যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন দমনে আগের মতো প্রকাশ্য অভিযান ও প্রচারণার পরিবর্তে এখন তুলনামূলক নীরব কিন্তু বিস্তৃত কৌশলের দিকে ঝুঁকছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে সংঘর্ষ ও বিতর্ক কমলেও অভ্যন্তরীণভাবে আরও কঠোর ও বিস্তৃত পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।
তথ্যমতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো অভিবাসনবিরোধী নীতি বাস্তবায়ন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের কৌশলে কিছু পরিবর্তন দেখা গেলেও নীতির মূল লক্ষ্য অভিবাসীদের বহিষ্কার করা থেকেই গেছে। আগের মতো বড় শহরগুলোতে প্রকাশ্য অভিযান কিংবা সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত দৃশ্য এখন কম দেখা যাচ্ছে। বর্তমান হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিন সিনেট শুনানিতে বলেছিলেন, তিনি চান তার দপ্তর যেন নিয়মিতভাবে সংবাদ শিরোনামে না আসে। বাস্তবেও কিছুটা সেই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তার পূর্বসূরি ক্রিস্টি নোয়েম দায়িত্ব নেওয়ার পর নিউইয়র্কে প্রকাশ্যে অভিযানে অংশ নিলেও মুলিন উত্তর ক্যারোলিনায় হারিকেন-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শনে যান, যা তুলনামূলকভাবে কম বিতর্ক সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসন এখন প্রকাশ্য সংঘর্ষ এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত ‘লো-প্রোফাইল’ বা নীরব কৌশলে অভিবাসন আইন প্রয়োগ করছে। তবে এতে নীতির কঠোরতা কমেনি। সেন্টার ফর ইমিগ্রেশন স্টাডিজের প্রধান মার্ক ক্রিকোরিয়ান বলেন, “তারা আগের মতো দৃশ্যমান কৌশল থেকে সরে এসেছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে তারা অভিবাসন নীতিতে পিছিয়ে যাচ্ছে।” গত বছর প্রশাসন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত শহরগুলোতে বড় আকারের অভিযান পরিচালনা করে, যার ফলে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। এসব অভিযানে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয় এবং মিনিয়াপোলিসে দুই মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এরপর থেকেই এই নীতির জনপ্রিয়তা কিছুটা কমতে শুরু করে।
মার্কওয়েন মুলিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা এখনো আইন প্রয়োগ করছি, অবৈধভাবে থাকা ব্যক্তিদের বহিষ্কার করছি। তবে এখন তা আরও নীরবে করা হচ্ছে।” পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এজেন্ট বা আইস-এর গ্রেপ্তার কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তির সংখ্যাও জানুয়ারির প্রায় ৭২ হাজার থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ৫৮ হাজারে নেমে এসেছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের লক্ষ্য আরও বড় আকারের বহিষ্কার কার্যক্রম। বাজেট নথি অনুযায়ী, চলতি ও পরবর্তী অর্থবছরে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে বহিষ্কারের পরিকল্পনা রয়েছে, যা গত বছরের প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজারের তুলনায় অনেক বেশি। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কংগ্রেস হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে ১৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসন অভিবাসীদের জন্য আটক কেন্দ্রের সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে। প্রায় ১ লাখ মানুষকে আটকে রাখার মতো ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের গড় সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে ১১টি গুদাম কিনে আটক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন দাবি করেন, কৌশলে পরিবর্তন এলেও নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান অগ্রাধিকার সবসময়ই অপরাধী অভিবাসীদের বহিষ্কার করা।” তবে অভিবাসন অধিকারকর্মীরা এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রশাসন এখন অস্থায়ী আইনি সুরক্ষা পাওয়া অভিবাসীদেরও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইতোমধ্যে ইউএসসিআইএসের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড অনুমোদনের হার কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আশ্রয়প্রার্থী ও মানবিক ভিসার ক্ষেত্রে এই হ্রাস বেশি দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া ‘টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস’ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন, যা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে হাজারো মানুষ বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পুলিশের সঙ্গে অংশীদারিত্বও বাড়িয়েছে আইস। ‘২৮৭(জি)’ নামে পরিচিত এই চুক্তির আওতায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন অভিবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে। আগে যেখানে ২০টি অঙ্গরাজ্যে ১৩৫টি এমন চুক্তি ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৪১টি অঙ্গরাজ্যে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি হয়েছে। বিশেষ করে ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে আইস-এর সহযোগিতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন