আষাঢ়স্য সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্র মিলনায়তনে বসেছিলো সংগীত প্রেমীদের মেলা। এ মেলার আয়োজক জলতরঙ্গ। হারানো দিনের গানগুলো নবীন প্রজন্মের নিকট পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। নিয়মিত আয়োজন করছে শ্রোতার আসর। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৫ জুলাই ঢাকা শহরের বাংলামটরে অবস্থিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্র মিলনায়তনে আয়োজিত হলো জলতরঙ্গের ৪৪তম শ্রোতার আসর। এই আসরের অতিথি শিল্পী ছিলেন সেমন্তী মঞ্জরী। অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথি শিল্পী সেমন্তী মঞ্জরীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান জলতরঙ্গের সভাপতি মাসুদা খান ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন তপন।

জলতরঙ্গ পরিবারের সম্মিলিত কন্ঠে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথা, রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে, বরেণ্য শিল্পী তালাত মাহমুদের গাওয়া কালজয়ী গান “যেথা রামধনু ওঠে হেসে, আর ফুল ফোটে ভালবেসে” গানটি পরিবেশনের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের মূলপর্বের সূচনা ঘটে। তারপর সলিল চৌধুরীর কথায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “শোনো কোন একদিন” গানটিও কোরাসে গাওয়া হয়। এরপর মঞ্চে আসেন আলপনা ব্যানার্জী। রবি ঠাকুরের পূজা-প্রেম-বর্ষা নিয়ে রচিত চারটি গান পরিবেশন করেন। “এসো হে এসো, সজল ঘন, বাদলবরিষনে”, “অনেক কথা যাও যে বলে”, “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ”, এবং “মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো” গানটি গেয়ে জলতরঙ্গ পরিবারের নবীন শিল্পী ফয়সাল হাসান তানভীরকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান। জলতরঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফয়সাল হাসান তানভীর গেয়ে শোনান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া বিখ্যাত গান “আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি” এরপর তিনি হুমায়ুন আহমেদের কথায় মাকসুদ জামিল মিন্টুর সুরে সুবীর নন্দীর গাওয়া গান “একটা ছিল সোনার কন্যা” পরিবেশন করেন। অতঃপর মঞ্চে আসেন শেফতা আলম অদিতি। তিনি যৌথভাবে ফয়সাল হাসান তানভীরের সঙ্গে গেয়ে শোনান সৈয়দ শামসুল হকের কথা এবং আলম খানের সুরে এন্ড্রু কিশোর ও রুনা লায়লার গাওয়া “চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা” গানটি। পরবর্তীতে শেফতা আলম অদিতি এককভাবে পরিবেশন করেন রবীন্দ্র সংগীত “প্রেম এসেছিল নিঃশব্দচরণে”, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কথা এবং সত্য সাহার সুরে ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া চলচ্চিত্রের গান “গান হয়ে এলে”, চিত্রা সিংয়ের গাওয়া “আকাশ মেঘে ঢাকা” এবং লাকী আখান্দের অনবদ্য গান “এই নীল মনিহার”।
তাঁর পরিবেশনা শেষে মঞ্চে আসেন শ্রোতার আসরের অতিথি শিল্পী সেমন্তী মঞ্জরী। জলতরঙ্গকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি জাকির হোসেন তপনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিবেশন করেন “হার-মানা হার পরাব তোমার গলে”। তিনি এককভাবে পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্বের গান “তপের তাপের বাঁধন কাটুক রসের বর্ষণে” “আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে”, রজনীকান্ত সেনের গান “ধীরে ধীরে মোরে, টেনে লহো তোমা পানে” এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের “সে কেন দেখা দিল রে…”
সর্বশেষে মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী জাকির হোসেন তপন। তিনি তার শ্রুতিমধুর কন্ঠে গেয়ে শোনান, প্রণব রায়ের কথা এবং কমল দাশগুপ্তের সুরে রবীন মজুমদারের গাওয়া গান “তুমি এসেছিলে জীবনে আমার পথের ভুলে”, মিল্টু ঘোষের কথায়, মৃণাল চক্রবর্তীর গাওয়া গান “কেন জানিনা যে শুধু তোমার কথাই মনে পড়ে”, পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কথা ও সুরে, পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গাওয়া “এ কেমন রঙ্গ তোমার, কাছে এসে দূরে থাকা” এবং পরিশেষে তানভীরা আশরাফ শ্যামার সঙ্গে যৌথভাবে গেয়ে শোনান পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় প্রভাস দে’র সুরে মান্না দে’র গাওয়া গান “কে তুমি তন্দ্রাহরণী”।
জলতরঙ্গ পরিবারের সমবেত কন্ঠে অনুষ্ঠানের সমাপনী গান ছিলো লাকী আখান্দের “আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না” গানটি। পাঠচক্র মিলনায়তনে উপস্থিত সকল শ্রোতারাও কন্ঠ মেলান এই গানের সঙ্গে।
শান্তনু সাহা রায়ের সঞ্চালনায় পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে যন্ত্র ঝংকারে মাতিয়ে রাখেন তবলায় ভুলু ধর এবং গীটারে শাহরিভার তানভীর হোসেন ও এ জেড তুহীন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয় গত জুন এবং চলতি জুলাই মাসে জন্মগ্রহণ করা সঙ্গীতাঙ্গনের গুণীজনদের। জুন মাসে: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লাকী আখান্দ, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, ভি বালসারা, রাহুল দেব বর্মণ, ফেরদৌসি রহমান এবং জুলাই মাসে: সৈয়দ আবদুল হাদী, অনিল বিশ্বাস,আরতি মুখোপাধ্যায়, মেহেদি হাসান, রজনীকান্ত সেন, মুকেশ, কমল দাশগুপ্ত, ফিরোজা বেগম, ডি এল রায়।
শ্রোতার আসর আয়োজন বিষয়ে জলতরঙ্গের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন তপন বলেন, দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রগুলো সীমিত হচ্ছে। সবদিক থেকেই আমাদের নানা রকমের সঙ্কট চলছে, সংস্কৃতির জায়গাটা আরও বেশি সঙ্কটময়। আমাদের অবস্থান থেকে জলতরঙ্গের মাধ্যমে সাধ্যমতো সংস্কৃতি অঙ্গনের ইতিবাচক কাজগুলো করছি। তিনি আরও বলেন, আমরা কালোত্তীর্ণ, মানসম্পন্ন গানগুলো করার চেষ্টা করছি। শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে বন্ধন তৈরি করতে আমাদের শ্রোতার আসর আয়োজন। বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী দিনের গান নিয়েও আমরা আসর করেছি, কেবল চলচ্চিত্রের গান নিয়ে আগামীতেও আলাদা একটি আসর হবে আশারাখি।
মন্তব্য করুন