ঐতিহ্য একটি দেশ বা জাতির প্রবহমান জীবনধারার আবেগ-অনুভূতি, যা কাল-পরম্পরায় সে জাতির মানুষকে উদ্বুদ্ধ-অনুপ্রাণিত করে। বাঙালি জাতির পরাধীনতার শেকল ছেঁড়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখতে বহু সময় লেগেছিলো, ঝরেছিলো অনেক বীরের প্রাণ।
কারণ একটাই সেই লড়াই ছিল অসংগঠিত, ঐক্যহীন সংগ্রাম। এতে শুধুই জীবনক্ষয় হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়নি। হিন্দু মুসলমান ধর্মীয় জাতি বিভাজনের ফলে সেই মুক্তির লড়াইগুলো বার বার ব্যর্থ হয়েছে।
১৯৪৭-এ ভারত পাকিস্তান দেশভাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও বাঙালি পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে ১৯৭১ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। অবশেষে বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এনে দেয় মুক্তি, এনে দেয় বিজয়। ঐক্য মানেই বিজয় সুনিশ্চিত তাই বাঙালি জাতির বসবাস পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন সেখানে ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেইসাথে বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে ঐতিহ্যময় স্থাপনা নির্মাণও প্রয়োজন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শহরে বাঙালির বসবাস এবং সময়ের পরিক্রমায় সেই সকল স্থানে তৈরি হচ্ছে ঐতিহ্যময় স্থাপনা। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান শহরেও এখন বেশকিছু স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে, অনেকগুলো নির্মাণাধীন রয়েছে।
ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত শহিদ মিনার মিশিগানে নির্মাণের জোর প্রচেষ্টা চলছে। কেবল স্থাপনাগুলো নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়না বরং নির্মিত স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। মিশিগান স্টেটের ডেট্টয়েট-হ্যামট্রামিক শহরের কনান্ট এভিনিউ, ক্যানিফ ও কার্পেন্টার স্ট্রিটসহ আশপাশের এলাকা সকলের নিকট ‘বাংলা টাউন’ নামে পরিচিত।
সম্প্রতি সেই বাংলা টাউন নামফলকে কে বা কারা রং স্প্রে করে এর সৌন্দর্য বিনিষ্ট করে। ডেট্রয়েট পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং দূর্বৃত্তদের ধরতে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের এই ভূমিকাকে সাধুবাদ জানাই।
আমাদের বাঙালি কমিউনিটির লোকজনও এই বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে যে আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় সেই স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এতো আগ্রহ দেখা যায়না। অথচ নির্মাণে সাথে সাথে স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখাও খুবই জরুরি। স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্মাণকালীন সময়েই রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। যথাযথভাবে সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারলে আমাদের আবেগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করাই শ্রেয় !
বাঙালি ঐতিহ্যের অনেক কিছুর সঙ্গেই মিশিগানে ক্রমবর্ধমান বাঙালি জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মের নিকট পরিচিত করে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। স্থাপনাগুলো আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক। আমাদের অতীত গৌরবের সাক্ষী। এগুলো স্থাপন যেমন প্রয়োজন তেমনি সংরক্ষণ করাটাও প্রয়োজন আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। এর জন্য উদ্যোগী হতে হবে আমাদের বাঙালি কমিউনিটির অগ্রসর ব্যক্তিবর্গকেই। মিশিগানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল তৈরি হয়েছে এটা খুবই সম্মানের।
এই ম্যুরাল রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের সচেতন হতে হবে। সেই সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন সহ আলোকিত বাঙালির সঙ্গে আমাদের নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দিতে তাঁদের ম্যুরাল নির্মাণেরও উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বাঙালি সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের মন-মননে গেঁথে দিতে এই সকল উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়।
বাঙালি জাতির সংস্কৃতির মূল হাজারো বছরের গভীরে প্রোথিত। ভৌগোলিক অবস্থান, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, উপনিবেশবাদ, মানুষের সহজিয়া জীবনবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ভাষা বাঙালি সংস্কৃতিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বাঙালিরা যে যে দেশেই থাকুক না কেনো হৃদয়ে বাঙালি সংস্কৃতির বীজ বপন করে চলে।
সেখানে রয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। সুদৃঢ় ঐক্য আর একে অন্যের আস্থা যেখানেই তৈরি হয়েছে সেখানেই বিজয় এসেছে। আমাদের মিশিগানেও তৈরি হোক বন্ধন, সুদৃঢ় ঐক্য আর একে অন্যের আস্থা। ঐতিহ্যময় স্থাপনাগুলো নির্মিত হোক এবং পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা হোক এই প্রত্যাশা করি।
মন্তব্য করুন