প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতের নির্দেশ অমান্যের প্রবণতার অভিযোগ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অন্তত ৩১টি মামলায় আদালত উল্লেখ করেছে যে প্রশাসন তাদের নির্দেশ পুরোপুরি অনুসরণ করেনি।
বিশেষ করে অভিবাসন সংক্রান্ত মামলাগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ফেডারেল বিচারকরা একাধিকবার সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই বিভিন্ন মামলায় প্রশাসনের আচরণ নিয়ে বিস্তৃত প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফেডারেল আদালতের বিচারকরা অভিযোগ করেছেন যে প্রশাসন বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছে। এসব মামলার মধ্যে ছিল ফেডারেল তহবিল কমানো, গণহারে চাকরিচ্যুতি, অভিবাসন নীতি এবং বহিষ্কার কার্যক্রম সংক্রান্ত বিষয়। একই সঙ্গে পৃথক অভিবাসন সংক্রান্ত মামলায় ২৫০টিরও বেশি ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষার অভিযোগ উঠে এসেছে। কোথাও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ফেরত দেওয়া হয়নি, আবার কোথাও আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অভিবাসীদের নির্ধারিত সময়ের পরও আটক রাখা হয়েছে। তবে এসব মামলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত প্রশাসন পিছু হটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্য ও আইনের শাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিড সুপার বলেন, “ফেডারেল সরকারের উচিত আইনের শাসনের প্রতি সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা। কিন্তু যখন সরকার নিজেই সেই বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে, তখন পুরো দেশের আইনি কাঠামোর প্রতি সম্মান দুর্বল হয়ে পড়ে।” এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ৭০০টিরও বেশি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। আইনবিদদের মতে, আগের প্রশাসনগুলোর ক্ষেত্রেও আদালতের নির্দেশ অমান্যের কিছু ঘটনা থাকলেও তা ছিল তুলনামূলক সীমিত। সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্টদের পুরো মেয়াদকাল মিলিয়ে যেখানে কয়েকটি ঘটনা দেখা গেছে, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই ডিস্ট্রিক্ট আদালতের রায় “অবৈধ” এবং প্রশাসন আইন মেনেই কাজ করছে। বিচার বিভাগের আইনজীবীরাও আদালতে যুক্তি দিয়েছেন যে তারা আদালতের নির্দেশ অমান্য করেননি। তাদের দাবি, আইনের ব্যাখ্যা, আপিল আদালতের রায় এবং নির্দেশের সীমার মধ্যেই প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ফেডারেল বিচারকদের সমালোচনা করেছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে প্রেসিডেন্ট চাইলে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করতে পারেন।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে অভিবাসী, অলাভজনক সংস্থা এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর। কিছু ক্ষেত্রে বিচারকরা উল্লেখ করেছেন, প্রশাসন অভিযুক্ত গ্যাং সদস্যদের এল সালভাদরের একটি কুখ্যাত কারাগারে পাঠিয়েছে, বিপুল পরিমাণ বিদেশি সহায়তা আটকে রেখেছে এবং ভয়েস অব আমেরিকার কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করেনি। এসব ঘটনার বেশিরভাগই প্রশাসনের প্রথম কয়েক মাসে ঘটলেও এপ্রিল মাস পর্যন্তও নতুন করে নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। তবে সব ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকেনি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩১টি মামলার মধ্যে ১৫টিতে আপিল আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের নীতিকে আংশিক বা পুরোপুরি সমর্থন করেছে অথবা নিম্ন আদালতের পদক্ষেপ সীমিত করেছে।
রক্ষণশীল আইনজীবী উইল চেম্বারলেইনের মতে, প্রশাসন সাধারণত আদালতের নির্দেশ মেনে চলে, পরে আপিল করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই জয়ী হয়। তার মতে, এটি প্রমাণ করে যে প্রশাসন নির্বিচারে আদালতের নির্দেশ অমান্য করছে না। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, উচ্চ আদালত কখনও কখনও এ ধরনের আচরণকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র এক ভিন্নমতে উল্লেখ করেছেন, আদালত যখন বারবার এমন আচরণ উপেক্ষা করে, তখন আইনের শাসনের প্রতি সম্মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মন্তব্য করুন