পাভেল পার্থ
১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১:৫৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভাতের অভাবে চারজনের মৃত্যু কিংবা নিওলিবারেল খুন

চিরকুটে ঋণ ও অভাবের কথা লিখে স্ত্রী মনিরা (২৮), পুত্র মাহিম (১৩), দেড় বছরের কন্যা মিথিলাকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন মিনারুল (৩৫)। রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় এলাকায় শুক্রবার সকালে তাদের মরদেহ পাওয়া গেছে (সমকাল, ১৫ আগস্ট ২০২৫)। নিথর হেগুলোর পাশে স্পষ্ট ছিল ভুল বানানে আঁকাবাঁকা হাতে লেখা জবানবন্দি আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।

 

 

কে কোথায় গিয়ে রাতবিরেতে হাঁসের মাংস খাবে কি খাবে না, পাবে কি পাবে না, এসব যখন ‘জাতীয় ইস্যু’ হয়ে ওঠে, তখন এক পরিবারের চারজন ভাতের অভাবে মরে; জবানবন্দিতে লিখে রেখে যায় ক্ষুধার যন্ত্রণা। অনাহার ও ক্ষুধার এই রাজনীতি নিয়ে আমরা প্রশ্ন করি না। বামনশিকড়, মাঝপাড়া কিংবা ভবেরপাড়া গ্রামে এখনও ঋণগ্রস্ত, বঞ্চিত, অনাহারী কৃষক ভাতের অভাবে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।

 

 

সরকারের কোনো উপদেষ্টা চাইলে যে কোনো প্রান্তে গিয়ে ‘হাঁসের মাংস’ খেতেই পারেন। কিন্তু এই প্রশ্নও করা জরুরি মিনারুলদের ভাতের থালা কি খালিই পড়ে থাকবে? তেভাগা, মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান; মিনারুলরা ভাত-জমি-কাপড়ে সম্মান নিয়ে বাঁচার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু কাঠামো একদম বদলায়নি। এমন নিদারুণ বৈষম্য আর বাইনারি আড়াল করে বা জোড়াতালি দিয়ে রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার সম্ভব নয়।

 

 

পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যম লিখেছে, অভাব ও ঋণের কারণে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন মিনারুল।  খাদ্য উপদেষ্টা, কৃষি উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা কিংবা  সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টা কি মিনারুলের চিরকুটটি পড়তে পেরেছেন?

 

 

হয়তো এখন আর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কিছু নেই। তবে অনাহারের যন্ত্রণাকে রাষ্ট্রের সামনে আবারও বিশাল বয়ান হিসেবে হাজির করে গেল পরিবারটি। রাষ্ট্রের সামগ্রিক সংস্কার ও রূপান্তরে প্রশ্নকে মৌলিক বার্তা হিসেবেই পাঠ করতে হবে।

 

 

সংস্কার ও নির্বাচন, উভয়ই আমাদের জন্য জরুরি। কিন্তু মিনারুলদের ভাতের অভাব কীভাবে মিটবে, এ নিয়ে মৌলিক জিজ্ঞাসা নেই কেন? উপদেষ্টার হাঁসের মাংস খোঁজা কিংবা খাওয়ার অভাবে মিনারুলদের মৃত্যু আবারও আমারে খাদ্য ও ক্ষুধা নিয়ে রাজনীতির সেই মৌলিক প্রশ্নই হাজির করে। ‘অধিক খাদ্য উৎপাদন’ কোনোভাবেই সবার খাদ্যের জোগান দিতে পারে না। সাংস্কৃতিক ও প্রতিবেশগতভাবে ন্যায্য সরবরাহ, বণ্টন, ক্রয়ের সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামোই উপদেষ্টা থেকে মিনারুলের পরিবার সবার জন্য আহার নিশ্চিত করতে পারে।

 

 

হাঁস বা ভাত, রুচির স্বাধীনতা, হয়তো খাদ্য সার্বভৌমত্ব। কিন্তু বিগত কর্তৃত্ববাদী রেজিমে ‘অধিক খাদ্য ফলানো’র মতো বৈশ্বিক নিওলিবারেল এজেন্ডাকেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রচুর খাদ্য ফলিয়ে, প্রচুর মাছ ধরে, বিশে থেকে প্রচুর খাদ্য আমদানি করেও মিনারুলরে মৃত্যু ঠেকানো যায়নি। এমনকি মানুষের জন্য অধিক খাদ্য ফলানোর জোরজবরদস্তিতে মাটি-পানি-বায়ু-জনস্বাস্থ্য সব দখল ও দূষিত করা হয়েছে। বিদ্যমান বিভাজন, বাইনারি, কর্তৃত্ব, ঔপনিবেশিকতা, বহুজাতিক দখলদারিত্ব, সবকিছু গোপন করে ‘অধিক খাদ্য ফলানোর দৃষ্টিভঙ্গি’ মূলত সবুজ বিপ্লবের হন্তারক বৈশ্বিক নিওলিবারেল প্রকল্প। সামগ্রিক উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাকে জিম্মি করেছে হাতে গোনা কিছু বহুজাতিক ক্ষমতা। তাই দুনিয়াবোঝাই খাবার থাকলেও গাজায় অনাহারে মরে শিশু; ইসরায়েলে যুদ্ধসেনাদের জন্য খাবারের দোকান দেয় ম্যাকডোনাল্ডস। খাওয়ার অভাবে মিনারুলদের এই মৃত্যুও নিওলিবারেল কাঠামোগত খুন।

