মাহবুব হোসাইন​
৩১ মার্চ ২০২৬, ২:৪৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

প্রবীণদের একাকিত্ব ভাঙছে কমিউনিটি উদ্যোগ ডেট্রয়েটের ব্রাইটমোর পাড়ায় নতুন করে গড়ে উঠছে সামাজিক সংযোগ

ডেট্রয়েটের নর্থওয়েস্ট অংশের ব্রাইটমোর পাড়ায় ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে ফাঁকা জমি আর নীরব রাস্তা। একসময় এখানে ছিল ব্যস্ত পরিবার, শিশুদের কোলাহল, প্রতিবেশীদের আড্ডা। সময়ের সাথে সাথে অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। আর যারা থেকে গেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হচ্ছেন প্রবীণ বাসিন্দারা—যাদের অনেকেই এখন একা থাকেন।

 

 

 

এই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি বাস্তবতা—একাকিত্ব। অনেক প্রবীণ মানুষ দিনের পর দিন কাউকে না দেখে, কারো সঙ্গে কথা না বলে সময় কাটান। পরিবারের সদস্যরা অন্য শহরে বা রাজ্যে চলে গেছেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে আগের মতো সম্পর্ক নেই, আর শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাইরে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকের জীবন ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে নিজের ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে। কিন্তু এই নীরবতার মধ্যেও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক নতুন গল্প—সংযোগের, সহমর্মিতার এবং কমিউনিটির শক্তির গল্প।

 

 

 

ব্রাইটমোর এলাকায় স্থানীয় একটি সংগঠন, ব্রাইটমোর এলায়েন্স, দীর্ঘদিন ধরে বাসিন্দাদের সঙ্গে কাজ করে পাড়াটিকে আবার প্রাণবন্ত করে তোলার চেষ্টা করছে। তাদের বিভিন্ন কমিউনিটি কার্যক্রমের মধ্যে প্রবীণদের জন্য সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই সংগঠনটি বুঝতে পেরেছে, একটি পাড়াকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়—মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করাও সমান জরুরি। আর সেই কারণেই তারা প্রবীণদের জন্য নিয়মিত সামাজিক কার্যক্রম, আড্ডা এবং কমিউনিটি মিটিংয়ের ব্যবস্থা করছে।

 

 

 

 

 

পাড়ার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সপ্তাহে কয়েকদিন প্রবীণদের ছোট ছোট আড্ডা, খাবার ভাগাভাগি, এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এখানে কেউ ফুলের চারা নিয়ে আসেন, কেউ বাগানের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, আবার কেউ নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার শুধু অন্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে আসেন—কারণ তাদের জন্য এই সময়টুকুই দিনের সবচেয়ে আনন্দের অংশ। এই আড্ডাগুলোতে শুধু কথা হয় না—এখানে তৈরি হয় সম্পর্ক, জন্ম নেয় বন্ধুত্ব, আর ফিরে আসে জীবনের প্রতি আগ্রহ। অনেক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, আগে তারা দিনের বেশিরভাগ সময় একা কাটাতেন, কিন্তু এখন তারা নিয়মিত বাইরে বের হচ্ছেন এবং মানুষের সঙ্গে মিশছেন।

 

 

 

স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ প্রবীণদের মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একা থাকার অনুভূতি কমে, তারা নিজেদেরকে আবার কমিউনিটির অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। অনেকেই জানান, এই ধরনের কার্যক্রম তাদের জীবনে নতুন করে আনন্দ এনে দিয়েছে। ব্রাইটমোর পাড়ার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, খালি জমি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। তবে এই সমস্যাগুলোর মধ্যেও বাসিন্দারা হাল ছাড়েননি। বরং তারা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের পাড়াকে আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

 

 

 

ব্রাইটমোর এলায়েন্স প্রায় ৫০টিরও বেশি সংগঠন ও স্থানীয় অংশীদারদের নিয়ে একটি জোট হিসেবে কাজ করে। এই জোটের মাধ্যমে তারা খাদ্য সহায়তা, শিশুদের জন্য কার্যক্রম, যুব উন্নয়ন এবং প্রবীণদের জন্য সামাজিক সংযোগ—সবকিছুই একসাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক প্রবীণ বাসিন্দা নিয়মিত তাজা খাবার পাচ্ছেন। অনেক সময় স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেন অথবা কমিউনিটি সেন্টারে এসে খাবার গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। এতে শুধু খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয় না, বরং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সুযোগও তৈরি হয়।

 

 

 

 

 

 

