ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী কারাকাসসহ দেশের একাধিক অঙ্গরাজ্যে বহু ভবন, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৬৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৯৭১ জন। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যের অনেক আহত ব্যক্তি এখনও প্রাথমিক হিসাবের বাইরে থাকায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে রাজধানী কারাকাসের কাছাকাছি ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৩ দশমিক ২ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি প্রায় ১০০ মিলিয়ন টন টিএনটি বিস্ফোরণের সমপরিমাণ শক্তি নির্গত করেছে।
শক্তিশালী কম্পনে রাজধানী কারাকাস ছাড়াও মিরান্ডা, লা গুয়াইরা, আরাগুয়া, কারাবোবো ও ফ্যালকন অঙ্গরাজ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারাকাস, মিরান্ডা ও লা গুয়াইরা অঞ্চল। বহু বহুতল ভবন ধসে পড়েছে, বিভিন্ন সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ৫০০–এর বেশি জরুরি কর্মী কাজ করছেন। দুর্গম উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এখনও উদ্ধারকারী দল পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। ফলে সেসব এলাকায় অনুসন্ধান শুরু হলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের পর আতঙ্কে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গা ও সড়কে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই প্রতিবেশী ও পোষা প্রাণীদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। বেঁচে ফেরা বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রথম কম্পনের পর মেঝে ঢেউয়ের মতো দুলছিল, আর দ্বিতীয় ও আরও শক্তিশালী কম্পনটি যেন পায়ের নিচ দিয়ে দ্রুতগতির একটি ট্রেন ছুটে যাওয়ার মতো অনুভূত হয়েছিল।
এদিকে ভূমিকম্পের পর থেকে ২০টির বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন ৩ থেকে ৫ মাত্রার আফটারশক অব্যাহত থাকতে পারে। এ পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ত্যাগের জন্য বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, এটি দেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। তিনি জনগণকে শান্ত থাকার পাশাপাশি উদ্ধারকাজে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রাজিল, পানামা, ইকুয়েডর, এল সালভাদরসহ কয়েকটি দেশ। এসব দেশ মানবিক সহায়তা, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ। যদিও মেক্সিকো, চিলি ও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের মতো ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে না থাকায় সেখানে এ ধরনের বড় মাত্রার ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে কম ঘটে।
মন্তব্য করুন