রিয়ালের শিরোপা জয় যেন নিয়তির লিখন

এটাই নিয়তি!

রিয়াল মাদ্রিদের কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে যদি প্রশ্ন করা হয়—কীভাবে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতল রিয়াল মাদ্রিদ, কী উত্তর দেবেন তিনি? অথবা প্রশ্নটি যদি করা হয় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, করিম বেনজেমা বা থিবো কোর্তোয়াকে; তাঁরাই–বা কী উত্তর দেবেন?

কারও কাছে মনে হতে পারে উত্তর আসবে—ভিনিসিয়ুসের গতি আর গোলই তো জিতিয়েছে রিয়ালকে। কেউ আবার বলতে পারেন, কোর্তোয়ার বিশ্বস্ত গ্লাভসে ভর করে জিতেছে রিয়াল, তিনি অতগুলো দুর্দান্ত সেভ না করলে কি রিয়াল চ্যাম্পিয়ন হতে পারে!

কল্পনার এসব উত্তর শুনতে পেলে আনচেলত্তি হয়তো দুই ঠোটে তাঁর চুরুট চেপে ধরে স্মিত হাসবেন। সেই হাসি আকর্ণবিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে ভিনিসিয়ুসের মুখে। কোর্তোয়া একটু চুপচাপ থাকলেও থাকতে পারেন, কিন্তু হাসি থাকবে বেনজেমার মুখেও!

হাসিটা আড়াল না করেই হয়তো আনচেলত্তি বলে উঠবেন, ‘এটাই নিয়তি। রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতবে, এটা লেখা হয়ে গিয়েছিল আগেই।’ ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ সিনেমার মূল ভাবনার সঙ্গে মিল রেখে বেনজেমা আর ভিনিসিয়ুসও হয়তো কণ্ঠ মেলাবেন—চ্যাম্পিয়নস লিগে মৌসুমজুড়ে রিয়াল বাজে খেলেছে, হোঁচট খেয়েছে, রিয়াল জাদু দেখিয়েছে, দ্যুতি ছড়িয়েছে, রিয়াল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে…এটাই নিয়তি, এটাই লেখা ছিল!’

নিয়তি—শব্দটিতে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। রিয়ালের সমর্থকদের তো বটেই, কাল রাতে যাঁরা ফাইনাল খেলা দেখেছেন, আপত্তি করতে পারেন তাঁরাও। ফাইনালে তো দুই দলের খেলায় তেমন পার্থক্য ছিল না। প্রথমার্ধের শুরুতে লিভারপুল একটু ভালো খেলেছে। দ্বিতীয়ার্ধে রিয়াল নিজেদের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসেছে। মোহাম্মদ সালাহ–সাদিও মানেদের গোল মিসের মহড়া যেমন লিভারপুলকে আক্ষেপে পুড়িয়েছে, তেমনি গোল মিস করেছেন বেনজেমা–ভিনিসিয়ুসও।

দুই দলের ফরোয়ার্ডদের গোল মিসের এই মহড়ার মধ্যেই ভিনিসিয়ুস একটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। অন্যদিকে সালাহ–মানেদের অনেক ভালো শট আটকে দিয়েছেন রিয়ালের গোলকিপার কোর্তোয়া। কেউ গোল মিস করবেন, কেউ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলকে এগিয়ে দেবেন, কারও শট পোস্টে লেগে ফিরে আসবে, কাউকে গোলবঞ্চিত করবে গোলকিপারের বিশ্বস্ত হাত—এটাই তো ফুটবলের রীতি, এটাই ফুটবল।

এবার এই প্রশ্ন করবেন তো—এখানে নিয়তিকে টেনে আনা কেন? তাহলে একটু পেছন ফিরে যেতে হবে। বেশি দূরে নয়, সময়ের চাকা ঘুরিয়ে এবারেরই চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলো, শেষ আট ও শেষ চার থেকে ঘুরে আসতে হবে।

শেষ ষোলোর প্রথম পর্বে পিএসজির মাঠ থেকে ১–০ গোলে হেরে আসে রিয়াল। এবার অ্যাওয়ে গোলের হিসাব না থাকায় নিজেদের মাঠে যেকোনো ব্যবধানে জিতলেই পরের রাউন্ড নিশ্চিত—এমন হিসাব নিয়েই বার্নাব্যুতে খেলতে নেমে কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলে পিছিয়ে পড়ে রিয়াল। কিন্তু ১৭ মিনিটের মধ্যে বেনজেমার অবিশ্বাস্য এক হ্যাটট্রিকে ৩–২ গোলের অগ্রগামিতায় শেষ আটে ওঠে রিয়াল।

শেষ আট থেকে রিয়াল শেষ চারে ওঠে নাটকীয়ভাবে। চেলসির মাঠ থেকে ৩–১ গোলে জিতে আসা রিয়াল নিজেদের মাঠে ৩–০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত দুই লেগ মিলিয়ে ৪–৩ গোলে এগিয়ে থাকে চেলসি। ৮০ মিনিটে রদ্রিগোর গোলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এরপর বেনজেমার ৯৬ মিনিটের গোলে শেষ চারে ওঠে রিয়াল।