 

 

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার এবং নির্বাচনের ময়দানে এই নিওলিবারেল কাঠামোকে প্রশ্ন করেই দাঁড়াতে হবে। ক্ষুধা ও অনাহারের রাজনীতি এবং খ্যা-ডিসকোর্সকে মিথ বা মিথ্যা বানানোর কর্তৃত্ববাদী কায়দাকে রুখতে হবে। নিওলিবারেল বাহাদুরির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই কেবল মিনারুলদের ন্যায়বিচারকে সুরক্ষা দেওয়া যেতে পারে।

 

 

ঋণ ও অভাবের কারণে আত্মহত্যা এই প্রথম নয়। এ ঘটনাকে জোর করে ‘বাসন্তীর জাল’ বানানোর রকার নেই। রেজিম থেকে রেজিমে ক্ষুধা ও অনাহারের রাজনীতি বহুজনকেই নিহত ও নিখোঁজ করেছে। রেজিমগুলো সাংগঠনিক রাজনৈতিকতার মতার্শে ভিন্ন হলেও সবাই নিওলিবারেল ব্যবস্থার সপক্ষে। তাই গণি মিয়া েেক অবিনাশ ও রবি মার্ডি, সাইফুল শেখ েেক রুহুল আমিন বা মিনারুলরা বারবার ফিরে ফিরে আসে।

 

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের কুড়েরপাড় এলাকার আল আমিন ও তাঁর স্ত্রী জরিনা খাতুন কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেন ২০২৫ সালের ২৬ মে। নাটোরের লালপুরের আড়বাব ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের গরিব কৃষক রইজুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমা খাতুন তামাক আবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন ২০২৫ সালের ২ জুন। চলতি সালের ২৫ মার্চ মেহেরপুরের ভবেরপাড়া গ্রামের কৃষক সাইফুল শেখ ঋণগ্রস্ত হয়ে লোকসান ও হতাশার কারণে আত্মহত্যা করেন। ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রাজশাহীর বাঘার আড়ানী   রেলস্টেশনের রেললাইনে শুয়ে পড়েছিলেন বাউসা ইউনিয়নের মাঝপাড়া গ্রামের কৃষক মীর রুহুল আমিন। অভাব, ঋণ, ক্ষয়ক্ষতি এবং বঞ্চনার কারণে একের পর এক কৃষকের নির্মম মৃত্যু ঘটলেও এটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বয়ান হয়ে ওঠেনি।

 

 

‘খাওয়ার অভাব’কে কারণ হিসেবে ঘোষণা করে কোনো পরিবারের আত্মহত্যার পর সরকারের উচিত সেই গ্রামে যাওয়া। উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শ্রেণি কাঠামো, গ্রামীণ র্অনীতি এবং খাদ্য ব্যবস্থাকে গভীর থেকে অনুধাবন করাও জরুরি।

 

 

মিনারুল সুইসাইড নোটে লিখেছেন, ‘আর কারো কাছে তার পরিবারকে ছোট হতে হবে না, মিনারুলের জন্য তার বাবাকে অনেক মানুষের কাছে ছোট হতে হয়েছিল।’ মিনারুলরা ‘ছোট’ হতে চান না; মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চান। নিওলিবারেল খুনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মেহনতি গরিবের আত্মসম্মান ও মর্যাদার জবানবন্দি রাষ্ট্রকেই রক্ষা করতে হবে।

 

– লেখক ও গবেষক

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ‘বেস্ট অব দ্য ওয়েস্ট ইয়ুথ লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন তাহমিদ চৌধুরী

১

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বারহাম সালিহ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

২

সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে

৩

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসী তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে

৪

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের জন্য নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

৫

মেডিকেইডের ওষুধের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের

৬

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ কর্মী ভিসায় ১ লাখ ডলারের ফি আরও এক বছর

৭

তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে আবার বাড়ল সুদের হার

৮

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রিনকার্ডে নতুন পাবলিক চার্জ নিয়ম

৯

গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসায় লাগাম, মার্কিন নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানটি

১০

বিজিবির অভিযানে মাদক-অস্ত্রসহ ৯১৩ কোটি টাকার পণ্য জব্দ, আটক ২৮১

১১

ডেট্রয়েট থেকে আটলান্টিক সিটি, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিস্তৃত উপস্থিতি

১২

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ডলারের বিকল্প খুঁজছে বিভিন্ন দেশ

১৩

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র

১৪

গ্রিন কার্ড স্পনসরশিপে নতুন নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রে, যাচাই হবে স্পনসরের ক্রেডিট তথ্য

১৫

সৌদি আরবে ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

১৬

ডাকযোগে ভোটের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের উদ্যোগে বাধা

১৭

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ভোটের অভিযোগে ৭ গ্রিন কার্ডধারী গ্রেপ্তার

১৮

ছয় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছাড়ার হার সর্বোচ্চ

১৯

প্রথমবার প্রকাশ্যে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের স্বীকারোক্তি যুক্তরাষ্ট্রের

২০