৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ৬:৪৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ফিলিস্তিন ইসরায়েল কিংবা বিশ্বজুড়ে শান্তি বিরাজমান হোক

একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের ভয়বহতা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। যুদ্ধ অর্থনীতিকে মারাত্মক বিপর্যস্ত করে। মানবিকতা, মূল্যবোধ, বিশ্ববিবেক এবং সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দেয় যুদ্ধ। যুদ্ধ নিয়ে কেবল একটি দেশ নয়, পুরো পৃথিবী নানাভাবে আক্রান্ত হয়। যুদ্ধের কোনো ইতিবাচক দিক নেই কেবল আধিপত্য বিস্তার ছাড়া।

গত ৭ অক্টোবর হঠাৎ করে ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস তথা হারাকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া (ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন)। এতে ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন বলে জানায় ইসরায়েল। ওই দিন ২৪০ জনকে জিম্মিও করা হয় বলে জানিয়েছে দেশটি। হামাসের হামলার কিছুক্ষণ পরই গাজায় নির্বিচারে বোমাবর্ষণ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। এরপর থেকে অব্যাহত হামলায় গাজায় সাড়ে ১৪ হাজারের বেশি বাসিন্দা নিহত হন। তাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী ও শিশু। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো- বিশেষত উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোকে তাদের শাসন ব্যবস্থার প্রতি পশ্চিমাদের সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি, ইসরায়েলি বর্বরতার বিরুদ্ধে নিজ নাগরিকদের ক্ষোভ প্রশমন করে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এবং কীভাবে এ অঞ্চল বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে- এমন সব বিষয়ে গুরুতর কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। বিশেষত যখন ইসরায়েলের সব ধরনের অন্যায়, অনাচারের পেছনে দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমা বিশ্ব। প্রায় আট দশক ধরে সংঘাত চলছে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল অঞ্চলে। এখন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ না থেকে এই ইস্যু নিয়ে বিরোধের হাওয়া ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে।

১৯৪৭ সাল নাগাদ ইহুদিরা ফিলিস্তিনের ছয় শতাংশ দখল করে নেয়। তাদের মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ফিলিস্তিনের ৩৩ শতাংশে। তখনও ৬৭ শতাংশ আরব জনগোষ্ঠী ছিল দেশটির ৯৪ শতাংশ জমির মালিক। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বেন গুরিয়ন ইহুদিদের জন্য এই অঞ্চলে একটি ‘নিরাপদ আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়নের মুখে পালিয়ে বেড়াতে থাকা ইহুদিরা নিরাপত্তা পাওয়ার আশায়ই ইসরায়েলে এসে আশ্রয় নেন। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসার পর দিন থেকে ব্রিটিশ শাসনাধীন ফিলিস্তিনে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তাতে সাড়ে সাত লাখের মতো আরব নিজেদের আবাস ছেড়ে পার্শ্ববর্তী জর্ডান, লেবানন, সিরিয়ায় আশ্রয় নেন। অনেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসবাস শুরু করেন। নিহত হয় অন্তত ১৫ হাজার ফিলিস্তিনি। ইহুদিরা দেশটির ৭৮ শতাংশ দখল করে নেয়। বাকি ২২ শতাংশ ছিল এর ভেতরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন এলাকা।
১৯৪৯ সালে অস্ত্রবিরতির কারণে যুদ্ধ সাময়িক স্থবির হলেও এই সংঘাত মূলত পুরোপুরি আর থামেনি কখনও। ফিলিস্তিনিরা ১৯৪৮ সালের ১৫ মে যুদ্ধ শুরুর দিনটিকে প্রতি বছর ‘নাকাবা’ দিবস বা বিপর্যয়ের দিন হিসেবে পালন করে।
ইসায়েলের বসতির ফাঁকে ফোঁকরে এখনও যেসব আরব-ফিলিস্তিনি বসবাস করছে, তাদেরই বিভিন্ন আন্দোলনরত গোষ্ঠী লড়াই করে চলেছে। ইসরায়েলের জনসংখ্যার তুলনায় ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা এখন প্রায় ২০ শতাংশের মতো।
২০০২ সালে আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে সব সেনা প্রত্যাহার করে ১৯৬৭ সালের আগের মানচিত্রে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যার বিনিময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে বাকি সব আরব রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে বলে আশ্বাস ছিল। ইসরায়েল এতে সম্মত না হওয়ায় নিজ দেশে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য বদলায়নি।দুই রাষ্ট্র সমাধান, ইসরায়েলি বসতি, জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ, উদ্বাস্তু সমস্যা-এগুলোই মূলত যুগের পর যুগ ধরে চলমান বিরোধের মূল ইস্যু। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান- এটা­ বলতে বোঝানো হয় ইসরায়েলের পাশাপাশি পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠন। তবে হামাস এই দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তারা ইসরায়েলকে ধ্বংস করা শপথে অটল আছে। আর ইসরায়েল বলেছে, একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে যাতে ইসরায়েলের জন্য তারা কোনও ধরনের হুমকি হয়ে দেখা না দেয়।

পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের দখলকৃত ভূমিতে নির্মিত ইহুদি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করে। তবে ইসরায়েলের দাবি, এই ভূমিতে তাদের অধিকার ঐতিহাসিক এবং বাইবেলেও এর সম্পর্কে উল্লেখ করে। তাদের অব্যাহত সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনের সঙ্গেই শুধু নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি।

বিশ্ব সম্প্রদায় ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
কিন্তু ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সময় প্রতিষ্ঠিত হামাসকে অনেকেই ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠি’ হিসেবে গণ্য করে। ২০০৭ সালে ইসরায়েলকে হঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে গাজা উপত্যকায় ক্ষমতায় আসে তারা। তবে তাদের সঙ্গে পশ্চিম তীর তথা ফিলিস্তিনের মূল রাজনৈতিক দল ফাতাহ’র সুসম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।

পিএলও তথা ফাতাহ নেতা ইয়াসির আরাফাত ২০০৪ সালে মারা যান এবং এর এক বছর পরে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শেষ হয়। এক বছর পর ফিলিস্তিনিরা প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেয়। নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ফাতাহ-হামাস গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়। পরে হামাস গাজা উপত্যকা থেকে ফাতাহকে বহিষ্কার করে। ফাতাহ পশ্চিম তীরের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে।

বর্তমানে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে কাতারের ভূমিকা বেশ লক্ষ্যনীয় কিন্তু রেকর্ড বলছে, ইসরায়েল কখনোই যুদ্ধবিরতিকে সম্মান করেনি। শতাব্দীর অন্যতম মারাত্মক প্রাণহানির এই ধ্বংসযজ্ঞ, এই গণহত্যা অচিরেই নিপাত যাবে এটাই বিশ্বজুড়ে শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রত্যাশা। ফিলিস্তিন ইসরায়েল কিংবা বিশ্বজুড়ে শান্তি বিরাজমান হোক। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে চলা মানুষগুলোর চিন্তা-চেতনায় যুদ্ধ স্থান পাবার কথা নয়। যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটুক, জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই শান্তির ছায়াতলে বসবাস করুক, জয় হোক মানবতার।

পীরজাদা হোসেন আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি

জলবায়ু দুর্যোগে শিক্ষার সংকট, ক্ষতিগ্রস্ত ১ কোটি ২৭ লাখ শিশু

মার্কিন ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সুমাইয়া সমাজী

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেতে বাড়ছে ফি, আবেদনকারীদের গুনতে হবে অতিরিক্ত অর্থ

মিশিগানে ষ্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রার্থী মাহবুব খানের সাথে কমিউনিটির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

সিলেট সদর দক্ষিণ সুরমা অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগানের অভিষেক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ২৮ জুন

দুই দিনের সরকারি সফরে মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

৫ কোটি ২ লাখ অভিবাসী নিয়ে নতুন চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যায়

ট্রাম্পের ব্যবহারের জন্য নতুন বিলাসবহুল এয়ার ফোর্স ওয়ান

বিদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ জোরদার

১০

গৃহস্থ ও প্রবীণদের আর্থিক স্বস্তিতে নিউইয়র্কের ২ বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ

১১

এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে ৪১ শতাংশ

১২

২৫০ বছর টিকবে কি যুক্তরাষ্ট্র? প্রশ্ন তুলেছেন ৩৮% মার্কিনি

১৩

মিশিগানে সাবেক এমপি ফরিদ চৌধুরী সরণে দোয়া মাহফিল সম্পন্ন

১৪

ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে ফাঁদ প্রতারকের টোপে পড়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন তরুণ-তরুণীরা

১৫

প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন তৈরি করল এআই, রোগ প্রতিরোধে নতুন আশা

১৬

চার্জে দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ?

১৭

আদালতের সিদ্ধান্তের পর কেনেডি সেন্টার থেকে বাদ ট্রাম্পের নাম

১৮

মিশিগানে ষ্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রার্থী সীমা আহমেদ’র সংবাদ সম্মেলন

১৯

সোশ্যাল সিকিউরিটি সংকটে নিউইয়র্কে বাড়ছে অবসরপ্রাপ্তদের উদ্বেগ

২০