যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মিশিগানের ডিয়ারবর্নে নিউ মিশিগান মিডিয়ার (New Michigan Media) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ প্রার্থী গোলটেবিল সাক্ষাৎকার। স্থানীয় দ্য আরব আমেরিকান নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন মিশিগানের অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী এলি সাভিট। সাক্ষাৎকারে উপস্থিত ছিলেন নিউ মিশিগান মিডিয়ার পরিচালক ড. হায়গ ওশাগান, দ্য আরব আমেরিকান নিউজের প্রকাশক ওসামা সিবলানি, লাতিনো প্রেসের প্রকাশক ইলিয়াস গুতিয়েরেজ, কোরিয়ান উইকলির প্রকাশক ট্যাক ইয়াং কিম এবং যমুনা টেলিভিশনের যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও বাংলা সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ইকবাল ফেরদৌস।
ওয়াশটেনাও কাউন্টির নির্বাচিত প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নি হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন সাভিট। এর আগে ডেট্রয়েট নগর প্রশাসনে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলা পরিচালনা করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও ভোটাধিকারসংক্রান্ত মামলায়ও যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ আলোচনায় অভিবাসীদের নিরাপত্তা, মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইসের সঙ্গে স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতা, ক্ষুদ্র ব্যবসার শ্রম আইন, অনলাইন প্রতারণা এবং সরকারি সেবায় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো উঠে আসে। সাভিট বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব শুধু আইন লঙ্ঘনের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং অপরাধ ও ক্ষতি প্রতিরোধ করা। নির্বাচিত হলে মিশিগানের সব সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা এবং সংখ্যালঘু গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার অঙ্গীকার করেন তিনি।
প্রশ্ন: অভিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ সরকারি পদক্ষেপের ভয়ে নাগরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পিছিয়ে পড়ছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
এলি সাভিট: এটি শুধু গণতন্ত্র নয়, জননিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক। অনেক অভিবাসী অপরাধের শিকার হয়েও আইসের ভয়ে পুলিশকে জানাচ্ছেন না কিংবা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। আমাদের কার্যালয় আইন যতটুকু অনুমতি দেয়, সেই সীমার মধ্যে আইসের সঙ্গে সহযোগিতা না করার নীতি অনুসরণ করে। এ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, কিন্তু মামলাটি খারিজ হয়েছে।অপরাধের শিকার মানুষ আদালতে না এলে গুরুতর অপরাধীদের বিচার করা কঠিন হয়। এতে শুধু অভিবাসী নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
এলি সাভিট: সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আমাদের মৌলিক অধিকার। কোনো বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তা প্রকাশের অধিকার রক্ষা করতে হবে। টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুমেইসা ওজতুর্কের ঘটনা আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ছাত্র পত্রিকায় মতামত প্রকাশের কারণে কাউকে আটক করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সরকার যদি মানুষের মতামতের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সবার স্বাধীনতাই ঝুঁকিতে পড়বে।
প্রশ্ন: মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষ মোকাবিলা এবং মুসলিম কমিউনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করবেন?
এলি সাভিট: নির্বাচিত হলে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করব এবং তাঁদের উদ্বেগ শুনব। আমার কার্যালয়ের দরজা সব সম্প্রদায়ের জন্য খোলা থাকবে। শুধু বৈঠক করলেই হবে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে মিশিগানের বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হওয়া উচিত। নাগরিক অধিকার বা ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধেও আদালতে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চাই।
প্রশ্ন: ডিয়ারবর্নে জেক ল্যাংয়ের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আপনার অবস্থান কী?
এলি সাভিট: ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে নির্বাচিত নেতাদের প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে হবে। জেক ল্যাংয়ের সাম্প্রতিক ঘটনার পর ডিয়ারবর্নে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছিল। স্কুলের কার্যক্রমও বাতিল করতে হয়েছিল। তবে ঘৃণামূলক বক্তব্যও অনেক ক্ষেত্রে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সুরক্ষা পায়। সরকার নিজের ইচ্ছামতো কোন বক্তব্য নিষিদ্ধ করবে, সেটি নির্ধারণ করতে পারে না। কিন্তু বক্তব্য যখন অপরাধমূলক হুমকি, সহিংসতা কিংবা আইনত শাস্তিযোগ্য উসকানির পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন: ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকেরা অনেক সময় শ্রম আইন না বুঝে ভুল করেন। তাঁদের জন্য শিক্ষামূলক উদ্যোগ নেবেন কি?
এলি সাভিট: অবশ্যই। অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব ক্ষতি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা। ওয়াশটেনাও কাউন্টিতে আমরা অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ইউনিট গঠন করেছি। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের অধিকার এবং দায়িত্ব সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছি। কোনো ব্যবসায়ী অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বীকার করে সংশোধন করতে চাইলে প্রতিটি ক্ষেত্রে দীর্ঘ মামলা প্রয়োজন হয় না। শ্রমিকের পাওনা ফিরিয়ে দেওয়া এবং বেআইনি কার্যক্রম বন্ধ করাই মূল লক্ষ্য। তবে একই ভুল ইচ্ছাকৃতভাবে আবার করলে জরিমানা বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রশ্ন: হোয়াটসঅ্যাপ প্রতারণা, ফোন হ্যাকিং এবং ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ চুরি ঠেকাতে কী করবেন?
