নিউইয়র্ক সিটির ভাড়াটিয়াদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আবাসন সংকট ও বাড়িওয়ালাদের অনিয়ম মোকাবিলায় একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান কওয়ামে মামদানি। ১৬ জুলাই লোয়ার ম্যানহাটনের ঐতিহাসিক টেনেমেন্ট মিউজিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম ‘রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট (আরআরআর)’ প্রকাশ করেন।
ভাড়াটিয়াদের সরাসরি মতামত, অভিযোগ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রণীত এই প্রতিবেদনে আবাসন খাতে ব্যাপক সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে খারাপ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রতিটি হিট কমপ্লেইন্টে বাধ্যতামূলক তদন্ত, টেন্যান্ট ইউনিয়নের আইনি স্বীকৃতি এবং ভাড়া বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে মেয়র মামদানি বলেন, একটি শহরের মর্যাদা নির্ভর করে নাগরিকদের নিরাপদ ও সম্মানজনক বাসস্থানের ওপর। কিন্তু এখনও বহু নিউইয়র্কবাসী উচ্চ ভাড়া পরিশোধ করেও তেলাপোকা, ছত্রাক, ভাঙা লিফট, ফুটো পাইপ, শীতকালে পর্যাপ্ত তাপের অভাব এবং অবহেলিত ভবনে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতেই তার প্রশাসন নতুন এই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
মেয়র জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত চার মাসে নিউইয়র্ক সিটির পাঁচটি বরোতে প্রথমবারের মতো ‘রেন্টাল রিপঅফ হিয়ারিংস’ অনুষ্ঠিত হয়। এসব শুনানিতে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি ভাড়াটিয়া অংশ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও পরামর্শ তুলে ধরেন। সেই সাক্ষ্য ও মতামতের ভিত্তিতেই ‘রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট’ প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই রিপোর্ট কেবল একটি প্রশাসনিক নথি নয়, বরং হাজারো নিউইয়র্কবাসীর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। যারা নিজেদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেছেন, তাদের কণ্ঠস্বরই ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের ভিত্তি হবে।
মেয়র মামদানি জানান, নতুন পরিকল্পনা চারটি প্রধান ভিত্তির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে। আবাসনের মানোন্নয়নের অংশ হিসেবে নিউইয়র্ক সিটিতে জমা পড়া প্রতিটি হিট কমপ্লেইন্ট বাধ্যতামূলকভাবে তদন্ত করবেন হাউজিং ইন্সপেক্টররা। নির্ধারিত সময়ে পরিদর্শন সম্ভব না হলে বাসিন্দারা নিজেদের সুবিধামতো সময়ে পুনরায় পরিদর্শনের সময় নির্ধারণ করতে পারবেন। পাশাপাশি ছত্রাক, তেলাপোকা, ইঁদুর, ভাঙা লিফট ও অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যার বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। শুধু দেয়ালে রং করে ছত্রাক ঢেকে দেওয়ার পরিবর্তে সমস্যার মূল কারণ দূর করতে বাড়িওয়ালাদের বাধ্য করা হবে।
খারাপ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ‘ফিক্স দ্য সিটি’ নামে নতুন কর্মসূচি চালু করবে। দীর্ঘদিন ধরে আইন লঙ্ঘনকারী ও অবহেলাকারী বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবন নিবন্ধন, অভিযোগ ও জরিমানার বিদ্যমান কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হবে, যাতে পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং দায়িত্বশীল বাড়িওয়ালারাও সুবিধা পান। ভাড়াটিয়াদের ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে নিউইয়র্ক সিটিতে টেন্যান্ট ইউনিয়নকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংগঠিত হয়ে অভিযোগ জানালে ভাড়াটিয়াদের হয়রানি বা উচ্ছেদের ভয় দেখানো যাবে না। প্রয়োজনে সমস্যাগ্রস্ত ভবনের মালিকানা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগও নেওয়া হবে।
ভাড়া বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অনলাইনে বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া ভাড়ার বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়ম চালুর কথা জানানো হয়েছে। কোনো অ্যাপার্টমেন্টের ছবি বা ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, যাতে ভাড়াটিয়ারা প্রকৃত তথ্য জানতে পারেন এবং প্রতারণার শিকার না হন। হাউজিং প্রিজারভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের কমিশনার ডিনা লেভি জানান, ‘ফিক্স দ্য সিটি’র পাশাপাশি ‘এনফোর্সমেন্ট ডেস’ নামে আরেকটি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় সংগঠিত ভাড়াটিয়া সমিতির অভিযোগের ভিত্তিতে একটি ভবনের ছাদ থেকে বেজমেন্ট পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন পরিচালনা করা হবে। এতে দীর্ঘদিনের আইন লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
মেয়রের অফিস টু প্রোটেক্ট টেন্যান্টস-এর নির্বাহী পরিচালক সিয়া উইভার বলেন, এই রিপোর্ট শুধু একটি নীতিপত্র নয়, বরং হাজারো ভাড়াটিয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। তিনি জানান, যেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে, সেগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। মেয়র মামদানি বলেন, সব বাড়িওয়ালাই অনিয়মকারী নন। বিশেষ করে সাশ্রয়ী আবাসনের অনেক মালিক ক্রমবর্ধমান বীমা ব্যয়ের কারণে সমস্যায় পড়েছেন। তাই আগামী তিন বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সিটি-সমর্থিত বীমা তহবিল গঠন করা হবে, যাতে দায়িত্বশীল বাড়িওয়ালারা কম খরচে বীমা সুবিধা পেয়ে ভবনের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই কানাডার দাবানলের ধোঁয়ার কারণে নিউইয়র্কের বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়ায় নাগরিকদের সতর্ক করেন মেয়র। তিনি জানান, বায়ুর মান অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না যাওয়া, কষ্টসাধ্য শারীরিক কাজ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে কে-এন৯৫ মাস্ক ব্যবহারের আহ্বান জানান। পাশাপাশি শহরের লাইব্রেরি, পুলিশ প্রিসিঙ্কট ও ফায়ারহাউসে বিনামূল্যে কে-এন৯৫ মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘রেন্টাল রিপঅফ রিপোর্ট’ নিউইয়র্ক সিটির আবাসন নীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। ভাড়াটিয়াদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন, বাড়িওয়ালাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনি সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে শহরের আবাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মেয়র মামদানি বলেন, “নিউইয়র্কের প্রতিটি মানুষের অধিকার একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বাসযোগ্য ঘরে বসবাস করা। সেই অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের সরকারের দায়িত্ব এবং আমরা সেই দায়িত্ব পালন করব।”
মন্তব্য করুন