এই শিরোপা অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তো কোর্তোয়ারইছবি : রয়টার্স

শেষ চারে তো আরও বড় নাটক। ম্যানচেস্টার সিটির মাঠ থেকে ৪–৩ গোলে হেরে আসা আনচেলত্তির দল নিজেদের মাঠে দ্বিতীয় লেগের ৭৩ মিনিটে পিছিয়ে পড়ে। ৮৯ মিনিট পর্যন্ত রিয়াল দুই লেগ মিলিয়ে ৫–৩ গোলে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু ৯০ মিনিট ও যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে গোল করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান রদ্রিগো। ৯৫ মিনিটে গোল করে রিয়ালকে ফাইনালে তোলেন বেনজেমা।

তিন পর্বের নাটক শেষে কাল ফাইনালে চূড়ান্ত সাফল্য পেল রিয়াল মাদ্রিদ। সেই রিয়াল মাদ্রিদ, নকআউট পর্ব শুরুর আগে ফুটবলের সংবাদবিষয়ক ওয়েবসাইট স্পোর্টিংলাইফের হিসেবে যারা শিরোপা জয়ের সম্ভাবনায় সেরা দশেই ছিল না!

নকআউটের নাটকীয় জয়ের তিনটি ম্যাচের পর আনচেলত্তি বলেছিলেন, ‘তিনটি ম্যাচে কী ঘটেছে আর আমরা কীভাবে ফাইনালে উঠলাম, এর ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না। তবে কিছু একটা তো অবশ্যই ঘটেছে।’ এ কথার মানে কী? রিয়াল কোচ তো নিয়তির বরাতই দিলেন, তাই না?

কিন্তু নিয়তিও তো কাউকে না কাউকে লিখতে হয়। নকআউট পর্বে তিনটি ম্যাচ হেরেও প্রথম ক্লাব হিসেবে রিয়ালের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের নিয়তিও নিশ্চয়ই কেউ না কেউ লিখেছে। এবার বাংলার একটি প্রচলিত কথার উদারণ দিতে হচ্ছে—বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। এ শব্দযুগলের মানে করলে দাঁড়ায়—পৃথিবী শুধু বীরদের ভোগের জন্যই উপযুক্ত। আর ফাইনালের আগে রিয়ালের আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন, ‘রিয়াল ফাইনালে উঠলে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সবাই মনে করে ট্রফিতে তাদের নাম খোদাই করা হয়ে গেছে!’

অনেক অনেক দিন আগে রিয়াল মাদ্রিদসংশ্লিষ্ট কেউ একটা কথা বলেছিলেন—চ্যাম্পিয়নস লিগের থিম সং কানে বাজলে রিয়ালের খেলোয়াড়দের রক্তে নাচন ধরে! রিয়ালের পুরোনো, পরীক্ষিত সৈনিক কিংবা নতুন আসা তরুণ কোনো খেলোয়াড়—সবার ক্ষেত্রেই নাকি এটা হয়। ইউরোপের সফলতম দলটির আবহটাই এ রকম। এ কারণেই তো সেদিনের ‘ছোকরা’ ভিনিসিয়ুসও রিয়ালের জার্সি গায়ে হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। কয়েক মৌসুম আগেও ‘হাস্যকর’ সব ভুল করা কোর্তোয়াও রিয়ালের জার্সি পরলে যেন হয়ে যান ‘লেভ ইয়াশিন!’

আর ওই যে হারতে হারতে একের পর এক ম্যাচ জেতা? এক দিক থেকে এ নিয়তি রিয়ালই লিখেছে! কীভাবে, এটা বুঝতে আবার টেনে আনতে হবে সেই ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ সিনেমার ঘটনাকে। জামাল মালিক যে অর্থ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় একের পর এক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেটা কিন্তু আন্দাজে নয়। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় তাঁর মনের চোখে ভেসে উঠেছে অতীত অভিজ্ঞতা আর জানা জিনিসের ছবি। সেখান থেকেই তিনি দিয়েছেন সব সঠিক উত্তর!

হারতে হারতে জয় তুলে নিতে রিয়াল যে জাদুগুলো দেখিয়েছে বা যে দ্যুতি ছড়িয়েছে, সেসবও কি ক্লাবটির বর্ণিল ইতিহাসের আনাচকানাচ থেকে উঠে আসা নয়! পুরোনো অভিজ্ঞতাই তো খুলে দেয় অনেক কঠিন ও জটিল সমস্যার সমাধানের দুয়ার! তাই তো আনচেলত্তি, বেনজেমা, ভিনিসিয়ুস, কোর্তোয়ারা বলতেই পারেন, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগে মৌসুমজুড়ে রিয়াল বাজে খেলেছে, হোঁচট খেয়েছে, রিয়াল জাদু দেখিয়েছে, দ্যুতি ছড়িয়েছে, রিয়াল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে…এটাই নিয়তি, এটাই লেখা ছিল!’


Posted

in

by

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *