যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মিশিগানের ডিয়ারবর্নে নিউ মিশিগান মিডিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ প্রার্থী গোলটেবিল সাক্ষাৎকার। স্থানীয় দ্য আরব আমেরিকান নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত পৃথক আলোচনায় অংশ নেন মার্কিন সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাঈদ, মিশিগানের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ও সেক্রেটারি অব স্টেট পদপ্রার্থী গারলিন গিলক্রিস্ট, সেক্রেটারি অব স্টেট পদপ্রার্থী অ্যান্থনি ফোরলিনি এবং অ্যাটর্নি জেনারেল পদপ্রার্থী এলি সাভিট। সাক্ষাৎকারে উপস্থিত ছিলেন নিউ মিশিগান মিডিয়ার পরিচালক ড. হায়গ ওশাগান, দ্য আরব আমেরিকান নিউজের প্রকাশক ওসামা সিবলানি, লাতিনো প্রেসের প্রকাশক ইলিয়াস গুতিয়েরেজ, কোরিয়ান উইকলির প্রকাশক ট্যাক ইয়াং কিম এবং যমুনা টেলিভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও বাংলা সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ইকবাল ফেরদৌস।
মিশিগানের বিভিন্ন জাতিগত ও ভাষাভিত্তিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ কমিউনিটির সমস্যা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশা তুলে ধরেন। এসব আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেইডের নতুন কাজের শর্ত, ফ্যামিলি ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ অপেক্ষা, অভিবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, বাংলা ভাষায় ব্যালট, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অনলাইন প্রতারণা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার। যমুনা টেলিভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও বাংলা সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ইকবাল ফেরদৌস প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অভিবাসী কমিউনিটির দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেন। জবাবে প্রার্থীরা নিজেদের নীতিগত অবস্থান, নির্বাচনী পরিকল্পনা এবং দায়িত্ব পেলে সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথা জানান।
মার্কিন সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাঈদের কাছে ইকবাল ফেরদৌস জানতে চান, ২০২৭ সাল থেকে মেডিকেইডের নতুন কাজের শর্ত কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে বয়স্ক, অসুস্থ ও কাজ করতে অক্ষম সুবিধাভোগীদের স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষায় তিনি কী করবেন। প্রশ্নে তুলে ধরা হয়, অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি ও অন্যান্য অভিবাসী পরিবারের সদস্য মেডিকেইডের ওপর নির্ভরশীল। নতুন নিয়ম নিয়ে তাঁদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিমা হারানোর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জবাবে আবদুল এল-সাঈদ বলেন, নতুন আইনের প্রভাব অনেক মানুষের জীবনে ‘ভূমিকম্পের মতো’ হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, বিলিয়নিয়ারদের করছাড় দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, শুধু মেডিকেইড সুবিধাভোগীরাই নন, পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও সংকটে পড়তে পারে।
এল-সাঈদ বলেন, আইনটি বাতিল করা প্রয়োজন হলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতার কারণে তা কঠিন হবে। তবে রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের সঙ্গে কাজ করে এবং বিদ্যমান বিধিবিধানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানোর সম্ভাব্য সব পথ খতিয়ে দেখতে চান তিনি। একই সাক্ষাৎকারে ইকবাল ফেরদৌস বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানতে চান, অনেক পরিবার ১৫, ১৬ কিংবা ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এই প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন?
জবাবে এল-সাঈদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট ও দক্ষ অভিবাসনব্যবস্থা প্রয়োজন। বর্তমানে নীতির ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে অনেক মানুষ আইনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তিনি নিরাপদ সীমান্তের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করার পাশাপাশি বৈধ অভিবাসীদের জন্য সুস্পষ্ট আইনি পথ, পর্যাপ্ত আদালত এবং বিচারিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। এল-সাঈদ বলেন, কাউকে প্রথমে বৈধ বা সুরক্ষিত মর্যাদা দিয়ে পরে তা কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। অভিবাসন আইন প্রয়োগ করতে হবে সংবিধানের সুরক্ষা মেনে। অভিবাসনব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, অতীতে একটি অভিবাসন সংস্কার প্রস্তাব পাস হওয়ার পথে ডোনাল্ড ট্রাম্প বাধা দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, মিশিগানের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ও সেক্রেটারি অব স্টেট পদপ্রার্থী গারলিন গিলক্রিস্টের সঙ্গে আলোচনায় সরকারি সেবায় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, বাংলা ও আরবিসহ বিভিন্ন ভাষায় ব্যালটের সুযোগ এবং অভিবাসীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। আলোচনায় উঠে আসে, হ্যামট্রামিকের বাইরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাভাষী ভোটার বসবাস করেন। একইভাবে ডিয়ারবর্নের বাইরেও রয়েছেন আরবিভাষী ভোটার। তাঁদের জন্য নিজ ভাষায় ভোটদানের সুবিধা সম্প্রসারণ করা উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে গিলক্রিস্ট সমর্থন জানান।
