৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো পদে প্রার্থী হচ্ছেন না। তবু নির্বাচনের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনিই। কারণ, এই ভোট নির্ধারণ করবে তাঁর মেয়াদের শেষ দুই বছরে হোয়াইট হাউস কতটা নির্বিঘ্নে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং কংগ্রেস কতটা শক্তভাবে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। ফলে এবারের নির্বাচন একই সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ ও ট্রাম্পের শাসনের রাজনৈতিক মূল্যায়ন।
প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন, সিনেটের একাংশ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে ভোট হয়। প্রেসিডেন্ট অপরিবর্তিত থাকলেও তাঁর কাজের পরিবেশ আমূল বদলে যেতে পারে। বিরোধীরা কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে আইন প্রণয়ন, অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দর-কষাকষি বাড়বে। তখন আপস করার সামর্থ্যও হয়ে উঠবে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের পরীক্ষা।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা পেয়েছিল ২২০টি, ডেমোক্র্যাটরা ২১৫টি। সেই ফলের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের নিট তিনটি আসন বাড়লেই নিয়ন্ত্রণ বদলাবে। এই সরু ব্যবধান নির্বাচনের উত্তেজনা বাড়িয়েছে। কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকায় সামান্য ভোটের পরিবর্তনই ওয়াশিংটনের ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। জাতীয় প্রচারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটার উপস্থিতি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিনেটের হিসাব আরও কঠিন। এবার ভোট হবে ৩৫টি আসনে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের পক্ষে ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যসহ অপর পক্ষে ৪৭টি আসন রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ পেতে নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। দুই পক্ষ ৫০-৫০ হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নির্ণায়ক ভোট রিপাবলিকানদের সুবিধা দেবে। বিচারপতি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মনোনয়ন অনুমোদনে সিনেটের ভূমিকা থাকায় এই কক্ষের ফল দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ফেলবে।
ডেমোক্র্যাটরা একটি কক্ষ পেলেই নিজেদের কর্মসূচি কার্যকর করতে পারবে না। তবে ট্রাম্পের উদ্যোগ আটকে দেওয়া এবং শুনানি, নথি তলব ও তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষ ধরে রাখলে প্রেসিডেন্ট তাঁর নীতিগুলো এগিয়ে নেওয়ার অনুকূল পরিবেশ পাবেন। অর্থাৎ ভোটারদের সামনে প্রশ্নটি শুধু দল নির্বাচনের নয় বরং একই দলের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিও।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ট্রাম্পবিরোধী অসন্তোষকে ভোটে রূপ দিতে হবে এবং বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তুলে ধরতে হবে। রিপাবলিকানদের বোঝাতে হবে, কংগ্রেসে তাদের নিয়ন্ত্রণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটাবে। অর্থনীতি নিয়ে ভোটারের উদ্বেগকে দলীয় স্লোগান দিয়ে ঢেকে রাখা কঠিন। সংসারের ব্যয়, আয় ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত প্রচারের প্রতিশ্রুতি যাচাইয়ের মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াশিংটনের বাইরেও এই নির্বাচনের তাৎপর্য গভীর। ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর এবং রাজ্য আইনসভার ৬ হাজার ১৩৯টি আসনে ভোট হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় কর ও জননিরাপত্তার মতো বিষয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। ফলে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় রাজ্যপর্যায়ের ফল আড়ালে পড়লেও নাগরিক জীবনে তার প্রভাব কম নয়। এখান থেকেই ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগও তৈরি হয়।
নির্বাচনের আরেকটি লক্ষণীয় দিক বিপুল বিজ্ঞাপন ব্যয়। অ্যাডইমপ্যাক্টের পূর্বাভাসে, ২০২৫ু২৬ নির্বাচনী চক্রে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে ব্যয় হতে পারে ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতার তীব্রতা বোঝায়। পাশাপাশি প্রশ্ন তোলে, প্রচারের প্রবল শব্দের মধ্যে নীতির আলোচনা কতটা জায়গা পাচ্ছে। ভোটারের প্রয়োজন প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সঙ্গে নিজেদের পরিকল্পনার স্পষ্ট ব্যাখ্যাও।
শেষ পর্যন্ত ৩ নভেম্বরের রায় ট্রাম্পের মেয়াদ বদলাবে না, বদলে দেবে তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগের রাজনৈতিক শর্ত। রিপাবলিকানদের জয় তাঁর কর্মসূচিতে গতি দিতে পারে আর ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য বাড়াতে পারে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি। তবে বিভক্ত সরকার মানেই অচলাবস্থা নয়, আবার একদলীয় নিয়ন্ত্রণ মানেই কার্যকর শাসনও নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনস্বার্থে কতটা দায়িত্বশীল হবেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যালটে ট্রাম্পের নাম অনুপস্থিত থাকলেও ভোটাররা মূলত ঠিক করবেন, তাঁর হাতে আগামী দুই বছরের জন্য কতটা রাজনৈতিক অবকাশ তাঁরা দিতে প্রস্তুত।
মন্তব্য করুন