যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মিশিগানের ডিয়ারবর্নে নিউ মিশিগান মিডিয়ার (New Michigan Media) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ প্রার্থী গোলটেবিল সাক্ষাৎকার। স্থানীয় দ্য আরব আমেরিকান নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন মিশিগানের সেক্রেটারি অব স্টেট পদপ্রার্থী অ্যান্থনি ফোরলিনি। সাক্ষাৎকারে উপস্থিত ছিলেন নিউ মিশিগান মিডিয়ার পরিচালক ড. হায়গ ওশাগান, দ্য আরব আমেরিকান নিউজের প্রকাশক ওসামা সিবলানি, লাতিনো প্রেসের প্রকাশক ইলিয়াস গুতিয়েরেজ, কোরিয়ান উইকলির প্রকাশক ট্যাক ইয়াং কিম এবং যমুনা টেলিভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও বাংলা সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ইকবাল ফেরদৌস।
ম্যাকম্ব কাউন্টির ক্লার্ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ফোরলিনি এর আগে ছয় বছর মিশিগানের আইনপ্রণেতা ছিলেন। তিনি জানান, আইনসভায় দায়িত্ব পালনকালে কোনো ভোটে অনুপস্থিত ছিলেন না। অভিবাসী পরিবারের সন্তান ফোরলিনি নিজেকে ইতালীয়-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। আলোচনায় উঠে আসে নির্বাচনী অর্থায়নে গোপন অর্থের প্রভাব, ভোটার নিবন্ধনে নাগরিকত্ব যাচাই, অভিবাসীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, বহুভাষিক ব্যালট, জুরি ডিউটির নোটিশ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা। ফোরলিনি বলেন, নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্ভুল ভোটার তালিকা এবং সরকারি কার্যক্রমে জবাবদিহি প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ভুলের কারণে অভিবাসী কিংবা যোগ্য ভোটারদের অযথা সন্দেহ ও হয়রানির শিকার হওয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন: রাজনীতিতে করপোরেট অর্থ ও গোপন নির্বাচনী অনুদানের প্রভাব কমাতে কী করবেন?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: করপোরেট অর্থ ও ডার্ক মানি নির্বাচনে সাধারণ মানুষের প্রভাব কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ভোটার মনে করেন, তাঁদের মতামতের চেয়ে অর্থশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেশি। ২০১৬ সালে আমি মিশিগান আইনসভায় গোপন রাজনৈতিক অর্থায়ন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছিলাম। কোনো প্রার্থীকে কে অর্থ দিচ্ছেন, সেটি জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাওয়া উচিত, বাইরের অর্থের প্রভাব নয়।
প্রশ্ন: নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: রাজনীতি কিংবা সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। আমি একজন অভিবাসীর সন্তান। আমার বাবা ইতালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন এবং নির্মাণশিল্পে কঠোর পরিশ্রম করতেন। তাঁর উচ্চারণ কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয় কখনো তাঁর যোগ্যতা নির্ধারণ করেনি। আমি নিজে ক্যাথলিক হলেও সব ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষকে সম্মান করি। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখা উচিত নয়।
প্রশ্ন: ভোটার নিবন্ধনে মার্কিন নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোট দিতে হলে অবশ্যই নাগরিক হতে হবে। তবে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দায়িত্ব সরকারকে সঠিকভাবে পালন করতে হবে। আমি চাই নিবন্ধনের সময় নাগরিকত্ব যাচাই করে তা ভোটার তালিকায় সংরক্ষণ করা হোক। প্রতিবার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নাগরিকত্বের কাগজপত্র দেখানোর কথা বলছি না। সবার পাসপোর্ট নেই। তাই জন্মসনদ কিংবা ন্যাচারালাইজেশন সার্টিফিকেটের মতো গ্রহণযোগ্য বিকল্প থাকতে হবে।
প্রশ্ন: ম্যাকম্ব কাউন্টির ভোটার তালিকায় অ–মার্কিন নাগরিকদের নাম কীভাবে শনাক্ত করেছিলেন?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: জুরি ডিউটির তালিকা পর্যালোচনার সময় কিছু ব্যক্তি জানান, তাঁরা মার্কিন নাগরিক নন, গ্রিনকার্ডধারী। এরপর তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করি। বিষয়টি রাজ্য কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পর্যালোচনার অনুরোধ করেছি। আমি তাঁদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করিনি। সরকারি তথ্যভান্ডারের ভুলের কারণে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন সমস্যায় না পড়েন, সেটিই আমার লক্ষ্য।
প্রশ্ন: ফেডারেল সরকার মিশিগানের ভোটারদের পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিগত তথ্য চাইলে কী করবেন?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: মিশিগানের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব মিশিগানের। ফেডারেল সরকারের কাছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য থাকলে সেটি রাজ্যকে দেওয়া উচিত। সব তথ্য সরাসরি হস্তান্তরের পরিবর্তে অনুরোধের উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে চাই। রাজ্য নিজস্ব তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে ভোটার তালিকা পর্যালোচনা করবে। এতে নির্বাচনব্যবস্থার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রশ্ন: বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় ভোটার তথ্য ও অনুবাদ করা ব্যালটের সুযোগ বাড়াবেন কি?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: আমি বহুভাষিক ভোটার সহায়তা সমর্থন করি। ম্যাকম্ব কাউন্টিতে ভাষাগত সমস্যায় পড়লে প্রত্যয়িত ভাষা সহায়তাকারীর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অনুবাদ করা ব্যালটে ইংরেজি সংস্করণের অর্থ যথাযথভাবে বজায় রাখতে হবে। শব্দের সামান্য পরিবর্তনেও অর্থ বদলে যেতে পারে। অনুমোদিত ও প্রত্যয়িত অনুবাদকদের মাধ্যমে কাজটি করা হলে সমস্যা কমবে। ভোটদান যেন কারও কাছে ভীতিকর মনে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে চাই।