এছাড়া কমিউনিটি গার্ডেনের মতো উদ্যোগ প্রবীণদের সক্রিয় রাখতেও সাহায্য করছে। কেউ গাছ লাগাচ্ছেন, কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ আবার অন্যদের সঙ্গে মিলে কাজ করছেন। এতে তারা নিজেদেরকে আবার প্রয়োজনীয় ও সক্রিয় মনে করেন।একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও কমিউনিটি সভার মাধ্যমে প্রবীণদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা নিজেদেরকে উপেক্ষিত নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এই অনুভূতিই একটি পাড়াকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

 

 

 

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পাড়ার উন্নয়নে প্রবীণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, বরং একটি পাড়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক। তাদেরকে সক্রিয় ও সংযুক্ত রাখা মানে একটি কমিউনিটির শিকড়কে শক্তিশালী করা।ডেট্রয়েটের বিভিন্ন এলাকায় এই ধরনের কমিউনিটি উদ্যোগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। স্থানীয় সংগঠনগুলো বুঝতে পেরেছে যে, শুধুমাত্র রাস্তা বা ভবন উন্নয়ন করলেই একটি পাড়া উন্নত হয় না। মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

 

এই ধরনের উদ্যোগই একটি পাড়াকে সত্যিকারের “রেজিলিয়েন্ট” বা স্থিতিশীল করে তোলে। কারণ একটি পাড়া তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষ—বিশেষ করে প্রবীণরা—নিজেদেরকে নিরাপদ, সংযুক্ত এবং মূল্যবান মনে করেন। ব্রাইটমোর পাড়ার এই পরিবর্তন তাই শুধু উন্নয়নের গল্প নয়—এটি একটি মানবিক গল্প। যেখানে একজন প্রবীণ বাসিন্দা আবার মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন, নতুন করে বন্ধুত্ব তৈরি করছেন এবং নিজের পাড়ার সাথে সংযুক্ত হচ্ছেন। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি পাড়া শুধু রাস্তা বা বাড়ি দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় মানুষের সম্পর্ক, সহমর্মিতা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে। ডেট্রয়েটের ব্রাইটমোর সেই সত্যটিই আবার নতুন করে প্রমাণ করছে।

 

 

Resilient Neighborhoods is a reporting and engagement series that examines how Detroit residents and community development organizations are working together to strengthen local neighborhoods. This story was reported and published by Bangla Shangbad Newspaper as part of the New Michigan Media partnership, supported by the Kresge Foundation.

 

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মিশিগানে কুলাউড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতির পিঠা উৎসব ও ঈদ পূর্ণমিলনী অনুষ্ঠিত

কর্নেল ওসমানী যেভাবে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠলেন

ইরান কি আমেরিকার জন্য দ্বিতীয় ভিয়েতনাম

আস্থা, অগ্রযাত্রা ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে “বাংলা সংবাদ” আটটি সফল বছর পেরিয়ে নবম বর্ষে পদার্পণ

ডানকিন ডোনাটসের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে দেড় মিলিয়ন ডলার জরিমানা

নিউইয়র্কে “হোপ নেভার ডাইস” প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রচারিত হবে রাজীদ সিজনের ‘কাদিশ’

নিউইয়র্কে ৩০ লাখের বেশি অভিবাসী সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ

মার্কিন ফার্স্ট লেডির আমন্ত্রণে ওয়াশিংটনে গ্লোবাল সামিটে ভাষণ দিলেন ডা. জুবাইদা রহমান

নতুন আইআরএস নিয়মে কর ফেরত পেতে দেরি, অনেকের অর্থ ‘ফ্রিজ’

১০

যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের অধিকার সীমিত করতে সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্প প্রশাসন

১১

যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্স রিফান্ড জালিয়াতি মামলায় ৩ ব্যক্তির কারাদণ্ড

১২

নতুন বই নিয়ে মিশিগানে আসছেন জিলবাইডেন

১৩

প্রবীণদের একাকিত্ব ভাঙছে কমিউনিটি উদ্যোগ ডেট্রয়েটের ব্রাইটমোর পাড়ায় নতুন করে গড়ে উঠছে সামাজিক সংযোগ

১৪

কাকতাড়ুয়া: খড় কাপড়ে মোড়া এক নীরব পাহারাদার

১৫

আইভিএম গবেষণায় বাংলাদেশি চিকিৎসকের সাফল্য

১৬

জুড়ীতে হলুদ তরমুজ চাষে অভাবনীয় সাফল্য তরুণদের কৃষিতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছেন উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলম

১৭

মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য ড্রোনে অ্যামাজন–পেন্টাগন চুক্তি

১৮

ক্রিপ্টো লেনদেনে ড্রোন সংগ্রহ রাশিয়া-ইরানপন্থীদের

১৯

ইরান ইস্যুতে চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে

২০