যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডিয়ারবর্ন ও হ্যামট্রাম্যাক— এই দুই শহর বহুদিন ধরেই মুসলিম অভিবাসীদের শান্তিপূর্ণ বসবাস, বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থান এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সম্প্রতি কোরআন পোড়ানোর ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু মুসলিম সমাজকেই নয়, পুরো আমেরিকান গণতন্ত্র ও সামাজিক মূল্যবোধকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কখনোই ঘৃণা ছড়ানো, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া কিংবা সমাজে বিভাজন তৈরির অস্ত্র হতে পারে না। পবিত্র কোরআন পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড নিছক প্রতিবাদ নয়; এটি একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির বিপজ্জনক কৌশল।
তবে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আশার আলোও দেখা গেছে। মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় খ্রিস্টান, ইহুদি এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী নাগরিকরা। তারা রাস্তায় নেমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন— আমেরিকার শক্তি ঘৃণায় নয়, বরং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে। এই সংহতি প্রমাণ করে, উগ্রবাদীরা কখনোই পুরো সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না।
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন, ব্যারিকেড স্থাপন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা বড় ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্বই হলো সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বর্তমান বিশ্বে ইসলামভীতি, বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ নানা দেশে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক উগ্রতার কারণে ঘৃণার ভাষা অনেক সময় স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চাইছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, ঘৃণা কখনো সমাজকে নিরাপদ বা উন্নত করতে পারেনি। বরং সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপই টেকসই শান্তির ভিত্তি গড়ে তোলে।
ডিয়ারবর্ন ও হ্যামট্রাম্যাকের মানুষ যেভাবে একসাথে দাঁড়িয়ে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সেটিই হতে পারে আগামী দিনের বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা— ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতা এক ও অবিচ্ছেদ্য।
মন্তব্য করুন