প্রশ্ন: মার্কিন নাগরিক নন, এমন অভিবাসীরা জুরি ডিউটির নোটিশ পেলে কী করবেন?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: এটি সরকারের ব্যর্থতা। যাঁরা জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য নন, তাঁদের নাম তালিকায় থাকা উচিত নয়। এ ধরনের নোটিশ পেয়ে নতুন অভিবাসীরা ভয় পেতে পারেন। তাঁদের মনে হতে পারে, তাঁরা বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। সরকারি নথি নির্ভুল রাখলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। প্রশাসনিক ভুলের কারণে কাউকে অযথা উদ্বেগে রাখা উচিত নয়।
প্রশ্ন: অভিবাসন অবস্থা নির্বিশেষে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ সমর্থন করেন কি?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: ড্রাইভিং লাইসেন্সের উদ্দেশ্য হলো একজন ব্যক্তি নিরাপদে গাড়ি চালাতে পারেন কি না, তা নিশ্চিত করা। আমার বাবা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক না হয়েও এখানে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। শুধু নাগরিক না হওয়ার কারণে তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া উচিত নয়—এমন ধারণা অযৌক্তিক। সেক্রেটারি অব স্টেটের কার্যালয় এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের দায়িত্ব আলাদা। ড্রাইভিং লাইসেন্সকে অভিবাসনসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা উচিত নয়।
প্রশ্ন: সেক্রেটারি অব স্টেট কার্যালয়ে বহুভাষিক কর্মী নিয়োগ ও তাঁদের ধরে রাখতে কী করবেন?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: ভালো কর্মীদের উপযুক্ত বেতন ও কর্মপরিবেশ দিতে হবে। ম্যাকম্ব কাউন্টি ক্লার্কের কার্যালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি ও পদমর্যাদা সংশোধনে কাজ করেছি। অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বহুভাষিক কর্মীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরবি কিংবা অন্যান্য ভাষায় কথা বলতে পারা কর্মীরা অনেক মানুষের সরকারি সেবা পাওয়া সহজ করেন। নির্বাচিত হলে বহুভাষিক কর্মী নিয়োগ এবং তাঁদের ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে চাই।
প্রশ্ন: সরকারি সেবার মান ও কাজের অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন কি?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: অবশ্যই। আমার বর্তমান কার্যালয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমের হিসাব রাখা হয়। আমাদের গড় অপেক্ষার সময় চার মিনিটের কম এবং ৯৮ শতাংশ ফোনকলের উত্তর দেওয়া হয়। আইনপ্রণেতা থাকাকালে কার্যালয়ের ব্যয়ের তথ্যও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছি। জনগণের জানার অধিকার রয়েছে সরকারি কার্যালয় কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কাজের ফলাফল প্রকাশ করতে চাই।
প্রশ্ন: সেক্রেটারি অব স্টেট নির্বাচিত হলে প্রথমে কোন বিষয়গুলো পরিবর্তন করবেন?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: প্রথমত, নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য আরও স্বচ্ছ করতে চাই। মানুষের প্রশ্নের উত্তর না পেলে সন্দেহ তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, সরকারি সেবার গতি বাড়াতে হবে। ফোনের উত্তর দেওয়া, অপেক্ষার সময় কমানো এবং কাগজপত্র পূরণে সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। ম্যাকম্ব কাউন্টিতে বিদেশি নাগরিকদের কাগজপত্র পূরণে আলাদা সহায়তার ব্যবস্থা করেছি। রাজ্য পর্যায়েও এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগ নিতে চাই।
প্রশ্ন: গভর্নর ও সেক্রেটারি অব স্টেট ভিন্ন রাজনৈতিক দলের হলে কীভাবে কাজ করবেন?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেই সংঘাত হতে হবে, এমন নয়। আমি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। কোনো রিপাবলিকানের প্রস্তাব ভুল হলে সমর্থন করব না। আবার কোনো ডেমোক্র্যাট ভালো প্রস্তাব দিলে সেটি সমর্থন করব। আমার কাছে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের কল্যাণ এবং নির্ভরযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: নির্বাচিত হলে মিশিগানের বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতি আপনার অঙ্গীকার কী?
অ্যান্থনি ফোরলিনি: আমি প্রতিটি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। সরকারি দায়িত্বকে শুধু চাকরি নয়, জনসেবার সুযোগ হিসেবে দেখি। আমার বাবা আমাকে কঠোর পরিশ্রমের শিক্ষা দিয়েছেন। আইনসভায় ছয় বছরে কোনো ভোটে অনুপস্থিত ছিলাম না। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। আমি চাই সরকার সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করুক এবং কাউকে অন্যায়ভাবে সন্দেহ বা বৈষম্যের শিকার হতে না হয়। সাক্ষাৎকারজুড়ে অ্যান্থনি ফোরলিনি নির্বাচনী স্বচ্ছতা, নির্ভুল ভোটার তালিকা, বহুভাষিক সরকারি সেবা এবং অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্য দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন। ড্রাইভিং লাইসেন্সকে অভিবাসন অবস্থার পরিবর্তে নিরাপদে গাড়ি চালানোর যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত রাখার পক্ষে মত দেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি কার্যক্রমে জবাবদিহি, দ্রুত সেবা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
মন্তব্য করুন