লিটন এরশাদ
৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রোড ক্র্যাশ নিরসন: শুধু আইন নয়, সকলকেই দায়িত্ব নিতে হবে

 

সড়ক মানুষের চলাচলের পথ, জীবিকার অবলম্বন এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই সড়ক যখন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, পরিবারকে শোকে ডোবায় এবং অসংখ্য মানুষকে স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার মুখে ঠেলে দেয়, তখন সড়ক নিরাপত্তা শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকে না। এটি জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। ঘর থেকে বের হওয়া মানুষটির নিরাপদে ফিরে আসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত ও প্রত্যেক সড়ক ব্যবহারকারীর সম্মিলিত দায়িত্ব।

 

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর শোক, ক্ষোভ, তদন্ত ও আশ্বাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। অথচ কিছুদিন পর একই ঝুঁকি ফিরে আসে। এই চক্র ভাঙতে শুধু দায়ী চালকের শাস্তি যথেষ্ট নয়। সড়কের নকশা, যানবাহনের ফিটনেস, চালকের বিশ্রাম, গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পারাপার ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখতে হবে। নিরাপদ সড়কের প্রস্তুতি শুরু হয় দুর্ঘটনার আগে; দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও তার অংশ।

 

২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলন নিরাপদে চলাচলের অধিকারকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এনেছিল। এরপর প্রণীত সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-তে চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, গতিসীমাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন থাকা ও কার্যকর হওয়া এক নয়। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ বা লাইসেন্সবিহীন চালক, অতিরিক্ত গতি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও দুর্বল নজরদারি এখনো উদ্বেগের কারণ। প্রয়োগের দুর্বলতা কোথায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কী করছে এবং বিচার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে- এসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন।

 

বিদ্যমান আইন প্রয়োজনীয় ভিত্তি হলেও নিরাপত্তার সব দিক সমন্বয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন দরকার। সড়কের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের নিরাপত্তামান, গতি ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন পরিচালনা, চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা, পথচারী ও সাইকেল আরোহীর অধিকার, দুর্ঘটনার তথ্য এবং চিকিৎসাব্যবস্থাকে সমন্বিত কাঠামোয় আনতে হবে। সরকারি সংস্থা, পরিবহন মালিক, পরিচালনাকারী, চালক ও সড়ক ব্যবহারকারীর দায়িত্বও স্পষ্ট করতে হবে।

 

সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এসডিজি ৩.৬-এ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য ছিল। জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা কর্মদশা ২০২১ু২০৩০-এ ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত অন্তত ৫০ শতাংশ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এসডিজি ১১.২ নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও টেকসই পরিবহনব্যবস্থার কথা বলে, বিশেষত নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য। ফলে এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নগর উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গেও যুক্ত উন্নয়ন-অঙ্গীকার।

 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২০ সালে এই কর্মদশা ঘোষণা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের আঞ্চলিক কমিশনগুলোর বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনার মূল বার্তা হলো, সড়ক দুর্ঘটনা অনিবার্য নয়। নিরাপদ নকশা, কার্যকর আইন, নিরাপদ যানবাহন, দায়িত্বশীল চালনা ও দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের জাতীয় আইন, পরিকল্পনা ও বাজেটে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে।

 

পাঁচটি প্রধান ঝুঁকি মোকাবিলায় অগ্রাধিকার জরুরি: অতিরিক্ত গতি, মদ্যপ বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, সিটবেল্ট না বাঁধা এবং শিশুদের উপযুক্ত সুরক্ষাব্যবস্থার অভাব। নিয়মিত তদারকি, সচেতনতা ও সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। হেলমেট মানসম্মত ও সঠিকভাবে বাঁধা, চালক-যাত্রীর সিটবেল্ট ব্যবহার এবং শিশুর বয়স ও আকার অনুযায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তার ধরন ও মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনায় গতিসীমা নির্ধারণ ও প্রয়োগ করতে হবে।

 

সড়ক নিরাপত্তার পাঁচ স্তম্ভ- ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সড়ক ও চলাচল, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর কার্যকর সাড়া- সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। ‘সেফ সিস্টেম’ পদ্ধতির শিক্ষাও একই: মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যু বা গুরুতর আঘাত ডেকে না আনে। তাই সতর্ক আচরণের পাশাপাশি অবকাঠামো, যানবাহন, গতি নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সেবাকেও নিরাপদ করতে হবে।

 

চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের অধিকার এবং কর্মপরিবেশও নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্রামহীন দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রশিক্ষণের অভাব ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ সবাইকে ঝুঁকিতে ফেলে। কাজের সময়, বিশ্রাম, যথাযথ নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মালিক ও পরিচালনাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তদন্তে চালকের ভুলের সঙ্গে গাড়ির অবস্থা, কর্মঘণ্টা ও পরিচালনাগত সিদ্ধান্তও যাচাই করা প্রয়োজন।

 

সড়কের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণে পথচারীর নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পেতে হবে। দখলমুক্ত ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, সাইকেল চলাচলের সুযোগ, সড়কবাতি, চিহ্ন এবং রেলক্রসিংয়ের সতর্কতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাজার ও জনবসতির কাছে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নতুন সড়ক ও বড় সংস্কারে নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং নিয়মিত পরিদর্শন প্রয়োজন। একই স্থানে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায়িত্ব কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।