এলি সাভিট: প্রতারণা প্রতিরোধের প্রথম ধাপ সচেতনতা। মানুষকে জানতে হবে কী ধরনের প্রতারণা হচ্ছে এবং কোথায় অভিযোগ করতে হবে। ওয়াশটেনাও কাউন্টিতে আমরা প্রতারণা ও অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের অধিকারসংক্রান্ত তথ্য সাতটি বহুল ব্যবহৃত ভাষায় অনুবাদ করেছি। রাজ্যজুড়ে এই উদ্যোগ সম্প্রসারণ করতে চাই। উপাসনালয় ও কমিউনিটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বিভিন্ন ভাষায় সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি অ্যাটর্নি জেনারেলের কনজিউমার প্রোটেকশন বিভাগ সম্পর্কে মানুষকে জানাতে চাই। প্রতারক মিশিগানে থাকলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি বা দেওয়ানি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদেশ থেকে পরিচালিত প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রতিরোধ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতারণা বাড়ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব?
এলি সাভিট: এআই প্রযুক্তি প্রতারণাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। প্রযুক্তি তৈরি ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। মিশিগানের ভোক্তা সুরক্ষা আইনের আওতায় এআই পরিষেবা সরবরাহকারীদের জন্য দায়িত্বশীল আচরণের বিধি তৈরির সুযোগ রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রযোজ্য আইন লঙ্ঘন করলে আদালতে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রতারণা হওয়ার পর ক্ষতিপূরণের চেয়ে আগে প্রতিরোধ করাই ভালো।
প্রশ্ন: সংখ্যালঘু গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষায় প্রতারণার সতর্কবার্তা ও সরকারি তথ্য প্রচারে সহযোগিতা করবেন কি?
এলি সাভিট: অবশ্যই। আমি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে বিজ্ঞাপন কিংবা সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে নতুন প্রতারণা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। একই সঙ্গে বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষ কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা জানতে সংখ্যালঘু গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতে চাই।
প্রশ্ন: অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ভয় দেখিয়ে আইনজীবী, নিয়োগকর্তা বা অন্য পেশাজীবীরা শোষণ করলে কী করবেন?
এলি সাভিট: আমি এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না, যা আমার আইনগত ক্ষমতার বাইরে। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ফেডারেল অভিবাসন আইন বাতিল করতে পারব না। তবে অভিবাসন অবস্থানের সুযোগ নিয়ে কাউকে ভয় দেখানো, অর্থ আদায় বা জোরপূর্বক কাজ করানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাই। এসব ঘটনা চাঁদাবাজি কিংবা মানবপাচারের পর্যায়ে পড়তে পারে। অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা মানবপাচার থেকে বেঁচে আসা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট শর্তে টি ভিসা বা ইউ ভিসার সুযোগ থাকতে পারে। আমাদের কার্যালয় প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত প্রত্যয়ন দ্রুত সম্পন্ন করে। তবে ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ফেডারেল সরকারের। তাই ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।
প্রশ্ন: স্থানীয় পুলিশ ও শেরিফ বিভাগের সঙ্গে আইসের সহযোগিতা নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
এলি সাভিট: আমি এর বিরোধিতা করি, প্রধানত জননিরাপত্তার কারণে। স্থানীয় পুলিশ সক্রিয়ভাবে আইসের সঙ্গে সহযোগিতা করলে অভিবাসীরা অপরাধের অভিযোগ জানাতে ভয় পান। সাক্ষীরা আদালতে না এলে গুরুতর অপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল স্থানীয় পুলিশকে সরাসরি নির্দেশ দিতে পারেন না। তবে সংবিধানের দশম সংশোধনীর আলোকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে বাধ্য করা যায় না—এ বিষয়ে আইনি নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন: অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবেন কি?
এলি সাভিট: অবশ্যই। যে কার্যালয় মিশিগানের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে, সেখানে রাজ্যের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হওয়া উচিত। bআমি চাই বিভিন্ন কমিউনিটির যোগ্য মানুষ নেতৃত্বসহ বিভিন্ন পদে কাজ করার সুযোগ পান।
প্রশ্ন: নির্বাচিত হলে সংখ্যালঘু কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবেন কি?
এলি সাভিট: অবশ্যই। নির্বাচিত হলে এটিই আমাদের শেষ আলোচনা হবে না। আমি নিয়মিত মানুষের কাছে যাব, তাঁদের কথা শুনব এবং প্রয়োজনে ফোনে যোগাযোগ রাখব। মিশিগানের প্রতিটি মানুষ ও প্রতিটি সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে চাই। সাক্ষাৎকারজুড়ে এলি সাভিট নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, অভিবাসীদের নিরাপত্তা, শ্রমিক ও ভোক্তা সুরক্ষা এবং প্রতারণা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই সচেতনতা তৈরি, বহুভাষিক সরকারি তথ্য প্রচার এবং সংখ্যালঘু কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা। একই সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের আইনগত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মন্তব্য করুন