ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই দীর্ঘ তিন মাস সিলেট নগরের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ এলাকা পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে তলিয়ে ছিল। অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর প্লাস্টিক দূষণের কারণেই সিলেটে তৈরি হয়েছিল।

নিদারুণ জলাবদ্ধতা। সুরমা খননের দাবি দীর্ঘদিনের। ১৮ কিলোমিটার নদী আপাতত খনন হচ্ছে। সিলেট নগরীর বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে এই খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রায় ৫৩ কোটি টাকা বায়ে দক্ষিণ সুরমার কুচাই হয়েছে।

২১ জানুয়ারি ২০২৩ সিলেট সদরের মোঘলগাঁও ইউনিয়নের চানপুর খেয়াঘাটে সুরমা নদী নব উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। কিন্তু সুরমা খননে বড় প্রতিবন্ধকতা প্লাস্টিক-পলিথিন বর্জ্য। ড্রেজার ও খননযান্তে বারবার প্লাস্টিক ও পলিথিন আটকে যায় এবং যন্ত্র নষ্ট হয়ে যায়। জানিয়েছেন, প্লাস্টিক ও পলিথিনের জন্য কাজ করা যাচ্ছে না। যতক্ষণ ড্রেজারে খনন হয়, তার চেয়ে বেশি সময় যায় ড্রেজার পরিষ্কার করতে। সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নদীতে বিপুল পরিমাণ পলিথিনের স্তর জমায় ২০ মিনিট পরপর মেশিন বন্ধ রেখে পরিষ্কার করে কাজ করতে হচ্ছে। এতে সময়মতো কাজ শেষ করা কঠিন হবে।

জলাভূমিগুলো আজ প্লাস্টিক-পলিথিনের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে? আজ গ্লাস্টিক-পলিথিন দূষণের কারণে সুরমা খনন করা যাচ্ছে না।
নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার কারণেই আজ আমরা করপোরেট পণ্য-মানসিকতায় অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয়েছি প্রাস্টিক-গলিথিনের বিশাল স্তুপ তৈরি করছি নির্বিকারে। আর এই ‘প্লাস্টিক-পলিথিন নদীগুলোকে জখম করছে, নদীপথ আটকে দিচ্ছে, নদীর খননকাজ প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। নদীকে অস্বীকার করে কোনোভাবেই বাংলাদেশকে চিন্তা করা যায় না। কিন্তু তাই ঘটে চলেছে। কখনও ফারাক্কা কখনও টিপাইমুখ নদীর ওপর উন্নয়নের ছুরি চলেছে সব কালেই। উজান থেকে ভাটিতে বয়ে চলা নদীর জটিল গণিতকে
ফালি ফালি করে কাটা হয়েছে।

দেশের একটি নদীও আর শরীর-মনে সুস্থ নেই। অনেক নদীই হারিয়েছে আত্মীয়-পরিজনদের। গড়ে ওঠেনি। নদীকে বিবেচনা করা হয়েছে কারখানার বিষাক্ত বর্জের ভাগাড় হিসেবে। রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত একটি নদী-খুনেরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেনি।

দেশের নদীগুলো আজ ক্ষত-বিক্ষত। প্লাস্টিকের বিরোধী আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংগঠন ‘ব্রেক ফ্রি ফ্রম প্লাস্টিক’ করপোরেট প্লাস্টিক দৃষণবিষয়ক তাদের তৃতীয় সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর! সব খাদ্য-পানীয়-প্রসাধন কোম্পানির মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক দূষণ ঘটছে।

পৃথিবীর ৫৫টি দেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৪টি গ্লাস্টিক নমুনা সংগ্রহ করেন। দেখা গেছে, এগুলো প্রায় সবই কোনো না কোনো কোম্পানির পণ্যের বোতল, মোড়ক ও ধারক। পলিথিন এক জ্যান্ত পুঁজিবাদী পাপ। নয়া উদারবাদী বাণিজ্য ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০০২)-এর ১৫ (১) অনুচ্ছেদের ৪ (ক) ধারায় পলিথিন উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণের জন্য অপরাধীদের সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা ৬ মাসের কারাদণ্ডের বিধান আছে।

মাঝেমধ্যে এ আইন মেনে ভ্রাম্যমাণ আদালত কিছু জরিমানা আর অভিযান চালালেও পলিথিন থামছে না।
নদীকে প্লাস্টিক-পলিখিনমুক্ত রাখতে অবশ্যই এসবের উৎপাদন, ব্যবহার ও বিক্রির ওপর আইনত নিষেধাজ্ঞা জরুরি। তাহলে সুরমা বাঁচবে, বাঁচবে দেশের নদীভূগোল।

উত্তরপূর্ব ভারতের নাগল্যান্ডের পঁটকাই’ পাহাড়ের গভীর অরণ্য থেকে ফোঁটা ফোঁটা জলবিন্দু নিয়ে বরাকের জন্মা। মণিপুরের লোগতাক হুদ থেকেও জল পেয়েছে বরাক। মণিপুর রাজ্যের সেনাপতি জেলার লাইলাই গ্রাম থেকে তামেলং হয়ে চুরাচাঁদপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আসামের বরাক ও কাছাড় উপত্যকায় প্রবেশ করেছে বরাক। টিপাইমুখ অঞ্চল থেকে উচ্চ অববাহিকায় প্রবাহিত হয়েছে নোনে, বাহ এবং তুইভাই নদী। নোনে ও নুৎবাহ্‌ মণিপুরের পাহাড় থেকে এবং মিয়ানমারের পাহাড় থেকে জন্ম নিয়েছে তুইভাই।

টিপাইমুখ থেকে নিন্ন অববাহিকায় প্রবাহিত হয়ে বরাকে মিলিত হয়েছে নারায়ণছড়া, বড়বেকড়া, ছোট বেকড়া, কাংরিংছড়া, জিরি, চিরি, সোনাই, রূকণি, মধুরা, জাটিজ্গা, ঘাঘরা, কাটাখাল, ধলেম্বরী, লঙ্গাই, সিংলার মতো নদীগুলো। এ ছাড়াও বরাক নদীতে মিলিত হয়েছে ৫-১০ ফুট প্রশস্ত অসংখ্য পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়া। বরাক উপত্যকার কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বরাক নদী আসামের করিমগঞ্জ।

সামাজ্যের দুঃসহ ক্ষত হিসেবে পলিথিন এ সভ্যতাকে গলা টিপে ধরছে বারবার। পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে পলিথিন বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার শুরু হয়। পলিথিন গলে না, মেশে না, পচে না। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬ (ক) (সংশোধিত ২০০২) ধারা অনুযায়ী ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা শহরে এবং একই সালের ১ মার্চ বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন।

জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার অমলসীদ এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে প্রবাহিত হয়েছে। উজানে বাঁধ এবং ভাটিতে প্লাস্টিক-পলিখিন সুরমার ওপর সব খবরদারি ও জখম বন্ধ হোক। প্লাস্টিক-পলিথিন বর্জে আমরাই সুরমাকে নিগীড়িত করেছি, এই আঘাত সামলে সুরমা খননের যাবতীয় চ্যালেঞ্জ এখন আমাদেরকেই নিতে হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘বেস্ট অব দ্য ওয়েস্ট ইয়ুথ লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন তাহমিদ চৌধুরী

১

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বারহাম সালিহ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

২

সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে

৩

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসী তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে

৪

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

৫

মেডিকেইডের ওষুধের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের

৬

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মী ভিসায় ১ লাখ ডলারের ফি আরও এক বছর

৭

তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাড়ল সুদের হার

৮

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রিনকার্ডে নতুন পাবলিক চার্জ নিয়ম

৯

গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসায় লাগাম, মার্কিন নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানটি

১০

বিজিবির অভিযানে মাদক-অস্ত্রসহ ৯১৩ কোটি টাকার পণ্য জব্দ, আটক ২৮১

১১

ডেট্রয়েট থেকে আটলান্টিক সিটি, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃত উপস্থিতি

১২

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ডলারের বিকল্প খুঁজছে বিভিন্ন দেশ

১৩

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র

১৪

গ্রিন কার্ড স্পনসরশিপে নতুন নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রে, যাচাই হবে স্পনসরের ক্রেডিট তথ্য

১৫

সৌদি আরবে ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

১৬

ডাকযোগে ভোটের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের উদ্যোগে বাধা

১৭

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ভোটের অভিযোগে ৭ গ্রিন কার্ডধারী গ্রেপ্তার

১৮

ছয় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছাড়ার হার সর্বোচ্চ

১৯

প্রথমবার প্রকাশ্যে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের স্বীকারোক্তি যুক্তরাষ্ট্রের

২০