 

নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি সম্ভব নয়। দুর্ঘটনার স্থান, সময়, কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সমন্বিতভাবে সংগ্রহ করতে হবে। পুলিশ, বিআরটিএ, হাসপাতাল, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকারের তথ্যের সমন্বয়ে দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিসম্পন্ন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা ডাটা সেল গঠন জরুরি। তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও নিয়মিত প্রকাশের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত এবং অগ্রগতি পরিমাপ করা সম্ভব হবে।

 

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে চতুর্থ গ্লোবাল মিনিস্টেরিয়াল কনফারেন্স অন রোড সেফটিতে বাংলাদেশ ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় দুর্ঘটনা-তথ্যব্যবস্থা, গতিসীমা কার্যকরের নির্দেশিকা এবং মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের নির্দেশিকা তৈরির কথা জানায়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাত অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য তুলে ধরা হয়।

 

এখন প্রয়োজন এসব প্রতিশ্রুতিকে সময়সীমাবদ্ধ কাজে রূপ দেওয়া। খসড়া আইনের অগ্রগতি, দায়িত্ব বণ্টন, বাজেট ও জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রকাশ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের পাশাপাশি চালক-শ্রমিক, মালিক, যাত্রী, পথচারী, সাইকেল আরোহী, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে। প্রতিবছর প্রাণহানি, গুরুতর আঘাত, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সংস্কার, সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার ও জরুরি সেবার অগ্রগতি প্রকাশ এবং ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।

 

বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা নির্ণায়ক। গোষ্ঠীর চাপ বা প্রশাসনিক উদাসীনতায় আইন প্রয়োগ থেমে গেলে চলবে না। পর্যাপ্ত বাজেট, দক্ষ জনবল ও ধারাবাহিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, জরুরি যোগাযোগ ও প্রস্তুত হাসপাতাল প্রয়োজন। আর্থিক বা প্রশাসনিক কারণে চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়া চলবে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পাওয়ার পথও সহজ করতে হবে।

 

প্রতিটি প্রাণহানির পেছনে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি। নিরাপদ সড়ককে তাই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ আইন, কার্যকর প্রয়োগ, নির্ভরযোগ্য তথ্য, নিরাপদ অবকাঠামো, দায়িত্বশীল পরিবহনব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা ও জবাবদিহি একসঙ্গে এগোলেই পরিবর্তন সম্ভব। ২০২৭ সালের আইন প্রণয়ন ও ২০৩০ সালের প্রাণহানি হ্রাসের অঙ্গীকার পরিমাপযোগ্য কাজে প্রতিফলিত হোক।

 

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সহজে পালনীয় নবীজির ২০টি সুন্নত

১

নিত্যজীবনের ১০টি অবহেলিত সুন্নত

২

মার্কিনকর্মীদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের

৩

বাড়বে শীত: আগাম প্রস্তুতিই নিরাপত্তার প্রধান শর্ত

৪

রোড ক্র্যাশ নিরসন: শুধু আইন নয়, সকলকেই দায়িত্ব নিতে হবে

৫

মিডটার্ম ইলেকশনে ব্যালটে নেই ট্রাম্প, তবু পরীক্ষাটা তাঁরই

৬

আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন: আইরিন খান

৭

মিশিগানের মূলধারার চার রাজনীতিকের মুখোমুখি বাংলা সংবাদ পত্রিকা

৮

কিশোরীকে জিম্মি ও ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্তের গ্রেপ্তার চেয়ে মানববন্ধন

৯

‘ড্রাইভিং লাইসেন্সের সঙ্গে অভিবাসন অবস্থার সম্পর্ক থাকা উচিত নয়’

১০

হোয়াটসঅ্যাপ প্রতারণা ও ব্যাংক থেকে অর্থ চুরি ঠেকাতে কী করবেন? জবাব দিলেন এলি সাভিট

১১

‘বাংলা ভাষায় ব্যালট পাওয়ার সুযোগ শুধু হ্যামট্রামিকে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়’

১২

বৈধ অভিবাসীদের বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় রাখা উচিত নয়

১৩

বাইন্যান্সে সাইবার হামলার ধাক্কা, এক দিনেই নিট উত্তোলন ৩৬৪ কোটি ডলার

১৪

যুক্তরাষ্ট্রে আগামীকাল মধ্যবর্তী নির্বাচন, আগাম ভোট ৫ কোটি ৪০ লাখের বেশি

১৫

মিশিগানে বিয়ানীবাজার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতির নতুন কমিটি ঘোষণা

১৬

ডিভি-২০২৭ লটারি নিয়ে অনিশ্চয়তা, সরকারের পক্ষে আপিল আদালতের আদেশ

১৭

নিউইয়র্কে বেকারভাতা সেবা সাময়িক বন্ধ, ২ নভেম্বরের পর ৯ থেকে ১২ দিন আবেদন বন্ধ

১৮

ইবি-৫ কর্মসূচিতে বাড়ছে ফি, গ্রীন কার্ড পেতে খরচ দ্বিগুণের বেশি

১৯

মিশিগানে ২২ ক্লাব ও ককাসের যৌথ উদ্যোগে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সমাবেশ

২০