বাংলা সংবাদ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৫ জানুয়ারী ২০২৬, ৯:৪৫ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পরিকল্পনা কি সফল হবে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর দেশটিতে বিপুল পরিমাণে মজুদ থাকা তেল উত্তোলন করে, তা ব্যবহারের কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, ক্ষমতার ‘নিরাপদ’ পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে কার্যত চালাবে। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে।

 

 

ট্রাম্প চান যুক্তরাষ্ট্রের তেল কম্পানিগুলো সেখানে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করুক, যাতে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা এই সম্পদ কাজে লাগানো যায়। তবে  বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—এতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে? ট্রাম্পের পরিকল্পনা আদৌ কতটা কার্যকর হবে?  জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। তাদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন অর্থবহভাবে বাড়াতে গেলে একদিকে যেমন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, অন্যদিকে এতে দশ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ধারণা করা হয়, ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে, যা বিশ্বে সর্বাধিক। তবে এই বিপুল মজুদের তুলনায় দেশটি বর্তমানে খুবই কম তেল উত্তোলন করতে পারছে।

 

 

বিশেষ করে ২০০০ সালের শুরুর দিক থেকে ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন তীব্রভাবে কমে যায়। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে ধরা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজের সময় রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি ‘পেট্রোলিয়াম অব ভেনেজুয়েলা’ (পিডিভিএসএ)-এর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। পরবর্তীতে মাদুরো সরকারও একই নীতি অনুসরণ করে, যার ফলে বহু অভিজ্ঞ কর্মী দেশ ছেড়ে চলে যান। ট্রাম্প বলেন, মার্কিন কম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার ‘ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়া’ তেল অবকাঠামো মেরামত করবে এবং এর মাধ্যমে ‘দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু হবে’। বর্তমানে শেভরনসহ কয়েকটি পশ্চিমা তেল কম্পানি ভেনেজুয়েলায় কাজ করলেও, মাদুরো সরকারের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর হওয়ায় এসব বেসরকারি কম্পানির কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।

 

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নভেম্বর মাসে ভেনেজুয়েলা দৈনিক গড়ে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক বাজারের এক শতাংশেরও কম। অথচ এক দশক আগেও দেশটি এর দ্বিগুণের বেশি তেল উৎপাদন করত। ভেনেজুয়েলার তেল সাধারণত পরিশোধন করা কঠিন। তবে ডিজেল ও অ্যাসফাল্ট তৈরিতে এই তেল বেশ কার্যকর। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত হালকা ধরনের তেল উৎপাদন করে, যা পেট্রোল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মাদুরোকে আটক করার আগে ভেনেজুয়েলার উপকূলে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে অন্যান্য তেলবাহী জাহাজের চলাচলেও অবরোধ আরোপ করা হয়।

 

 

ডেটা প্ল্যাটফর্ম কেপলারের জ্যেষ্ঠ পণ্য বিশ্লেষক হুমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, ভেনেজুয়েলায় তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ‘আইনি ও রাজনৈতিক’ বিষয়গুলো। তার মতে, সেখানে তেলকূপ খননের জন্য কম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে, যা মাদুরো পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ভেনেজুয়েলায় কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা অনেকটা ‘জুয়া খেলার মতো’ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে দেশটির ভবিষ্যৎ সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ওপর এর প্রভাব হবে সীমিত। পরিকল্পনাটি সফল হলে তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে, তবে সেটির জন্য বহু বাধা অতিক্রম করতে হবে এবং এতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

 

 

 

তার মতে, এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে যে ২০২৬ সালে তেলের দামের ওপর এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি আরো বলেন, ভেনেজুয়েলায় স্থিতিশীল সরকার না আসা পর্যন্ত বড় তেল কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে না। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও শেভরনকে ভেনেজুয়েলায় কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে শেভরনই একমাত্র মার্কিন তেল কোম্পানি, যারা সেখানে সক্রিয়ভাবে তেল উৎপাদন করছে। দেশটির মোট তেল উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শেভরনের দখলে। শেভরন জানিয়েছে, তারা কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে এবং ভেনেজুয়েলার সব আইন ও বিধি মেনে কাজ করছে। তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে দেশটির অন্য বড় তেল কোম্পানিগুলো এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব হলেও তা বাস্তবে রূপ দিতে সময়, বিপুল অর্থ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে বড় শর্ত।

 

 

 

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার ওপর প্রথম মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ২০১৫ সালে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সময়ে। এর ফলে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায় এবং তেল উত্তোলনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টেকের পণ্য বিভাগের প্রধান ক্যালাম ম্যাকফারসন বিবিসিকে বলেন, ‘অবকাঠামোগত দুর্বলতাই আসলে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

 

 

 

 

সূত্র: বিবিসি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্টের নির্বাচনে গুলজার-কুদ্দুস-মনির প্যানেলের ওল্ডহামে মতবিনিময় সভা

১

নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর আইসিসিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা

২

যুক্তরাষ্ট্রে ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ ব্যবস্থায় সমর্থন বেড়ে জরিপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ

৩

৭ কোটি শিশুর ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট’ প্রস্তুত,ক্লেইম করতে হবে অভিভাবকদের

৪

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে বিবিসিসিআইয়ের মতবিনিময় সভা

৫

বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতিতে ৭০ হাজার ডলারের ফি প্রস্তাব ট্রাম্পের

৬

ব্রাডফোর্ডে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের নির্বাচনী প্রচারে গুলজার-কুদ্দুস-মনির প্যানেল

৭

বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতির নতুন কমিটি গঠনের দায়িত্ব আহ্বায়ক কমিটির

৮

আমেরিকান নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ, ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের

৯

সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ট্রাম্পের অনুমোদন

১০

বাংলাদেশিদের মার্কিন ভিজিট ভিসায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার বন্ড

১১

দুই দিনব্যাপী দুর্গোৎসবে সাজবে টাইমস স্কয়ার, আয়োজন ১০ ও ১১ অক্টোবর

১২

বিদেশি কর্মীদের জন্য বড় স্বস্তি, এইচ-১বি ভিসার ১ লাখ ডলারের ফি স্থগিত

১৩

মার্কিন প্রবেশপথে বদল আসছে, পাসপোর্ট স্ট্যাম্পের বদলে গুরুত্ব পাবে I-94

১৪

৩০ ডলারে কেনা চিত্রকর্ম বিক্রি হলো সাড়ে ১৩ লাখ ডলারে

১৫

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে বৈধ অভিবাসন কমেছে ৯৬ শতাংশ

১৬

কর রিটার্নে নাগরিকত্বের তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের

১৭

২ কোটির বেশি প্রবীণের জন্য এককালীন ৯০ ডলারের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৮

জ্যাকসন হাইটসে প্রকাশ্যেই ভুয়া পাসপোর্ট ও গ্রিন কার্ড বিক্রি

১৯

সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষণে নতুন ব্যাচ নিচ্ছে USA Consulting Tech

২০