যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে নীতিগত সুদের হার বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। বুধবার দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৩.৭৫ থেকে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।
গত তিন বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির এটিই প্রথম ঘটনা। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই সিদ্ধান্ত এলো, যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুদের হার কমানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে বারবার চাপ দিয়ে আসছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বার বুধবার এক বিবৃতিতে ফেডারেল রিজার্ভ জানায়, ‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি শক্তিশালী গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলির কারণে অনিশ্চয়তা বেশি থাকলেও অভ্যন্তরীণ ব্যয় বেশ স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক উঁচুতে। আজকের এই পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতিকে দ্রুত কমিটির কাঙ্ক্ষিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
ত্রৈমাসিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফেড কর্মকর্তারা এ বছর সুদের হার আরও একবার বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন এবং আগামী বছর জুড়ে তা অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন। মুদ্রানীতির সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণকারী সিএমই ফেডওয়াচ জানিয়েছে, ফেডের সুদহার ৩.৭৫–৪ শতাংশে বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন ৯২.৩ শতাংশ। এক সপ্তাহ আগেও এক-চতুর্থাংশ শতাংশীয় পয়েন্ট সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা ধরা হয়েছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। তবে এরপর একের পর এক অর্থনৈতিক তথ্য সেই পূর্বাভাস বদলে দিয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো ভোক্তা মূল্য। আগস্টে ভোক্তা মূল্য ০.৪ শতাংশ বেড়েছে, যা চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের কারণে পণ্যের দামও বাড়ছে। বার্ষিক হিসাবে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩.৪ শতাংশ, যা জুলাইয়ের সমান। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ ও ইরানে হামলা আরও তীব্র হওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও দ্রুত বেড়েছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৯ ডলারে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম এখন ৪.৩৬ ডলার (প্রতি লিটারে ১.১৫ ডলার)। গত এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে ১৪ সেন্ট। এক মাস আগেও প্রতি গ্যালনের দাম ছিল ৪.০৬ ডলার (প্রতি লিটারে ১.০৭ ডলার)। প্রতিদিনের জ্বালানি তেলের দাম পর্যবেক্ষণকারী আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন এসব তথ্য জানিয়েছে। অন্যদিকে ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৬.৩১ ডলার (প্রতি লিটারে ১.৬৭ ডলার), যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সর্বোচ্চ গড় দাম। এক বছর আগের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ ফলমূল, সবজি থেকে শুরু করে স্টিল ও সিমেন্ট—সব ধরনের পণ্য পরিবহনে ট্রাক চালাতে ডিজেল ব্যবহার করা হয়।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের বেঞ্চমার্ক ইয়েল্ড মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ ৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছে। একপর্যায়ে তা ৫.০২ শতাংশে পৌঁছায়, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই ইয়েল্ড গাড়ি ঋণ ও গৃহঋণসহ বিভিন্ন ঋণের সুদহারের একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে এটি মূল্যস্ফীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। টাফটস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুলের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং দলনিরপেক্ষ অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিবিষয়ক প্রকাশনা ইকোনোফ্যাক্ট-এর নির্বাহী সম্পাদক মাইকেল ক্লেইন বলেন, ‘অর্থনীতি এখন একটি অস্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে।’ তার মতে, বেকারত্ব স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে থাকলেও পণ্যের উচ্চমূল্য স্থায়ী হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।
ক্লেইন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ায় চেয়ারম্যান ওয়ার্শের ওপর সুদহার বাড়ানোর জন্য অনেক চাপ ছিল। এর সঙ্গে ট্রাম্পের চাপ নিয়েও উদ্বেগ যোগ হয়েছে।’ ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে সুদহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চ সুদহার সাধারণত অর্থনীতিকে দুর্বল করে। তবে বাজার যদি মনে করে সুদহার বাড়ানো হবে, তাহলে সেই সম্ভাবনা ইতোমধ্যেই বাজারদরে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কারণ খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাজারদর পরিবর্তিত হয়। ফলে এটি নতুন কোনো তথ্য হবে না।’ তার মতে, এতে বন্ডের ইয়েল্ডও স্থিতিশীল হতে পারে। সুদহার বাড়ানোর বিষয়ে আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রায় তিন ঘণ্টা পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার ১ শতাংশ বা তারও কম হওয়া উচিত। কারণ আমরাই বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ঋণগ্রহীতা—অনেক দূর এগিয়ে। নতুন বিনিয়োগে আমাদের দেশ চাঙা হয়ে উঠছে!’ তিনি আরও লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুদহার কমান, দ্রুত!’ তবে ওই পোস্টে তিনি সরাসরি ওয়ার্শের নাম উল্লেখ করেননি। পরে বুধবার সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন, ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে ওয়ার্শের ওপর তাঁর এখনও আস্থা আছে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি আস্থা রাখছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কেভিনের ওপর নির্ভর করছি। তবে তার বোর্ড খুব কঠিন। বোর্ডে এমন অনেকেই আছেন, যাদের নিয়োগ দিয়েছেন অন্যরা। সুদহার অনেক বেশি। এগুলো উপযুক্ত নয়। আমি কেভিনকে বলেছি, “বোর্ডের সঙ্গেই ভোট দাও। কারণ এর বাইরে ভোট দিলেও কোনো লাভ হবে না।” ‘ওয়ার্শের পূর্বসূরি জেরোম পাওয়েলকে সুদহার না কমানোর জন্য ট্রাম্প বারবার প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। এমনকি মার্কিন সরকার পাওয়েলের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি তদন্তও শুরু করেছিল। সে সময় পাওয়েল বলেছিলেন, তদন্তের অভিযোগগুলো ফেডের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার ‘অজুহাত’।
মন্তব্য করুন