তিনি বলেন, একজন যোগ্য ভোটার নিজের বোঝার ভাষায় ব্যালট পড়তে না পারলে তা নাগরিক অধিকার প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলা, আরবি ও অন্যান্য ভাষার চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা সম্প্রসারণ এবং সেক্রেটারি অব স্টেট কার্যালয়ের ভাষা সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।অভিবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনসংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও গিলক্রিস্ট গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফেডারেল সরকার কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে চান না।
অনিবন্ধিত অভিবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ‘ড্রাইভ সেফ’ উদ্যোগের প্রতিও সমর্থন জানান গিলক্রিস্ট। তবে আইনটি কার্যকর করতে আইনসভার ভূমিকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এদিকে, সেক্রেটারি অব স্টেট পদপ্রার্থী অ্যান্থনি ফোরলিনির সঙ্গে আলোচনায় অভিবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভোটার নিবন্ধনে নাগরিকত্ব যাচাই, বহুভাষিক সরকারি সেবা এবং ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো উঠে আসে। অভিবাসন অবস্থা নির্বিশেষে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ফোরলিনি বলেন, ড্রাইভিং লাইসেন্সের মূল উদ্দেশ্য একজন ব্যক্তি নিরাপদে গাড়ি চালাতে পারেন কি না, তা নিশ্চিত করা।
নিজের অভিবাসী বাবার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু মার্কিন নাগরিক না হওয়ার কারণে কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়—এমন ধারণা অযৌক্তিক। তাঁর মতে, সেক্রেটারি অব স্টেট কার্যালয়ের দায়িত্ব এবং ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের দায়িত্ব আলাদা হওয়া প্রয়োজন। ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ফোরলিনি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পক্ষে মত দেন। তবে প্রতিবার ভোট দিতে গিয়ে নাগরিকত্বের কাগজপত্র দেখানোর পরিবর্তে নিবন্ধনের সময় যাচাই করা তথ্য ভোটার রেকর্ডে সংরক্ষণের প্রস্তাব করেন তিনি।
বহুভাষিক ভোটার সহায়তার প্রতিও সমর্থন জানান ফোরলিনি। তবে অনুবাদ করা ব্যালটে মূল ইংরেজি বক্তব্যের অর্থ অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অন্যদিকে, মিশিগানের অ্যাটর্নি জেনারেল পদপ্রার্থী এলি সাভিটের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রবাসী কমিউনিটির অনলাইন প্রতারণা, হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্যাম, ফোন হ্যাকিং এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরির মতো সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়। এসব অপরাধ প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, এমন প্রশ্নের জবাবে সাভিট বলেন, প্রতারণা ঠেকানোর প্রথম ধাপ সচেতনতা। মানুষকে জানতে হবে কী ধরনের প্রতারণা হচ্ছে, কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে। তিনি জানান, ওয়াশটেনাও কাউন্টিতে অপরাধ ও প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের জন্য সাতটি ভাষায় তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত হলে এ ধরনের বহুভাষিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম রাজ্যজুড়ে সম্প্রসারণ করতে চান তিনি।
এলি সাভিট বলেন, প্রতারক মিশিগানে অবস্থান করলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী দেওয়ানি কিংবা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিদেশ থেকে পরিচালিত প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক সচেতনতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতারণা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ও ভোক্তা সুরক্ষা আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন সাভিট। সংখ্যালঘু গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষায় প্রতারণার সতর্কবার্তা প্রচারের উদ্যোগকেও স্বাগত জানান তিনি।
এলি সাভিটের সঙ্গে আলোচনায় অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, শ্রম শোষণ এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে আইসের সহযোগিতার বিষয়ও উঠে আসে। সাভিট বলেন, অভিবাসন অবস্থার সুযোগ নিয়ে কাউকে ভয় দেখানো, অর্থ আদায় কিংবা জোরপূর্বক কাজ করানো হলে তা অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। প্রযোজ্য আইনের আওতায় এসব ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় পুলিশ সক্রিয়ভাবে আইসের সঙ্গে সহযোগিতা করলে অনেক অভিবাসী অপরাধের শিকার হয়েও অভিযোগ জানাতে ভয় পান। এতে জননিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের আইনগত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন তিনি।
চার প্রার্থীর সাক্ষাৎকারে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ, নাগরিক অধিকার এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আবদুল এল-সাঈদ স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনব্যবস্থার সংস্কার, গারলিন গিলক্রিস্ট ভোটাধিকার ও ভাষাগত সুবিধা সম্প্রসারণ, অ্যান্থনি ফোরলিনি নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও সরকারি সেবার দক্ষতা এবং এলি সাভিট নাগরিক অধিকার ও প্রতারণা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেন। নিউ মিশিগান মিডিয়ার এই গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে বাংলা সংবাদ প্রবাসী বাংলাদেশিদের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগগুলো সরাসরি মিশিগানের মূলধারার রাজনীতিকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পায়। নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের এসব বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি ভোটারদের তাঁদের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে সহায়ক হবে।
মন্তব্য করুন